ইউরোপের বাইরেও তরুণদের বিক্ষোভ ছড়াচ্ছে, নতুন করে যোগ হচ্ছে জার্মানি
· Prothom Alo

বিশ্বের দেশে দেশে নানা দাবিতে রাজপথে বেশ কয়েক দিন ধরেই বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদ, কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, আবার কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে আওয়াজ তুলছে মানুষ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় সবশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ও ফ্রান্স, সার্বিয়া, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া জার্মানিতে ৩১ অক্টোবর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তরুণদের একটি সংগঠন।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ভয়াবহ সহিংস রূপ নিয়েছে। সার্বিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সামনে এখন সংসদ নির্বাচন। ভেনেজুয়েলায় বিরোধী নেত্রীর দেশে ফেরা ও অবাধ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। তিউনিসিয়ায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে সংঘর্ষ হয়েছে। আর কলম্বিয়ায় বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের হামলার অভিযোগ উঠেছে।
Visit palladian.co.za for more information.
এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোথাও তা সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আটকের ঘটনায় গড়িয়েছে।
ফ্রান্স
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের সূত্রপাত গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতেই শহরের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে শিক্ষকেরা সেখানে আন্দোলন শুরু করেন। পরে শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। ধীরে ধীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।
গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের একাংশ সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হল আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত সপ্তাহান্ত থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭৪ জনকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে এবং ৯০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে।
বিক্ষোভের নতুন কর্মসূচি সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ গতকাল বলেছেন, অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্বীকৃত সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তন করা হতে পারে। লিওঁসহ কয়েকটি শহরে আগামীকাল শনিবারের বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ইউরোপের দেশে দেশে কেন বিক্ষোভ করছেন মানুষভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে গতকাল হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের প্রধান দাবি, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন এবং বিরোধী নেত্রী মারিয়া কারিনা মাচাদোকে দেশে ফেরানো। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী মাচাদো বর্তমানে নির্বাসনে আছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল দেশটির রাজধানী কারাকাসে প্রায় দুই হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হন। দেশের অন্য এলাকাতেও বিক্ষোভ হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ৪৩ বছর বয়সী বিরোধী দলীয় সমর্থক এরিকা সেদেনো এএফপিকে বলেন, ‘আমরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেওয়া এবং আমাদের নেত্রী মারিয়া কারিনা মাচাদোকে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি।’
৫৩ বছর বয়সী দরজি মায়রিম বেলত্রান বলেন, ‘আমি ক্লান্ত। আমরা সত্যিই পরিবর্তন চাই, যথেষ্ট হয়েছে।’
কলম্বিয়া সীমান্তবর্তী তাচিরা শহর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বলিভারেও বিক্ষোভ হয়েছে। তাচিরায় বিক্ষোভকারীরা যেখানে সমাবেশ করতে চেয়েছিলেন, সেখানে যাওয়ার সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁরা প্রতিবাদ জানান।
সার্বিয়া
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে গতকাল সরকারবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থনে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। আগামী রোববারের আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এই সমাবেশে লাখো মানুষ অংশ নেন। তাঁদের লক্ষ্য, আলেকসান্দার ভুসিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে পরাজিত করা।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা শিক্ষার্থী আন্দোলনের চাপে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ভুসিচ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাউনির একটি অংশ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দুর্নীতির তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
পরে আন্দোলনকারীরা আগাম নির্বাচনের দাবি তোলেন। শেষ পর্যন্ত সেই দাবির মুখেই আগাম নির্বাচনের ঘোষণা আসে। তবে পদত্যাগ করলেও রাজনীতি ছাড়েননি ভুসিচ। এবার নিজের দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি।
সার্বিয়ায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষার্থী আন্দোলনের মিছিলশিক্ষার্থীদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্টস লিস্ট’ এবারের নির্বাচনে ভুসিচের দলের সঙ্গে প্রায় সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বলে জনমত জরিপে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান খুব কম হলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ভোট শেষে উভয় পক্ষ নিজেদের বিজয়ী দাবি করলে নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৪৭ বছর বয়সী মারিয়া নেদেলকোভিচ রাদিচ বলেন, ‘আমি স্টুডেন্ট লিস্টকে সমর্থন জানাতে এসেছি। তরুণেরা আমাকে নতুন করে আশা দেখিয়েছেন, একটি দেশে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।’
তিউনিসিয়া
তিউনিসিয়া পুলিশের হেফাজতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে দেশটির রাজধানী তিউনিসের উপকণ্ঠে ইততাদামেন এলাকায় গতকাল বিক্ষোভ হয়। ওই ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে আটক করা হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর পুলিশি নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ঘটনার তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেছেন। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, মাদকদ্রব্য গিলে ফেলার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করেন, টায়ারে আগুন দেন এবং পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মারেন। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। নিরাপত্তা বাহিনী এলাকার একটি ন্যাশনাল গার্ড স্টেশন সুরক্ষিত রাখারও চেষ্টা করেছে।
সহিংস আন্দোলনের পর ফ্রান্সের সামনে কী ঘটতে পারেদেশটির দক্ষিণাঞ্চলের স্ফাক্স গভর্নরেটের জেবিনিয়ানা শহরেও এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভ হয়েছে। তাঁর স্বজনদের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে তিনি মারা যান। সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি গাড়িতে আগুন দেন। পুলিশের সঙ্গে সেখানেও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে হাজারো মানুষ। তিউনিস, ১৭ অক্টোবর ২০২৬স্ফ্যাক্স শহরে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভ করেছেন তাঁর সহপাঠীরা। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিতে দেরিতে অ্যাম্বুলেন্স আসায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ সহপাঠীদের। তাঁরা চিকিৎসাসেবার ঘাটতির কথা তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
তিউনিসিয়ায় এমন এক সময়ে এসব বিক্ষোভ হচ্ছে, যখন জীবনযাত্রার মান, সরকারি সেবা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এর আগে ১৭ অক্টোবর দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল।
জার্মানি
জার্মানির ২১টি শহরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন তরুণেরা। ৩১ অক্টোবর এসব কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য ও বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে তাঁরা বিক্ষোভ করবেন।
‘জেন জেড রেগেল্ট’ নামের তরুণদের একটি সংগঠন এ বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এতে হাজারো মানুষ অংশ নেবেন।
সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঘিরে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পুলিশের আশঙ্কা, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বিক্ষোভকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা মানুষ বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরোধী।
গ্রিসে জীবনযাত্রা ও শিক্ষা–সংকট কতটা তীব্র, কেন হাজারো শিক্ষার্থী রাজপথে