পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে রিছাং ঝরনা

· Prothom Alo

খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে আছে রিছাং ঝরনা। পাথুরে পথ, দীর্ঘ সিঁড়ি আর ঝরনার শীতল জলরাশি—প্রকৃতির সান্নিধ্যে ক্লান্তি ভুলে যাওয়ার দারুণ এক গন্তব্য।

Visit michezonews.co.za for more information.

চাকরিসূত্রে খাগড়াছড়িতে থাকা হচ্ছে কয়েক মাস ধরে। এর মধ্যে ঘুরে দেখা হয়েছে বেশ কিছু জায়গা। অথচ খাগড়াছড়ির অন্যতম আকর্ষণ রিছাং ঝরনায় যাওয়া হয়নি। কাছের সৌন্দর্যকে অনেক সময় আমরা অবহেলা করি, দূরের গন্তব্য খুঁজে বেড়াই। পরে বুঝতে পারি, হাতের কাছেও ছড়িয়ে আছে কত অমূল্য সৌন্দর্য।

ওয়াচ টাওয়ারে উপর থেকে ঝর্ণার যাওয়ার সিঁড়ি

সেই ভাবনা থেকেই এক ছুটির দিনে রওনা হই রিছাং ঝরনার উদ্দেশে। সঙ্গী সহকর্মী নুরুজ্জামান ও সাজ্জাদ। কাজের ব্যস্ততা, প্রতিদিনের একঘেয়েমি আর ক্লান্তি পেছনে ফেলে একটু প্রশান্তির খোঁজে আমাদের এই যাত্রা।

সবুজ পাহাড়ের পথে  

ঝরনা যাওয়ার পথে স্থানীয় পাহাড়িদের জুম চাষের অপরূপ দৃশ্য

ছুটির দিন মানেই ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে নতুন কোনো গন্তব্যের হাতছানি। আমাদের অফিসেও এমন কয়েকজন আছেন, যাঁরা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে নুরুজ্জামান ও সাজ্জাদকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হলো রিছাং ঝরনা দেখার অভিযান।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে এগোতে চারপাশের প্রকৃতি মন কেড়ে নেয়। সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর পাহাড়ি জনপদের জীবনযাপন—সব মিলিয়ে যাত্রাপথই যেন ভ্রমণের আলাদা আকর্ষণ। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শহরের ব্যস্ততা ও কাজের ক্লান্তি অনেকটা দূরে সরে যায়।

পাহাড়ের বুক থেকে জলধারা

খাগড়াছড়ি জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় জলপ্রপাত রিছাং ঝরনা। ধারণা করা হয় ২০০২ সালের দিকে ঝরনাটি ভ্রমণপিপাসুদের নজরে আসে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে জেলার পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি।

ঝরনার সামনে সবান্ধব লেখক

‘রিছাং’ শব্দটি মারমা ভাষার। ‘রি’ অর্থ পানি আর ‘সাং’ অর্থ লাফিয়ে পড়া। অর্থাৎ উঁচু স্থান থেকে পানির লাফিয়ে পড়া। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কাছে ঝরনাটি ‘তেরাং তৈকালাই’ নামে পরিচিত। তাঁদের ভাষায় ‘তেরাং’ অর্থ পানি আর ‘তৈকালাই’ অর্থ ওপর থেকে পড়া।

গাড়ি থেকে নেমে ঝরনার কাছে পৌঁছানোর জন্য পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে হয়। চাইলে মোটরসাইকেলে ঝরনার প্রবেশপথের কাছাকাছি যাওয়া যায়। তবে আমরা হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে হাঁটার বিকল্প নেই।

পথে চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, জুমঘর আর বুনো গাছপালা। কোথাও কোথাও ফুটে আছে নাম না জানা রঙিন বুনোফুল। চারপাশের এই দৃশ্য যেন প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন করে মুগ্ধ করে।

