ইসরায়েলও কি সৌদিকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসছে?

· Prothom Alo

ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষে ইসরায়েলি অংশগ্রহণের বিষয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে প্রস্তাব দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা সত্যি হলে একে সাহায্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একে দেখতে হবে একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফাঁদ হিসেবে।

Visit amunra.help for more information.

ইসরায়েল চায় না সৌদি আরবকে ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করতে। বরং সে চায় উপসাগরীয় নিরাপত্তার মূল কেন্দ্রে নিজেকে ঢুকিয়ে দিতে, এই ভূমিকাটিকে স্বাভাবিক সম্পর্কের (নরমালাইজেশন) সঙ্গে যুক্ত করতে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের নতুন পথ খুলে দিতে। সৌদি আরবের ঠিক এটিই প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

বিষয়টি সহজ। ইসরায়েল যদি ‘সৌদি আরবকে সাহায্য করার’ অজুহাতে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়ায়, তবে তা রিয়াদকে বাড়তি কোনো শক্তি দেবে না। উল্টো সৌদি আরবের বিরোধীদের হাতে একটি দারুণ সুযোগ তুলে দেবে। তারা তখন প্রচার করার সুযোগ পাবে যে সৌদি আরব আর একা লড়ছে না; তারা এখন একটি মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের অংশ হিসেবে লড়াই করছে। এটি সৌদি আরবের রাজনৈতিক বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, হুতিদের বয়ানকে শক্তিশালী করবে এবং সংঘাত আরও বাড়িয়ে তোলার পথ সুগম করবে।

হুতি যেভাবে ইরানের ‘বিপ্লবী গার্ড’ হয়ে উঠেছেসৌদি বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলা, যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে

মূল সমস্যা হলো, ইসরায়েল ইয়েমেন ফ্রন্ট থেকে নিজেকেই রক্ষা করতে পারেনি। ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যখন ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তেল আবিব তা থামাতে ব্যর্থ হয়। তারা হোদাইদাহ বন্দরে হামলা চালিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আক্রমণ থামেনি; লোহিত সাগর অস্থিতিশীলই রয়ে গেছে এবং এইলাত বন্দর পড়েছে গভীর সংকটে। যে ইসরায়েল এই ফ্রন্টে নিজেকেই রক্ষা করতে পারে না, তারা কীভাবে দাবি করে যে সৌদি আরবকে রক্ষা করবে?

উপসাগরীয় অঞ্চলের এমন একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন চাইলেই বন্ধ করে দিতে পারবে না। এ কারণেই ইসরায়েলি ‘উপহারটি’ আসলে কোনো উপহার নয়, এটি একটি বোঝা।

ইয়েমেন সমস্যার সমাধানের জন্য সৌদি আরবের ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন এই অধ্যায়ের ইতি টানা। যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাওয়া সৌদি আরবের মূল নতুন পরিকল্পনার জন্যই হুমকি।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে সৌদি আরামকোর স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে সৌদি আরামকো

উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের কাছে একটি স্পষ্ট ভাবমূর্তি তুলে ধরে: আমরা একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চল, যা জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং তেল-পরবর্তী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে এই ভাবমূর্তি টিকে থাকতে পারে না। বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যখন হুমকির মুখে, তখন আপনি রিয়াদে বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন না।

উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা কোনো গৌণ বিষয় নয়। নিরাপত্তাই হলো উপসাগরীয় মডেলের মূল ভিত্তি।

এ কারণেই ইয়েমেন যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সমস্যা নয়। এটি সৌদি আরবের ভবিষ্যতের জন্য সরাসরি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হুমকি।

যুদ্ধের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন একটি স্থিতিশীল দেশ হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি দুর্বল করে দেয়। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা—এমনকি তা যদি বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি না–ও করে—তবু তা গভীর মানসিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সৌদি আরব কেন হুতিদের হারাতে পারবে নাসৌদি ও হুতির সামনে এখন যে দুই পথ খোলা রয়েছে

ঠিক এখানেই ইসরায়েলের আসল খেলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইসরায়েল টিকে থাকে আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে। আরব দেশগুলো অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক যুদ্ধে যত বেশি ব্যস্ত থাকবে, ইসরায়েল তত বেশি সুবিধা পাবে—গাজা, পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ায়। তারা আরবদের বলতে চায়: তোমাদের শত্রু ইরান, তোমাদের শত্রু হুতি, তোমাদের শত্রু এই বা ওই গোষ্ঠী। এরপর এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেকে একটি নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে জাহির করে।

যেকোনো আঞ্চলিক নীতির ক্ষেত্রে প্রথম কৌশলগত প্রশ্ন হলো: প্রধান হুমকি কে?

