নারীর স্বাধীনতায় বাধা, কোন পথে হাঁটছে দেশ

· Prothom Alo

দুটি ঘটনা দুই দেশের, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে অদৃশ্য সুতোর টান।

Visit esporist.com for more information.

প্রথমটি আফগানিস্তানের। সাত সন্তানের মা দীবা, স্বামী ইরানে কাজ করেন। সেলাই করে সংসার চালান তিনি। বিদ্যুৎ না থাকায় ফোন চার্জ করতে ও স্যান্ডউইচ কিনতে এক দোকানে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির তালেবানের নৈতিকতা পুলিশ। মাহরাম বা অনুমোদিত পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বাইরে এসেছেন, এই অভিযোগে প্রথমে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিন জেলে রাখা হয়। পরে এক তালেবান আদালতে মাথা মুড়ে সবার সামনে ২৫ দোররা বা চাবুকের শাস্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনা প্রকাশ করেছে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঢাকার। গত ৮ আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে নেপাল যাওয়ার মুখে তিন নারীকে আটকে দেওয়া হয়। তাঁরা অবিবাহিত এবং সঙ্গে পুরুষ অভিভাবক নেই, এই অভিযোগে যেতে দেওয়া হয়নি। পরিবারের অনুমতি নিয়েই যাচ্ছিলেন, সে কথা বলার পরও এক কর্মকর্তা তাঁদের একজনের বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, কৃষকের মেয়ে কী করে বিদেশভ্রমণের খরচ জোগায়।

বিমানবন্দর থেকে বাংলাবাজার: কার মর্জিতে চলবে আইন?

ঢাকা বিমানবন্দরের ঘটনাটি আমাদের সবার সামনে একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে; একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশ যাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার—তাঁর নিজের, না বিমানবন্দরে বসা কোনো কর্মকর্তার?

২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে আইন করে মেয়েদের মাহরাম বা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো তেমন কোনো আইন নেই। কিন্তু অলিখিত সেই আইন আমাদের স্বনিয়োগকৃত নীতি পুলিশরা নিয়মিত প্রয়োগ করছেন।

বিমানের ঘটনাটি একমাত্র ঘটনা নয়। এ বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সুনামগঞ্জে স্থানীয় আলেমদের আপত্তির পর নারীদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত করা হয়। চলতি সপ্তাহেই সুনামগঞ্জের হাতিয়া গ্রামে নারী শিল্পীদের নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বাউলগানের আসর বাতিল করা হয়। কিন্তু আপত্তি সত্ত্বেও গানের আসর বসেছিল, নারী শিল্পীরাও গান গেয়েছেন।

নারী তার অধিকার এক দিনে হারায় না। একেকটি মাঠ, একেকটি রাস্তা, একেকটি স্কুল তাদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কখনো প্রকাশ্যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে, যেমন ঘটছে আফগানিস্তানে। কখনো তা ঘটে স্ব–আরোপিত নৈতিকতার যুক্তিতে, যেমন ঘটছে বাংলাদেশে। দুটোই নারীর অধিকার ও মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।

মেয়েদের পোশাক নিয়ে কুকথা শোনা তো নিত্যদিনের ঘটনা। সরকারের এক নারী উপদেষ্টা ও এক নারী সংসদ সদস্যকে মাথায় কাপড় না দেওয়ায় হেনস্তার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী কর্মীদের শালীন পোশাক পরার নির্দেশনা দেওয়ার পর প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরেও রাত ১০টার পরে এক ছাত্রী প্রবেশ করতে গিয়ে প্রক্টরিয়াল বডির বাধার মুখে পড়েছিলেন। পরে ছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে প্রক্টরের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। 

কোথাও মাঠে, কোথাও কর্মক্ষেত্রে, কোথাও বিমানবন্দরে নারীকে একই বার্তা দেওয়া হচ্ছে: তুমি কত দূর যাবে, কী পরবে, কোথায় খেলবে—তার শেষ কথা তুমি নও।

আরও বেদনাদায়ক হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা ছিলেন রাজপথের সাহসী মুখ। ক্ষমতার পালাবদলের পর সিদ্ধান্তের টেবিলে কার্যত তাঁদের কোনো জায়গা নেই। ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী মাত্র সাতজন। ইসলামি দলগুলো একজন নারীকেও প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়নি। প্রতিবাদে নারীকে প্রয়োজন, কিন্তু ক্ষমতা ভাগের সময় তাঁকে পেছনে রাখা হবে, এ কেমন পরিবর্তন?

