প্যারিসের অস্থিরতা: ক্ষোভের শরীরে আগুনের চেহারা

· Prothom Alo

আজ সকালেই কথা হচ্ছিল বন্ধু এমদাদ রহমানের সঙ্গে। দীর্ঘদিন সে প্যারিসে বাস করে আসছে। এখনকার মতো এত বাজে পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেনি। শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্যারিসের আফ্রিক, তিউনিসীয় আর আলজেরীয় তরুণেরাই সবচেয়ে সহিংস হয়ে উঠেছে। রয়টার্স একে দেশটির কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সহিংসতাগুলোর একটি বলেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। কয়েক লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছেন, আর সহিংসতা ঘটিয়েছে তুলনামূলক ছোট কিছু গোষ্ঠী। অর্থাৎ ‘প্যারিসে দাঙ্গা’ কথাটা আংশিক সত্য। এটি একটি বিশাল গণ–আন্দোলন, যার প্রান্তে বা ভেতরে সহিংসতা ঢুকে পড়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সারা দেশে প্রায় ৫,৫০,০০০ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন, প্যারিসে প্রায় ১,১০,০০০। সিজিটি ইউনিয়ন বলছে সংখ্যাটা ৮,০০,০০০। রয়টার্সের তুলনা অনুযায়ী এই জমায়েত ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের চূড়ার চেয়ে বড়, কিন্তু ২০২৩ সালের পেনশনবিরোধী আন্দোলনের চেয়ে ছোট।

শিক্ষকস্বল্পতা আর জীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও জীবনযাত্রার মানের বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সূচনাবিন্দু ছিল সেন-সাঁ-দ্যনি। এটি প্যারিসের উত্তরের একটি দরিদ্র জেলা। আউবারভিলিয়ের একটি স্কুলে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে অঙ্ক, ইংরেজি আর খেলাধুলার ক্লাস বন্ধ ছিল বলে জানানো হয়েছে। ইউনিয়নের দাবি, এই জেলার দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষকের পদ খালি। তাপপ্রবাহে ক্লাসরুম অসহনীয় গরম হয়ে ওঠার অভিযোগও ছিল।

স্কুল থেকে রাজপথ: আগুন যেভাবে ছড়াল

Visit fish-roadgame.online for more information.

আন্দোলনের শুরুটা বিস্ফোরক কোনো ঘটনায় নয়। তাই এটি ২০০৫ বা ২০২৩-এর দাঙ্গা থেকে আলাদা। ওই দুই ক্ষেত্রেই ট্রিগার ছিল পুলিশের হাতে বা পুলিশের তাড়ায় কিশোরদের মৃত্যু। এবার আন্দোলন শুরু হয় গত মাসে প্যারিসের উত্তরের শ্রমজীবী উপশহরের উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষকস্বল্পতা আর জীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় ও জীবনযাত্রার মানের বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সূচনাবিন্দু ছিল সেন-সাঁ-দ্যনি। এটি প্যারিসের উত্তরের একটি দরিদ্র জেলা। আউবারভিলিয়ের একটি স্কুলে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে অঙ্ক, ইংরেজি আর খেলাধুলার ক্লাস বন্ধ ছিল বলে জানানো হয়েছে। ইউনিয়নের দাবি, এই জেলার দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলে শিক্ষকের পদ খালি। তাপপ্রবাহে ক্লাসরুম অসহনীয় গরম হয়ে ওঠার অভিযোগও ছিল। সময়সূচি, ক্লাসের আকার আর শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্কুলের সামনে অবরোধ শুরু করে। ১৬ বছরের এক ছাত্রীর কথা সংবাদে এসেছে। সে বলেছে, ‘আমরা উপশহরের সন্তানেরা পরিত্যক্ত, অবহেলিত।’ স্কুলের অবস্থাকে সে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলেছে।

২৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় পর্যায়ে সরকারি খাতের ধর্মঘট ছিল। সেদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ৩,৭০০ স্কুলের মধ্যে ৪০০টি অবরোধ বা ব্যাঘাতের শিকার হয়েছে। এভাবে ছাত্র আন্দোলন আর শ্রমিক-শিক্ষকের ধর্মঘট একসঙ্গে মিশে যায়। সিএনএন জানায়, এক শর বেশি হাইস্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; শুধু প্যারিস অঞ্চলেই ক্ষতি আনুমানিক ৭০ লাখ ইউরো। তখনই বোঝা গিয়েছিল ক্ষোভ স্কুলের চৌহদ্দিতে আটকে থাকবে না। ১৭ অক্টোবর তার সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি ধারা। ট্রেড ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ পরিচয়ধারী নাগরিকেরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নেমেছেন। ইউরোনিউজ এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের ক্ষোভ, মজুরির ক্ষোভ আর জ্বালানির ক্ষোভ একই রাস্তায় এসে মিলেছে।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে কাঁদানে গ্যাসের শেল সরানোর চেষ্টা করছেন এক বিক্ষোভকারী। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

