মরিনিওর সর্বশেষ সেই এল ক্লাসিকোর নায়কেরা এখন কে কোথায়

· Prothom Alo

সময় কত কিছুই না বদলে দেয়! একসময় যাঁরা ছিলেন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নায়ক, তাঁদের কেউ এখন মাছ ধরেন, কেউ ফুটবলার তৈরির কারিগর। কেউ কোচিংয়ে নাম লিখিয়েছেন, কেউ ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদে। আবার কেউ বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এখনো ফুটবল মাঠে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
সময় বদলেছে, বদলেছেন জোসে মরিনিওও। তবে একটা জায়গায় যেন সময় থমকে আছে। সেই জায়গার নাম এল ক্লাসিকো।

২০১৩ সালের মার্চ। বার্সেলোনার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে শেষবার দাঁড়িয়েছিলেন মরিনিও। সেদিন করিম বেনজেমা ও সের্হিও রামোসের গোলে বার্সেলোনাকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল রিয়াল। বার্সার একমাত্র গোলটি করেছিলেন লিওনেল মেসি।

Visit raccoongame.org for more information.

তারপর কেটে গেছে ১৩ বছরের বেশি। এই সময়ে কত ক্লাবের দায়িত্ব নিয়েছেন মরিনিও, কত প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়েছেন। কিন্তু বার্সেলোনার মুখোমুখি আর হননি। অবশেষে সেই অপেক্ষা শেষ হচ্ছে। আজ আবার এল ক্লাসিকোর ডাগআউটে দাঁড়াতে যাচ্ছেন পর্তুগিজ কোচ। লা লিগায় দুর্দান্ত ছন্দে থাকা বার্সেলোনার বিপক্ষে এবার রিয়ালের সামনে ব্যবধান কমানোর চ্যালেঞ্জও।

কিন্তু ১৩ বছর আগের সেই রিয়াল দলটির কী হলো? মরিনিওর শেষ এল ক্লাসিকোর একাদশে থাকা ১১ ফুটবলার এখন কোথায়, কী করছেন?

এল ক্লাসিকোর ফল ঠিক করে দিতে পারে যে পাঁচ প্রশ্নের উত্তর

দিয়েগো লোপেজ: বিতর্ক থেকে কোচিংয়ে

মরিনিওর রিয়াল অধ্যায়ের অন্যতম বিতর্ক ছিল ইকার ক্যাসিয়াসকে সরিয়ে দিয়েগো লোপেজকে গোলপোস্টের দায়িত্ব দেওয়া। সেই লোপেজ চল্লিশ পেরিয়েও খেলেছেন। তিন বছর আগেও তাঁকে দেখা গেছে লা লিগায়। মাদ্রিদের ক্লাব রায়ো ভায়েকানোয় এক মৌসুম কাটিয়ে অবশেষে গ্লাভস তুলে রাখেন।

অবসরের পর আবার রিয়ালে ফেরেন লোপেজ। এবার কাস্তিয়া দলের গোলকিপিং কোচ হিসেবে। পরে মূল দলের গোলকিপিং কোচ সাময়িক নিষিদ্ধ হলে মরিনিও তাঁকে অস্থায়ীভাবে মূল দলের কোচিং স্টাফে নিয়ে আসেন।

একসময় যাঁকে নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন মরিনিও, সেই লোপেজই এখন তাঁর সহকারী!

সের্হিও রামোস: শেষ নাচের অপেক্ষা

সাবেক রিয়াল অধিনায়ক রামোস।

রামোসের বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। কিন্তু বুটজোড়া তুলে রাখার ইচ্ছা এখনো নেই। গত ডিসেম্বরে মেক্সিকোর মন্তেরেই ছাড়ার পর থেকে অবশ্য ক্লাবহীন এই কিংবদন্তি ডিফেন্ডার। তাঁর সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে হেতাফে। ক্লাবটি এরই মধ্যে বিনা ট্রান্সফার ফিতে দানি কারভাহালকে দলে নিয়েছে। রামোসকেও নিতে আগ্রহী তারা।

হেতাফের সভাপতি আনহেল তোরেস রেডিও নাসিওনালকে বলেছেন, ‘সে আসতে পারে। কারণ, অনেক দিন ধরেই আমরা বিষয়টি নিয়ে ভাবছি। সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের তালিকায় সে আছে।’

রামোসের মতো ফুটবলারের ক্যারিয়ার নিশ্চয়ই নীরবে শেষ হওয়ার নয়। হয়তো অপেক্ষায় আছে শেষ কোনো চমক।

