এক ম্যাচের ভুলে যে গোলকিপারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ

· Prothom Alo

বিদেশে কাজের ভিসা পাওয়া অনেকেই জানেন, ওয়ান–ওয়ে টিকিটের ওজন কতটা। ফেরার তারিখের ঘরটা ফাঁকা থাকে। প্রথম প্রথম সেই ফাঁকা ঘর স্বাধীনতার মতো লাগে। তারপর একদিন টের পাওয়া যায়, ফিরতে চাইলেও আর টিকিট কাটা যাচ্ছে না।

Visit extonnews.click for more information.

মিলে সভিলার সেই টিকিটটা কেটেছিলেন এক বুধবার সন্ধ্যায়।

২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। হাঙ্গেরির শহর দেব্রেচেনে কাতারের মুখোমুখি সার্বিয়া। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ঠিক ১৪ মাস আগে কাতারের প্রস্তুতি ম্যাচ। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ৪-০ ব্যবধানে জিতল সার্বিয়া। পাঁচ বছর পর সেই ম্যাচের কথা মনে রাখার কথা নয় কারও। ম্যাচে যাঁরা ছিলেন, তাঁদেরও বেশির ভাগের নয়।

একটি মাত্র ম্যাচ খেলার পর ফিফার 'ওয়ান-ওয়ে রুল' নিয়মের বেড়াজালে আটকে গিয়ে জন্মভূমির হয়ে খেলার সমস্ত দরজাও চিরতরে বন্ধ করে ফেলেন সভিলা।

সভিলারের কথা আলাদা।

বিরতির সময় প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের জায়গায় নামলেন ২২ বছরের এই গোলকিপার। সার্বিয়ার হয়ে অভিষেক। অথচ পাঁচ বছর পরও ওই সাদামাটা বুধবারটা তাঁর পিছু ছাড়ে না।

কারণটা সহজ, এবং নিষ্ঠুর! সেই ম্যাচের পর বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আরও চারটি ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন সভিলার, মাঠে নামেননি একটিতেও। ২৭ বছর বয়সে এসে আজও সার্বিয়ার হয়ে তাঁর ম্যাচ ওই একটিই। অথচ গত মৌসুমে সিরি ‘আ’র সেরা গোলকিপারের পুরস্কার পেয়েছেন। রোমার জার্সিতে এখন ইউরোপের সেরা কিপারদের একজন।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্ডারলেখট ছেড়ে বেনফিকায় যোগ দেওয়া এবং সেখানে সিনিয়র দলে প্রথম সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের পাদপ্রদীপে আসেন সভিলা।

সভিলার জন্মেছেন বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে, ১৯৯৯ সালের আগস্টে। বেড়ে ওঠাও সেখানেই। বাবা রাতকো সভিলার ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গোলকিপার, খেলেছেন ৯ ম্যাচ। ১৬ বছর রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পের গোলবারের নিচে কাটিয়ে ১৯৯৬ সালে পেশাদার ফুটবল ছাড়েন।

ছেলের গল্পটা শুরু হয় বাবার ছায়া ধরে। ১০ বছর বয়সে বেয়ারশট থেকে ব্রাসেলসের আন্ডারলেখটে। তারপর বেলজিয়ামের প্রতিটি যুব দল, অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে। ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে অসাধারণ খেলে সবার নজর কাড়েন। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্ডারলেখট ছেড়ে বেনফিকায় যান, সেখানেই সিনিয়র দলে প্রথম ম্যাচ। ওই অনূর্ধ্ব-১৭ আসরের সময় উয়েফা ডটকমকে সভিলার বলেছিলেন, ‘বাবার কাছ থেকে অনেক শিখেছি, প্রায় সবকিছুই। আমার খেলার ধরনও বাবার মতো।’

নীল জলের ছেলেটিই মেসির উত্তরসূরি

বাবার মতো খেলা—সম্ভবত সেই টানেই কয়েক বছর পর বাবার দেশকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সভিলার। বাবাও উৎসাহ দিয়েছিলেন। হিসাবে ছিল খেলাধুলার যুক্তি, আর ছিল রক্তের টান। যে সিদ্ধান্ত তাঁকে আজও ভোগাচ্ছে, তার একটা অংশ নিয়েছিলেন বাবাই।

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সভিলারের রক্তে ছিল ফুটবলের টান; যুগোস্লাভিয়ার হয়ে খেলা বাবা রাতকো সভিলারের ছায়া ধরে শুরু হয়েছিল যাঁর পথচলা।

বেলজিয়াম দলের দরজা তখনো বন্ধ ছিল না, তবে খোলাও ছিল না। গোলবারের নিচে তখন থিবো কোর্তোয়া। ২০২১ সালে তাঁর বয়স ২৯, গোলকিপার হিসেবে সবে সেরা সময়ে ঢুকছেন। সভিলার ও তাঁর বাবা সম্ভবত তখনই বুঝেছিলেন, মধ্য মেয়াদে বেলজিয়ামের এক নম্বর হওয়া ভীষণ কঠিন। বেলজিয়ামের সিনিয়র দলে ডাক পাননি, যুব পর্যায়ে খেলেন ২৬টি ম্যাচ। ২২ বছর বয়সে সার্বিয়ার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ফেডারেশন বদলালেন।