কারা জড়িত: এক ভিড়ের ভেতরে অন্তত চার স্তর

‘কারা করছে’ প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। প্রতিবেদন ও প্রেক্ষাপট থেকে চারটি স্তর আলাদা করা যেতে পারে। চতুর্থ স্তরের পরিচয় নিয়ে প্রমাণ সবচেয়ে কম, তাই সেটা কেবল অনুমান।

প্রথম স্তর: বিপুল শান্তিপূর্ণ অংশ। শিক্ষক, অভিভাবক, ইউনিয়ন কর্মী, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ ও ইয়েলো ভেস্ট সমর্থকেরা এর মধ্যে পড়েন। ভাঙচুরের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নেই। ১৯ বছরের এক বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেছেন, জীবনযাত্রার খরচ আর জ্বালানির দাম খুব বেশি, আর স্কুলছাত্রদের ওপর পুলিশের আক্রমণ তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে। দ্বিতীয় স্তর: স্কুলছাত্র ও উপশহরের তরুণেরা। আন্দোলনের আদি ইঞ্জিন তারাই। তাদের কেউ কেউ স্কুলের সামনে ময়লার ঝুড়ি আর সাইকেলে আগুন দিয়েছে, ঢিল ছুড়েছে। তবে সরকারি তথ্য এই ছকের সীমা দেখায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সহিংস ঘটনার পর প্রায় ৪০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই প্রাপ্তবয়স্ক। সুতরাং ‘উপশহরের কিশোরদের দাঙ্গা’ বলে পুরো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃতীয় স্তর: সংগঠিত, কালো পোশাকের মুখোশধারী গোষ্ঠী। প্যারিসে বেশির ভাগ তরুণ কালো পোশাক, হুডি, মুখোশ ও কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে গগলস পরে ছিল। এই পোশাক-কৌশল ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ব্লক’ ধরনের চরমপন্থী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পরিচিত। তবে সংবাদগুলোতে এই নাম সরাসরি দেওয়া হয়নি। সরকার এদের দিকে ইঙ্গিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু সহিংসতার জন্য ‘বাম চরমপন্থী’ ও অপরাধীদের দায়ী করেছেন। তিনি এটা বলেছেন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, তাই এটি দাবি, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। অন্য পক্ষ বলছে, বিক্ষোভকারীদের অনেকে মনে করেন বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণ ছিল আর সহিংসতার পেছনে ছিল যারা ক্ষতি করতে ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে এসেছিল তারা। চতুর্থ স্তর: সুযোগসন্ধানী লুটেরা (অনুমান)। দাঙ্গার ইতিহাসে ভিড়ের আড়ালে ছোট অপরাধী গোষ্ঠী সব সময়ই থাকে। সবকিছু সরকারি নজরদারির বাইরে চলে গেলে তারা সুযোগ নেয়। মুঠোফোনের দোকান লুট এবং সুপারমার্কেট লুটের মতো ঘটনা আদর্শিক প্রতিবাদের চেয়ে সুযোগসন্ধানী অপরাধের সঙ্গে বেশি মেলে। অথচ ব্যাংক ভাঙচুর বা সিটি হলে হামলা স্পষ্টতই প্রতীকী। এই পার্থক্য খেয়াল রাখা জরুরি।

সবকিছু সরকারি নজরদারির বাইরে চলে গেলে তারা সুযোগ নেয়। মুঠোফোনের দোকান লুট এবং সুপারমার্কেট লুটের মতো ঘটনা আদর্শিক প্রতিবাদের চেয়ে সুযোগসন্ধানী অপরাধের সঙ্গে বেশি মেলে। অথচ ব্যাংক ভাঙচুর বা সিটি হলে হামলা স্পষ্টতই প্রতীকী। এই পার্থক্য খেয়াল রাখা জরুরি।

ক্ষোভের মূল কারণ

ক. শিক্ষা ও আঞ্চলিক বৈষম্য

এটিই আন্দোলনের সূচনা। অভিযোগ আছে ২০২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে কম হারে, মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ, বাড়ানো হয়েছে। সেটা কাগজে ছোট সংখ্যা মনে হলেও বাস্তবে এর মানে ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বরাদ্দ কমে যাওয়া। ধনী এলাকার স্কুল অভিভাবকদের চাঁদা, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও ভালো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এই ঘাটতি সামলে নিতে পারে। দরিদ্র উপশহর পারে না। ফলে বৈষম্য বাড়ে, আর কিশোরেরা সেটা প্রতিদিন নিজের ক্লাসরুমে অনুভব করে।