স্থানীয়দের বাড়ি

এরপর সামনে পড়ে প্রায় ২৫০ ধাপের সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে কানে আসে পানির কলতান। যত এগোই, তত স্পষ্ট হয় সেই শব্দ। একসময় চোখের সামনে ধরা দেয় ঝরনা।

পাহাড়ের বুক বেয়ে প্রায় ১৫০ ফুট ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়ছে জলরাশি। ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে পানির ধারা। চারদিকে উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, বুনো ঝোপঝাড় আর প্রকৃতির নিবিড় পরিবেশ। ঝরনার কাছে দাঁড়ালে শীতল জলকণা শরীর ছুঁয়ে যায়। মুহূর্তেই মন ভরে ওঠে স্নিগ্ধতায়।

ঝরনা ঘিরে আরও কিছু আয়োজন

রিছাং ঝরনার আশপাশে রয়েছে আরও একটি ঝরনা। প্রথমটি দেখে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে প্রায় ২০০ গজ ভেতরে এগোলে দ্বিতীয় ঝরনাটির দেখা মেলে। দুটিকে ঘিরেই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা।

প্রথম ঝরনা থেকে একটু নিচে নেমে ১০ থেকে ২০ মিনিট হাঁটলে এই দ্বিতীয় ঝর্ণার দেখা মিলবে

ঝরনার পথে একটি ওয়াচ টাওয়ারের মতো উঁচু স্থাপনা ও ক্যাফে রয়েছে। সেখান থেকে চারপাশের পাহাড়ি প্রকৃতি দেখা যায়। চাইলে সেখানে বসে কিছুটা সময় কাটানো যায়। আশপাশের জুমঘর ও পাহাড়ি জনপদের দৃশ্যও ভ্রমণে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
তবে রিছাং ঝরনার মূল আকর্ষণ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়ের নীরবতা, পানির অবিরাম শব্দ আর সবুজের বিস্তার মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকলেও মন ভালো হয়ে যায়। ইচ্ছে করে, শহরের কোলাহলে আর না ফিরে প্রকৃতির কাছেই থেকে যাই।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম থেকে যেতে হলে নগরের অক্সিজেন এলাকা থেকে খাগড়াছড়িগামী বাসে উঠতে হবে। খাগড়াছড়ি শহর কিংবা মাটিরাঙা থেকে স্থানীয় পরিবহনে রিছাং ঝরনার কাছে পৌঁছানো যায়।
খাগড়াছড়ি শহরের বাস টার্মিনাল থেকে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস কিংবা জিপ ভাড়া করা যায়। মোটরসাইকেলে ঝরনার প্রবেশপথের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। অন্য যানবাহন নির্ধারিত জায়গায় রেখে কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়।

কোথায় থাকবেন

খাগড়াছড়ি শহরে থাকার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মানের হোটেল। আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি, শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর তীরে রয়েছে পর্যটন মোটেল। এ ছাড়া জেলা সদরের মিলনপুর এলাকায় হোটেল গাইরিং, অরণ্য বিলাস ও হিল টাচের মতো আবাসন রয়েছে। নিজের বাজেট ও সুবিধা অনুযায়ী যেকোনোটি বেছে নেওয়া যায়। যাওয়ার আগে আবাসনের বর্তমান অবস্থা, ভাড়া ও বুকিংয়ের তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।

ফেরার পথে

ঝরণা যাওয়ার প্রবেশ পথ পার হয়ে এখান থেকে হাঁটা শুরু করতে হবে

রিছাং ঝরনা ঘুরে ফেরার সময় মনে হয় ভ্রমণের জন্য সব সময় দূরের কোনো গন্তব্যে ছুটতে হয় না। কখনো কখনো আমাদের আশপাশেই লুকিয়ে থাকে অপূর্ব সৌন্দর্য। প্রয়োজন শুধু একটু সময় বের করা, চেনা জায়গাকে নতুন করে দেখার চোখ তৈরি করা।

পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা রিছাং ঝরনা তাই কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এক আমন্ত্রণ।

লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার, ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি

ছবি: লেখক ও মেড ইন খাগড়াছড়ি

Read full story at source