কিন্তু সার্বিয়ায় অপেক্ষা করছিল আরেক ধরনের দেয়াল। তখন রাইকোভিচ এক নম্বর, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার জন্য তৈরি ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচ। পরের বছরগুলোয় সার্বিয়া মোটামুটি এ দুজনকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়েছে। ফেডারেশন বদলের এত ঝক্কি পোহানোর পর সভিলার হয়তো আশা করেছিলেন, দ্রুতই মূল গোলকিপার হয়ে উঠবেন। হয়নি। তাই খুব তাড়াতাড়িই আফসোস শুরু।

২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাঙ্গেরির দেব্রেচেনে কাতারের বিপক্ষে সার্বিয়ার জার্সিতে মাঠে নেমে যিনি ক্যারিয়ারের প্রথম ও একমাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেছিলেন সাভিলা।

সার্বিয়ার হয়ে আর খেলতে চাইলেন না সভিলার। ফিরতে চাইলেন বেলজিয়ামে। আর এখানেই ফিফার বিধি দেয়াল তুলে দাঁড়াল।

‘ওয়ান-ওয়ে রুল’ বলে পরিচিত এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ফেডারেশন বদলে নতুন দেশের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে একটি ম্যাচ খেললেই সেটা প্রস্তুতি ম্যাচ হোক বা প্রতিযোগিতামূলক, আগের দেশে আর ফিরতে পারেন না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের বিপক্ষে ঠিক সেটাই করেছিলেন সভিলার। বেলজিয়ামের হয়ে তাঁর আর খেলা হবে না।

লিভারপুলে ‘নির্মম’ হয়ে ওঠা কে এই কিশোর

তবু থামেননি রোমার এই গোলকিপার। ২০২২ সালে বেনফিকা থেকে ইতালিতে আসার পরও বছরের পর বছর ফিফার কাছে ছাড় চেয়েছেন। ২০২৪ সালের বসন্তে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো বলেছিলেন, ‘আমরা অবশ্যই কয়েক মাস ধরে তাকে অনুসরণ করছি। কিন্তু এটা পরিষ্কার, সে আমাদের হয়ে খেলতে পারবে না।’ বেলজিয়াম ফেডারেশনও যে সম্ভাবনাটা ভেবে দেখেছিল, সেটা এই মন্তব্যেই নিশ্চিত।

বেলজিয়ামের গোলবারের নিচে থিবো কোর্তোয়ার অবিসংবাদিত উপস্থিতি আর দীর্ঘ অপেক্ষার আশঙ্কায় সভিলার ২২ বছর বয়সে সার্বিয়ার প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছিলেন ফেডারেশন বদলাতে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগে আবারও নাকি ফিফাকে রাজি করাতে চেয়েছিলেন সভিলার। আবারও খালি হাতে ফেরা।

সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যটা সম্ভবত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। স্পেনের বিপক্ষে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লেন কোর্তোয়া। ৭১ মিনিটে তাঁর জায়গায় নামলেন সেনে লামেন্স। ম্যাচে শেষ দিকে লামেন্সের ভুলেই পরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন ২-১ গোলে এগিয়ে গেল। সেদিন টিভির সামনে বা গ্যালারির কোথাও বসে থাকলে সভিলারের হাত-পা নিশ্চয়ই নিশপিশ করেছে। ওই ৭১ মিনিটে নামার কথা হয়তো তাঁরই ছিল।

একটি মাত্র ম্যাচ খেলার পর ফিফার 'ওয়ান-ওয়ে রুল' নিয়মের বেড়াজালে আটকে গিয়ে জন্মভূমির হয়ে খেলার সমস্ত দরজাও চিরতরে বন্ধ করে ফেলেন সভিলা।

গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মের সর্বশেষ হতাশার পরও আশা ছাড়েননি সভিলার। বেলজিয়ামে ফেরার ইচ্ছাটা এখনো আছে। অথচ সার্বিয়ার হয়ে খেলার দরজা খোলা। সম্ভবত তাঁকে সেখানে আজও স্বাগত জানানো হবে। ২০২৫ সালে অন্তত হতো, সার্বিয়ার কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচের কথাতেই তার প্রমাণ। বছরখানেক আগে টিভি অ্যারেনা স্পোর্টকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দলের হয়ে আর খেলবে না। আমি দুঃখিত। আমি চেষ্টা করেছি ওকে দেখাতে যে সে গুরুত্বপূর্ণ, চাইলে জাতীয় দলে তার জায়গা আছে।’

ফুটবলারদের পারিশ্রমিক: রোনালদো–মেসির আয় কত বাড়ল

কোচ ডাকছেন, দরজা খোলা, তবু ফেরেন না সভিলার। কারণ, তিনি যে দেশে ফিরতে চান, তার দরজা তালাবন্ধ।

ওয়ান-ওয়ে টিকিটের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা বোধ হয় এটাই। টিকিটটা বদলানো যায় না, কিন্তু যে গন্তব্যে নামিয়ে দিল, সেখানে মন বসাতেও কেউ জোর করতে পারে না।

দেব্রেচেনের সেই বুধবারে মিলে সভিলার হয়তো ভেবেছিলেন, একটা ম্যাচই তো। জানতেন না, ওই নব্বই মিনিটের অর্ধেকটা তাঁর পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়ে থাকবে।

৬৩ বছরে কোনো গোলকিপার কেন ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি

Read full story at source