যদি এই প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়, তবে তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা বাকি সবকিছুই ভুল হবে। সৌদি আরব যদি কেবল ইয়েমেনকেই তার অস্তিত্বের জন্য একমাত্র সমস্যা মনে করে, তবে তারা এক দীর্ঘ ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। তারা যদি ইরানকেই একমাত্র শত্রু মনে করে, তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব বহু বছর ধরে তাদের ওপর যে কাঠামো চাপিয়ে দিয়েছে, তারা সেখানেই বন্দী থাকবে। কিন্তু সৌদি আরব যদি পুরো চিত্রটি দেখতে পায়, তবে তারা বুঝবে যে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এই অঞ্চলের নিজস্ব বিভাজন এবং পুরো অঞ্চলকে স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা।

সশস্ত্র হুতি যোদ্ধা

এর মানে এই নয় যে হুতিরা একেবারেই নির্দোষ। এর মানে এই নয় যে ইরানের কোনো পরিকল্পনা, প্রভাব বা হস্তক্ষেপ নেই। আর এর মানে এটাও নয় যে সৌদি আরবের নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। নিজের সীমানা, শহর, অবকাঠামো ও জনগণকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষার অর্থ এই নয় যে একটি সীমাহীন যুদ্ধে আটকে থাকতে হবে। আর এর অর্থ এটাও নয় যে ‘সাহায্যের’ নামে ইসরায়েলকে ইয়েমেন ইস্যুতে ঢুকে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

এর সমাধান উপসাগরে ইসরায়েলকে আমদানি করা নয়। সমাধান হলো উপসাগরীয় নিরাপত্তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা।

প্রকৃত উপসাগরীয় নিরাপত্তা দামি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, পরিবর্তনশীল মার্কিন প্রতিশ্রুতি কিংবা ইয়েমেনকে এক স্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। প্রকৃত নিরাপত্তা শুরু হয় ইয়েমেন ফ্রন্ট বন্ধ করা, গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা, একটি অনাগ্রাসন চুক্তি করা, সীমান্ত সুরক্ষিত করা, নৌচলাচল নিরাপদ করা এবং ইয়েমেনকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করার মাধ্যমে।

নেতানিয়াহু ইয়েমেনে শান্তি চান না। তিনি চান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। তিনি চান সৌদি আরব যেন অস্ত্র ও সুরক্ষার জন্য সব সময় নির্ভরশীল থাকে। তিনি চান ইয়েমেন যেন একটি চাপের হাতিয়ার হয়েই থাকে। তিনি ওয়াশিংটন ও বিশ্বের সামনে নিজেকে এই অঞ্চলের ‘নিরাপত্তা সমাধানের’ অংশ হিসেবে জাহির করতে চান, অথচ বাস্তবে তিনি নিজেই সমস্যার অংশ।

এখানে ওমান একটি ভূমিকা রাখতে পারে। মধ্যস্থতায় যদি কোনো প্রভাব থাকে, তবে ইরানও ভূমিকা রাখতে পারে। কাউকে অপমান না করে, বরং রক্তপাত বন্ধ করার ওপর ভিত্তি করে আরও ব্যাপক আঞ্চলিক সমঝোতা সম্ভব।

দীর্ঘ যুদ্ধ কখনোই রাজনৈতিক সাহসের জন্ম দেয় না; তা কেবল প্রতিশোধের স্মৃতি তৈরি করে।

এই কারণেই আজকের দিনে সবচেয়ে বিপজ্জনক দৃশ্যপট হবে সৌদি-ইয়েমেন যুদ্ধকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে একটি ‘সৌদি-ইসরায়েলি’ যুদ্ধে পরিণত করা। তা হলে সৌদি আরব কোনো সামরিক সহায়তা তো পাবেই না, উল্টো নিজেদের নৈতিক অবস্থান হারাবে, নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির পথ খুলে দেবে এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তার সমীকরণে ইসরায়েলকে আসন তৈরি করে দেবে।

আরব দেশগুলো এখন বুঝছে—ইরান নয়, ইসরায়েলই তাদের জন্য বড় হুমকিমার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে

নেতানিয়াহু ইয়েমেনে শান্তি চান না। তিনি চান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। তিনি চান সৌদি আরব যেন অস্ত্র ও সুরক্ষার জন্য সব সময় নির্ভরশীল থাকে। তিনি চান ইয়েমেন যেন একটি চাপের হাতিয়ার হয়েই থাকে। তিনি ওয়াশিংটন ও বিশ্বের সামনে নিজেকে এই অঞ্চলের ‘নিরাপত্তা সমাধানের’ অংশ হিসেবে জাহির করতে চান, অথচ বাস্তবে তিনি নিজেই সমস্যার অংশ।

এই পথ প্রত্যাখ্যান করে সৌদি আরব সঠিক কাজই করেছে। কিন্তু শুধু প্রত্যাখ্যানই যথেষ্ট নয়। এখন যা প্রয়োজন তা হলো ইয়েমেন অধ্যায়টি বন্ধ করার জন্য একটি সাহসী রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া—যাতে এটি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক অবস্থানকে গিলে খাওয়ার মতো কোনো ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে না পারে।

নিরাপদ থাকার জন্য সৌদি আরবের ইসরায়েলকে প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন এমন একটি আঞ্চলিক নীতি যা শত্রু কমায়, যুদ্ধের ফ্রন্টগুলো বন্ধ করে, দেশের ভেতরের নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখে এবং নেতানিয়াহুকে এমন একটি যুদ্ধে সৌদি আরবকে টেনে আনা থেকে বিরত রাখে, যা কেবল তাঁরই স্বার্থ রক্ষা করে।

  • তামের আজরামি মিডল ইস্ট মনিটরের কলামিস্ট। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।

Read full story at source