বিস্মৃতির গভীর থেকে ফিরল বরেন্দার তেভাগা যোদ্ধাদের গল্প

· Prothom Alo

বিপ্লবী ইলা মিত্রের নেতৃত্ব সংঘটিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের ঘাঁটি অঞ্চল ছিল নেজামপুর ইউনিয়নের কেন্দুয়া, ঘাঁসুড়া, রাওতাড়া, চণ্ডীপুর, কুসমাডাঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম। একই ইউনিয়নের বরেন্দা গ্রামেও ছিলেন ইলা মিত্রের অনুসারী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও সমর্থকেরা। ১৯৫০ আন্দোলনের বিপর্যয় এবং ইলা মিত্রের গ্রেপ্তারের পর বরেন্দা গ্রামেও চলে ব্যাপক অভিযান। গ্রেপ্তার হন বেশ কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে সোমরা মুন্ডা পুলিশের নির্যাতনে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে মারা যান। কিন্তু কারাগার কর্তৃপক্ষ তাঁর লাশ পরিবারকে হস্তান্তর করেনি। ভয়ে পরিবারের লোকজনও খোঁজ নেয়নি। কারাভোগ শেষে অন্যরা বাড়ি ফিরে এলে জানা যায় সোমরা মুন্ডার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর।

বরেন্দা গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের এই কর্মীদের খবর নিতে এ পর্যন্ত কোনো লেখক বা গবেষক এ গ্রামে আসেননি বলে জানান পরিবারের লোকজন। তাঁদের আক্ষেপ, আন্দোলনের সেই সব স্মৃতি বিস্মৃতিতে হারিয়ে গেছে। প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’–এর অংশ হিসেবে ২৪ অক্টোবর বিকেলে বরেন্দা গ্রামে গিয়ে আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের লোকজনকে সম্মাননা জানিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভা। তাঁদের স্মরণে আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি গ্রামের স্কুলগামী শিশুদের শিক্ষা উপকরণ উপহার দেন বন্ধুরা।

Visit newssport.cv for more information.

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

গ্রামের দুর্গামন্দিরে বন্ধুসভার সভাপতি মাসরুফা খাতুনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি ঝড়ু মুন্ডা (৮৮)। তিনি আন্দোলনের সময় ১২ বছরের বালক ছিলেন। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘যখুন ধরপাকড় চলছোলো, তখুনি হামি গরু চরাছুনু। তখুন পুলিশেরা গুলিও ফুটায়। গরু থুয়্যা হামি দৌড় মারি।’

ঝড়ু মুন্ডা জানান, সোমরা মুন্ডা তাঁর ফুফা। রাজশাহী কারাগারে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ পরিবারের কাছে লাশ ফিরিয়ে দেয়নি। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর লোকমুখে সেই খবর পান। স্বজনেরা ভয়ে কেউ কারাগারে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেননি।

ঝড়ু মুন্ডা আরও জানান, দীর্ঘদিন কারাবাসের পর ফিরে আসেন আন্দোলনের কর্মী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও বরেন্দা গ্রামের নগেন মুন্ডা। তাঁর সঙ্গে হাসরু ওঁরাও, লুগু ওঁরাও, বাবলা মুন্ডা, মাকুয়া ওঁরাও ছিলেন। তখন সোমরা মুন্ডার মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। বাবলা মুন্ডা ও মাকুয়া ওঁরাও বৃদ্ধ বয়সেই কারাভোগ করেছিলেন। গ্রাম থেকে তাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কারাগারে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। গ্রামের একজন মুসলিম জোতদার পুলিশকে তাঁদের বিষয়ে তথ্য দেন। নগেন মুন্ডার বাড়িতে তল্লাশি করে পাওয়া যায় কমিউনিস্ট পার্টির চাঁদা আদায়ের রসিদ বই। তাঁর ওপরই নির্যাতন হয় বেশি। ইলা মিত্রের সহযোদ্ধা বাবলা মুন্ডা, হাসরু ওঁরাও, মাকুয়া ওঁরাও বাবলা মুন্ডার স্বজনদের কেউ আর দেশে নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

নগেন মুন্ডার ছেলে রতি মুন্ডা (৬৫) বলেন, ‘কারাগার থেকে বাড়ি ফিরে এসে বাবা বিয়ে করেন। বাবা গল্প করতেন আন্দোলনের সময়কার ঘটনার। বলতেন, “আমরা শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি করতাম।” আমিও বাবার আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) রাজনীতি করি, সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করি। বাবা তো মেহনতি মানুষদের জিতিয়ে যেতে পারেননি। আমার জীবদ্দশায়ও জিত হবে বলে মনে হয় না। তবে আমার সন্তানদের সময় হবে বলে বিশ্বাস করি।’

গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সভাপতি টুনু পাহান বলেন, ‘গ্রামের হাতে গোনা কিছু বয়স্ক লোক ছাড়া এ কাহিনির কথা কেউ জানত না। বন্ধুসভার এমন আয়োজনের কারণে আজ গ্রামের অনেকেই জানল। তেভাগা আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হলো। শিশুদের শিক্ষা উপকরণ দিল। এই প্রথমবারের মতো গ্রামের তেভাগা আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে আলোচনা হলো। তাঁরা তো বিস্মৃতির গভীরে হারিয়ে যাওয়া মানুষ। ইলা মিত্রকে নিয়েও আলোচনা হলো। এই সবকিছুর জন্য বন্ধুসভাকে মন থেকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার একটি ভালো কাজ।

সভায় আরও বক্তব্য দেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা আনোয়ার হোসেন ও মনোয়ারা খাতুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাবুডাইং আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক আলীউজ্জামান নূর, সহকারী শিক্ষক নয়ন আহমেদ, উজ্জ্বল পাহান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক রামিজ আহমেদ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মুশফিক মাহাদি, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মেরাজুল ইসলাম, বন্ধু মো. নাসিফ প্রমুখ।

সভা শেষে তেভাগা আন্দোলনের প্রয়াত কর্মীদের পরিবারের ২০ জন সদস্যকে ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।

সভাপতি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভা

Read full story at source