বড় জয়ে এল ক্লাসিকোর প্রস্তুতি সারল রিয়াল মাদ্রিদ

রাফায়েল ভারান: মাঠ থেকে পরিচালনা পর্ষদে

রামোসের রক্ষণসঙ্গী রাফায়েল ভারানের শেষটা অবশ্য সুখকর হয়নি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ছাড়ার পর ইতালির কোমোয় যোগ দিয়েছিলেন ফরাসি ডিফেন্ডার। কিন্তু মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই চোটের কারণে ক্যারিয়ার শেষ করতে হয় তাঁকে। তবে কোমো তাঁকে ছাড়েনি। অবসরের পর ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য করা হয় ভারানকে। তাঁর দায়িত্ব মূলত তরুণ ফুটবলারদের উন্নয়ন। নতুন দায়িত্ব নিয়ে ভারান বলেছিলেন, ‘মাঠ থেকে বোর্ডরুমে যাওয়া মানে আমার ফুটবলযাত্রার শেষ নয়। বরং এটা নতুন শুরু।’

১০ মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদে কাটিয়েছেন পেপে

পেপে: ফুটবল ছাড়লেও ফুটবল তাঁকে ছাড়েনি

২০২৪ সালে অবসর নেন পর্তুগালের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পেপে। শেষ পাঁচ বছর খেলেছেন নিজের পুরোনো ক্লাব পোর্তোয়।

গত গ্রীষ্মে পেপেকে নিজের কোচিং স্টাফে নেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছিলেন মরিনিও। তবে এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। মাঝেমধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তিদের প্রীতি ম্যাচে দেখা যায় পেপেকে।

ফাবিও কোয়েন্ত্রাও: ফুটবল ছেড়ে সমুদ্রের মানুষ

এই একাদশের সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটা সম্ভবত ফাবিও কোয়েন্ত্রাওয়ের। ফুটবল ছেড়ে কেউ কোচ হন, কেউ ধারাভাষ্যকার। কোয়েন্ত্রাও বেছে নিয়েছেন মাছ ধরা। এখন তিনি পুরোদস্তুর জেলে ও মাছ ধরার নৌকার মালিক। পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁকে ফিরিয়ে নিয়েছে সমুদ্রে। ২০২১ সালে বলেছিলেন, ‘আমার বাবার নৌকা ছিল। তিনি মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমিও তাঁর সঙ্গে যেতাম। আমার জীবন ছিল সমুদ্র, সমুদ্র আর মাছ ধরা। জানতাম, একদিন ফুটবল শেষ হবে। তখন জীবনের নতুন পথ খুঁজতে হবে। এই নৌকাতেই আমার সুখ।’

তবে নতুন জীবনেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। ২০২৫ সালে অনুমোদনহীন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে পর্তুগিজ কর্তৃপক্ষ ফাবিওর কাছ থেকে এক টনের বেশি ঝিনুকজাতীয় সামুদ্রিক খাবার জব্দ করে।

মাইকেল এসিয়েন: ঘানার প্রতিভা গড়ার কারিগর

ঘানার সাবেক মিডফিল্ডার মাইকেল এসিয়েন ২০২০ সাল থেকে ডেনমার্কের ক্লাব নর্ডসিয়াল্যান্ডের সহকারী কোচ। ক্লাবটির সঙ্গে ঘানার রাইট টু ড্রিম একাডেমির অংশীদারত্ব রয়েছে। এই একাডেমি থেকেই উঠে এসেছেন মোহাম্মদ কুদুস, সিমন আদিংগ্রা ও কালেব ইয়েরেঙ্কির মতো ফুটবলার। এসিয়েনের কাজ এখন ঘানাসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রতিভাদের তৈরি করা। একসময় নিজে মাঠের মধ্যমণি ছিলেন, এখন অন্যদের সেই জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

লুকা মদরিচ: বয়স যেখানে শুধুই সংখ্যা

রিয়ালে ক্যারিয়ারের শুরুটা ভালো হয়নি লুকা মদরিচের। তখন অনেকেই তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু মরিনিও আস্থা হারাননি। পরের গল্পটা তো ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ। এক দশকের বেশি সময় রিয়ালে কাটিয়ে ২০২৫ সালে এসি মিলানে যোগ দেন ক্রোয়েশিয়ার এই মিডফিল্ডার। ইতালিয়ান সিরি ‘আ’তে প্রথম মৌসুমেই ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। ৪১ বছর বয়সেও মদরিচের থামার নাম নেই। তাঁর সমবয়সী কোচ রুবেন আমোরিম চলতি মৌসুমে মিলানের প্রথম সাতটি লিগ ম্যাচেই তাঁকে খেলিয়েছেন। মদরিচ যেন ফুটবলকে বোঝাচ্ছেন, বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের হিসাব!