খ. জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম

জ্বালানির দাম ফ্রান্সের রাজনীতিতে স্পর্শকাতর বিষয়। ২০১৮ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল জ্বালানি কর নিয়েই। যাঁদের গাড়ি ছাড়া কাজে যাওয়ার উপায় নেই, বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায়, তাঁদের জন্য দামের ধাক্কা সরাসরি আয়ে আঘাত। এবার সেই ধাক্কা এসেছে ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে। এটা সরকারের হাতের বাইরের বাহ্যিক কারণ, তবু ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে সরকারের ওপরেই।

গ. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থার সংকট

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘Bloquons tout’ (সবকিছু অবরোধ করো) আন্দোলনের সময় সরকারের ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ইউরোর ব্যয়সংকোচ পরিকল্পনা প্রধান কারণ ছিল এবং শেষে বায়রু সরকারের পতন হয়। সেই পতনের পর লেকর্নু প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি দুই বছরেরও কম সময়ে পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী। নাগরিকদের চোখে সরকার বদলায় কিন্তু নীতির দিক বদলায় না। যে ব্যবস্থায় ভোট দিয়েও বদল আসে না, সেখানে রাস্তার ক্ষমতা ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ে।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় জ্বলন্ত বস্তুর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দাঙ্গা পুলিশের সদস্যরা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ঘ. রাষ্ট্রীয় ঋণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ

ঋণ কমানোর ফরাসি প্রচেষ্টা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। সরকারের ঋণ-ব্যয় দুই দশকেরও বেশি সময়ের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। এর মানে সরকারের হাতে সামাজিক খাতে খরচ বাড়ানোর জায়গা সংকুচিত। একদিকে বাজার ব্যয় কমানোর চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকেরা বলছেন স্কুল-হাসপাতালে আয় ব্যয় কমানো যায় না। দুই দাবির মাঝখানে সরকার আটকা।

ঙ. পুলিশি সহিংসতা: ক্ষোভের জ্বালানি

সহিংসতা শুধু একদিক থেকে আসছে না। এক কিশোর স্টান গ্রেনেড তুলতে গিয়ে হাত হারিয়েছে। পুলিশ-নজরদারি সংস্থা অন্তত দুই ডজন পুলিশি সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করছে। একই সময়ে পুলিশ নিজেও চাপে। লেকর্নু জানিয়েছেন আগের বিক্ষোভগুলোতে ৯০০-এর বেশি পুলিশ আহত হয়েছে। পুলিশ ইউনিয়ন বলছে, বাহিনী ভেঙে পড়ার মুখে। ছাত্রদের ওপর কঠোর দমন ক্ষোভকে আরও জ্বালিয়েছে, আর পুলিশের ওপর আক্রমণ সরকারকে আরও কঠোর হতে ঠেলছে। এই চক্র থামানো কঠিন।

সহিংসতা শুধু একদিক থেকে আসছে না। এক কিশোর স্টান গ্রেনেড তুলতে গিয়ে হাত হারিয়েছে। পুলিশ-নজরদারি সংস্থা অন্তত দুই ডজন পুলিশি সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করছে। একই সময়ে পুলিশ নিজেও চাপে। লেকর্নু জানিয়েছেন আগের বিক্ষোভগুলোতে ৯০০-এর বেশি পুলিশ আহত হয়েছে। পুলিশ ইউনিয়ন বলছে, বাহিনী ভেঙে পড়ার মুখে। ছাত্রদের ওপর কঠোর দমন ক্ষোভকে আরও জ্বালিয়েছে, আর পুলিশের ওপর আক্রমণ সরকারকে আরও কঠোর হতে ঠেলছে। এই চক্র থামানো কঠিন।

কেন ভাঙচুর, লুট, আগুন: সহিংসতার যুক্তি

তিনটি আলাদা ধরনের লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে, আর প্রতিটির আলাদা যুক্তি আছে।

রাষ্ট্রের প্রতীক। লিমোজে সিটি হল পুড়েছে, মার্সেইয়ে কালো পোশাকের বিক্ষোভকারীরা সিটি হলে ঢুকে অরাজকতাবাদী গ্রাফিতি এঁকেছে, লিয়ঁয়ে পর্যটন দপ্তরে আগুন দেওয়া হয়েছে। এখানে বার্তা স্পষ্ট: রাষ্ট্র আমাদের কথা শোনে না, তাই রাষ্ট্রের ভবনই লক্ষ্য।

সম্পদ ও পুঁজির প্রতীক। দাঙ্গাকারীরা গালেরি লাফায়েৎ ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ঢোকার চেষ্টা করেছে, ব্যাংক ভাঙচুর করেছে, লাকোস্ট দোকান তছনছ করেছে। প্যারিসের বিলাসী বাণিজ্যিক এলাকা আর ধনী-গরিবের দূরত্ব এখানে এক বিন্দুতে মিলেছে। যাঁদের স্কুলে শিক্ষক নেই, তাঁদের চোখে বিলাসী দোকানের কাচ ভাঙা ক্ষমতার প্রতীক ভাঙা।

