নন্দনকাননের আকাশে আলোর মিছিল, হৃদয়ে জাগুক মানবতার বোধ

· Prothom Alo

প্রবারণা পূর্ণিমায় চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারের আকাশে হাজারো ফানুস ছড়ায় আলোর আবেশ। বুদ্ধের করুণা, মৈত্রী ও অহিংসার বাণী মনে করিয়ে দেয় মানবতার চিরন্তন আহ্বান।

Visit een-wit.pl for more information.

চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হাজারো ফানুস উড়িয়েছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। রাতের আকাশে একের পর এক ফানুস যখন মিটিমিটি আলো ছড়িয়ে দূর আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন মনে হয়, অন্ধকারের বুক চিরে মানুষ যেন উড়িয়ে দিচ্ছে শান্তি, মৈত্রী ও মানবতার একেকটি স্বপ্ন। আলোয় ভরা এই দৃশ্য কেবল ধর্মীয় উৎসবের সৌন্দর্য নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, সংযম ও সত্যের পথে এগিয়ে চলার মহৎ শিক্ষা।

প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। সাধারণত আশ্বিনী পূর্ণিমায় পালিত হয় এই উৎসব। এদিন বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে। ‘প্রবারণা’ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আত্মসমালোচনা, ভুল স্বীকার এবং অন্যের কাছ থেকে নিজের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ গ্রহণের তাৎপর্য। এ উপলক্ষে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পরস্পরের কাছে নিজেদের ভুলত্রুটি তুলে ধরার সুযোগ দেন। এর মধ্য দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করা, অহংকার ত্যাগ করা এবং আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা প্রতিফলিত হয়।

বৌদ্ধ ঐতিহ্যে প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে ফানুস ওড়ানোর রীতিও গভীরভাবে জড়িত। তবে এই প্রথা ঠিক কখন, কোথায় ও কীভাবে প্রথম শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে সর্বত্র একক কোনো ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বৌদ্ধ সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচারের মধ্য দিয়ে এই রীতি বিকশিত হয়েছে। অনেক স্থানে ফানুস ওড়ানোকে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, পুণ্যকর্ম এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত বিশ্বাসে, আকাশে ফানুসের ঊর্ধ্বগমন অশুভ চিন্তা, হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে শুভবোধ জাগিয়ে তোলার প্রতীকী বার্তা বহন করে।

নন্দনকানন বৌদ্ধ বিহারের আকাশে যখন শত শত ফানুস জ্বলে ওঠে, তখন সেই আলো যেন মানুষের অন্তরের অন্ধকারের দিকেও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই অন্যের দুঃখ বুঝতে শিখেছি? হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছি? বুদ্ধের শিক্ষা তো কেবল বিহারের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে মানুষের আচরণে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয়, অন্যের প্রতি সহনশীলতায়, প্রাণের প্রতি মমতায় এবং সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায়।

ফানুসের আলো তাই শুধু রাতের আকাশকেই আলোকিত করে না, মানুষের বিবেককেও জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানায়। বুদ্ধের অহিংসা, করুণা, মৈত্রী ও প্রজ্ঞার আদর্শ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করতে পারলেই ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ সার্থক হয়ে উঠবে। কারণ, ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য বিভেদে নয়, মিলনে; প্রতিযোগিতায় নয়, সহমর্মিতায়।

নন্দনকাননের রাতের আকাশে ভেসে চলা আলোকিত ফানুসগুলো একসময় দৃষ্টিসীমার বাইরে হারিয়ে যায়। কিন্তু তাদের প্রতীকী বার্তা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে—নিজে আলোকিত হও, অন্যের পথেও আলো ছড়াও। প্রবারণা পূর্ণিমা তাই শুধু ফানুস ওড়ানোর উৎসব নয়; এটি নিজের ভেতরকে পরিশুদ্ধ করা, অন্যের প্রতি মমতা জাগানো এবং মানবতার আলোয় পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলার এক অনন্য আহ্বান।

ছবি: লেখক

Read full story at source