সেই ম্যাচে গোলের পর মদরিচ ও রামোসের উল্লাস।

হোসে কায়েখন: আলো থেকে আড়ালে

২০২৫ সালে স্পেনের তৃতীয় বিভাগের ক্লাব মারবেইয়ায় এক মৌসুম কাটিয়ে অবসর নেন হোসে কায়েখন। তবে ফুটবলের টান পুরোপুরি কাটাতে পারেননি। পরে নিজের শহরের ক্লাব পুয়ের্তো মোত্রিলে নিচের বিভাগের ফুটবলে অল্প সময়ের জন্য ফিরে আসেন এই উইঙ্গার। আপাতত অবশ্য প্রচারের আলো থেকে দূরেই আছেন।

এই ভিনিসিয়ুস আসল নাকি ‘নকল’

কাকা: ব্রাজিলের ডাগআউট কি ডাকছে

সাবেক রিয়াল মিডফিল্ডার কাকা

২০১৭ সালে ফুটবলকে বিদায় জানান ব্রাজিলের সাবেক ব্যালন ডি’অরজয়ী কাকা। এরপর ফিফার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে যুক্ত আছেন ক্রীড়া বিপণনের সঙ্গে। তবে কোচ হওয়ার স্বপ্নও পুরোপুরি ছাড়েননি। এ বছর ইতালির গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তকে বলেছেন, ‘এখন ক্রীড়া বিপণনে কাজ করছি। ভবিষ্যতে কী আছে, কে জানে!’

কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল দলের কোচিং স্টাফে যোগ দেওয়ার আলোচনাতেও নাম এসেছে কাকার। ২০২৫ সালে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘২০১৭ সালে খেলা ছেড়েছি। তারপর থেকেই নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডে স্পোর্টস বিজনেস নিয়ে পড়েছি। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনে কোচিং কোর্স করেছি। জাতীয় দল ও বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাও আছে। সুযোগ এলে ব্রাজিল জাতীয় দলের সেবায় ফিরতে প্রস্তুত।’

আলভারো মোরাতা: আবার দ্বিতীয় বিভাগে

মরিনিওর হাত ধরেই রিয়ালের মূল দলে উঠে এসেছিলেন আলভারো মোরাতা। এরপর জুভেন্টাস, চেলসি, আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো ক্লাবে খেলেছেন। গড়েছেন বেশ সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার। কিন্তু সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন স্পেনের এই স্ট্রাইকার। গত মৌসুমে কোমোর হয়ে ৩০ ম্যাচে মাত্র একটি গোল করেছিলেন। এখন সেই কোমো থেকে ধারে খেলছেন লেগানেসে। ফলে ২০১২-১৩ মৌসুমে রিয়ালের কাস্তিয়া দলের হয়ে খেলার পর প্রথমবার স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে ফিরেছেন মোরাতা। লেগানেসের হয়ে এখনো গোল পাননি। সর্বশেষ ম্যাচে দুই হলুদ কার্ড দেখে মাঠও ছাড়তে হয়েছে তাঁকে।

করিম বেনজেমা: শেষ অধ্যায়ের অনিশ্চয়তা

২০১৩ সালের সেই এল ক্লাসিকোয় রিয়ালের প্রথম গোলটি করেছিলেন করিম বেনজেমা।

২০১৩ সালের সেই এল ক্লাসিকোয় রিয়ালের প্রথম গোলটি করেছিলেন করিম বেনজেমা। ১৩ বছর পর ফরাসি স্ট্রাইকারের ভবিষ্যৎই সবচেয়ে অনিশ্চিত। গত গ্রীষ্মে সৌদি আরবের আল হিলালের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান বেনজেমা। কিন্তু এখনো ঝামেলাটা মেটাতে পারেননি। ক্লাবটির হয়ে ১৬ ম্যাচে করেছিলেন ১০ গোল। এরপর শোনা গেছে, শৈশবের ক্লাব লিওঁতে ফিরতে পারেন। কিন্তু ফরাসি ক্লাবটির ক্রীড়া পরিচালক মাতিয়ু লুই জাঁ সেই সম্ভাবনা বাতিল করে দেন।

বেনজেমা এখনো সৌদি প্রো লিগের সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ। ফলে ইউরোপে ফেরার পথ সহজ নয়। বরং অবসরই হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত বিকল্প।

এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছেন মরিনিওর সেই একাদশের ফুটবলাররা। কেউ সমুদ্রে, কেউ বোর্ডরুমে, কেউ কোচিংয়ে, কেউ আবার শেষবারের মতো মাঠে নামার অপেক্ষায়। শুধু মরিনিও আবার ফিরে এসেছেন সেই পুরোনো যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রতিপক্ষের নাম বার্সেলোনা, লড়াইয়ের নাম এল ক্লাসিকো।

Read full story at source