পুলিশ। পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের ওপর হামলা। পুলিশকে সরকারের দৃশ্যমান বাহু হিসেবে দেখার প্রবণতা ফ্রান্সের উপশহরে বহু দশকের, এবং সেটা অনেকটাই পারস্পরিক অবিশ্বাস।

এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্যও স্বীকার করা দরকার। সহিংসতার কিছু অংশ রাজনৈতিক বার্তা নয়, নিছক সুযোগ আর উত্তেজনার আনন্দ। সব ভাঙচুরকে ‘প্রতিবাদের ভাষা’ বলা যেমন ভুল, সব ভাঙচুরকে ‘নিছক অপরাধ’ বলাও ভুল।

বিক্ষোভ করছেন ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬, নঁত, ফ্রান্স

রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও নির্বাচনী রাজনীতি

সরকারের ভাষা কঠোর। লেকর্নু বলেছেন যারা সহিংসতাকে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘ওয়ার্ম আপ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, সরকার তাদের কাছে ভয় পাবে না। মাখোঁ অপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্যারিস পুলিশ বলেছে তারা ‘পিছু হটবে না’।

এই ভাষায় নির্বাচনের ছায়া স্পষ্ট। ফ্রান্সে আগামী বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, আর শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় ইতিমধ্যে প্রধান ইস্যু। সরকারের কাছে সহিংসতাকে ‘বাম চরমপন্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা সুবিধাজনক, কারণ তাতে মূল দাবি (স্কুলের অবস্থা, মূল্যবৃদ্ধি) থেকে আলোচনা সরে যায়। বিরোধী বামপন্থীদের জন্যও সুবিধা আছে: সংঘর্ষের ছবি তাদের আখ্যানকে জোর দেয় যে সরকার ব্যর্থ। দুই পক্ষই ঘটনাকে নিজের রাজনৈতিক হিসাবে সাজাচ্ছে, তাই কোনো পক্ষের একতরফা ব্যাখ্যাকেই চূড়ান্ত ধরা ঠিক হবে না।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়: ফ্রান্স একা নয়। বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিতেও ছোট পরিসরে বিক্ষোভ হয়েছে। পর্তুগালে ২০১৭ সাল থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণ হয়েছে, আর আলবেনিয়ায় ছাত্রেরা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে। ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট আর তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার একটা সাধারণ ধারা দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সের ঘটনা তাই শুধু ফরাসি সমস্যা নয়।

কী বুঝব, কী বুঝব না

আমার বিশ্লেষণের মূল কথাগুলো এই যে:

এটি একক কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় আন্দোলন, যার মূলে শিক্ষাবৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়, আর যার ওপরে রাজনৈতিক অনাস্থা ও নির্বাচনী উত্তাপ। সহিংসতা সংখ্যালঘুর হাতে, কিন্তু সেই সংখ্যালঘু এক রকম নয়। রাষ্ট্রের প্রতীকে হামলাকারী, পুঁজির প্রতীকে আঘাতকারী আর সুযোগসন্ধানী লুটেরাকে এক ঝুড়িতে ফেলা বিশ্লেষণের দুর্বলতা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক, তাই ঘটনাটিকে শুধু কিশোর বা শুধু উপশহরের সমস্যা বলা ভুল। আবার ছাত্র আন্দোলনই যে এর সূচনা, সেটাও ভোলা যাবে না। পুলিশি আচরণ এই চক্রের একটি অংশ, তবে পুলিশও বড় চাপে। কোনো পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা সম্পূর্ণ দোষী ধরলে বাস্তবতা হারিয়ে যায়।

যা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না: ভাঙচুরকারীদের সঠিক সাংগঠনিক পরিচয়, আন্দোলন কত দিন চলবে, আর সরকার রাজনৈতিক সমঝোতা করবে নাকি আরও কঠোর হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মামলা এগোলে এবং পুলিশ-নজরদারি সংস্থার তদন্ত শেষ হলে অনেক ধারণা বদলাতে পারে। যে সমাজে ক্লাসরুমে শিক্ষক নেই, আর রাস্তায় আগুন জ্বলছে, সেখানে আগুন নেভানোর চেষ্টা আর কারণ সারানোর চেষ্টা আলাদা কাজ। প্রথমটি পুলিশ করতে পারে, দ্বিতীয়টি করতে হবে নীতির মাধ্যমে। ফ্রান্সের সামনের সপ্তাহগুলো দেখাবে সরকার কোনটিতে বেশি মনোযোগ দেয়।

Read full story at source