আফগানিস্তানে নারীদের উচ্চশিক্ষা বন্ধের প্রতিবাদে নারী শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন

আইন ও ধর্মের যুক্তি

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর অধিকার খর্বের চেষ্টা হয় ধর্মের নামে। অথচ সত্যি কথা হলো ইসলামে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও কোনো বাধানিষেধ নেই, বরং উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মিসরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দার আল-ইফতা ২০১৩ সালের এক ফতোয়ায় নিরাপদ যাত্রার শর্তে নারীর মাহরাম ছাড়াই ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে।

নারী ও পুরুষদের সমানাধিকার বাংলাদেশের সংবিধানেই স্বীকৃত। ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের চোখে সমতা, ২৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও জনজীবনে নারীর সমান অধিকার, ৩৬ অনুচ্ছেদে দেশ ছেড়ে যাওয়া ও দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘের নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদদের ১৫(৪) অনুচ্ছেদেও চলাফেরার অধিকারে সমতার কথা আছে। বাংলাদেশ এই সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ।

আইনের এই স্বীকৃত বিধি অস্বীকার করে স্বনিয়োগকৃত নীতি পুলিশের আইন প্রয়োগের যেকোনো চেষ্টা মেনে নিলে একসময় সমাজ থেকে, কর্মক্ষেত্র থেকে নারীর দৃশ্যমানতা উবে যাবে। এই প্রবণতাগুলোকে কোনোভাবেই ‘মডেল’ হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। তবে তার চেষ্টা চলছে নানাভাবে, সে চেষ্টাকে ঠেকাতে হবে আইনের ভাষায়, প্রতিবাদের সংহতিতে।

সমান্তরাল আদালত, পলাতক রাষ্ট্র

সংগঠিত প্রতিরোধ

পুরুষের চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই মেয়েরা একটু একটু করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। নারীর এই সংগ্রাম আমাদের সভ্যতার সমান পুরোনো। দুই হাজার বছর আগে রোমের নারীরা পোশাক, অলংকার ও চলাচলের বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন; তাঁদের প্রতিবাদের ফলে সে বিধিনিষেধ বাতিল হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটাধিকারের দাবিতে নারীদের বহু বছরের সংগ্রামের ফলে ১৯২০ সালে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে সে দাবির স্বীকৃতি মেলে।

মুসলিমপ্রধান দেশেও সাফল্য আছে। মরক্কোতে দীর্ঘ নারী আন্দোলনের পর ২০০৪ সালে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর বাধ্যতামূলক আনুগত্যের বিধান বাতিল হয়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১০ বছরের প্রচেষ্টায় ২০২২ সালে পরিবারের ভেতর যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন গৃহীত হয়। পাকিস্তানে ২০১৬ সালের সংস্কারে পরিবার ক্ষমা করলেই ‘অনার কিলিং’-এর শাস্তি এড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়। বাংলাদেশে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টায় ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন গৃহীত হয়।

‘পুরুষের চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই মেয়েরা একটু একটু করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।’

এই প্রতিটি ছোট ছোট জয় সংগঠিত আন্দোলনের ফল। এই লড়াই এত দিন মূলত মেয়েরা নিজেরাই চালিয়েছে। পুরুষ যদি তাতে হাত মেলায়, সমানাধিকার আন্দোলন আরও বেগবান হবে। বিমানবন্দরে অভিভাবকের অজুহাতে বাধা দিলে লিখিত কারণ চাইতে হবে। যেমন: বিমানবন্দরের ঘটনায় উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন তিন নারী। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন এবং রিট আবেদনকারী তিন নারী যে অভিযোগ করেছিলেন, তা নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঘটনা নথিভুক্ত করে অভিযোগ ও আইনি প্রতিকারের পথে এগোতে হবে। মেয়েদের ম্যাচ বন্ধের হুমকি এলে শিক্ষক, অভিভাবক, ক্রীড়া সংগঠক, জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের একসঙ্গে বলতে হবে: খেলাটি হবে, নিরাপত্তা প্রশাসন দেবে। সরকারি দপ্তরে বৈষম্যমূলক নির্দেশ এলে তার আইনগত ভিত্তি জানতে চাইতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলো মুখে মুখে নারীর অধিকারের মস্ত প্রবক্তা। তাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে—নারীকে তারা শুধু ভোটার হিসেবে চায়, না নেতা হিসেবেও। আর মসজিদ, বিদ্যালয় ও পাড়ার আলোচনায় এমন আলেম ও নারীদেরও জায়গা দিতে হবে, যাঁরা নারী-পুরুষের সমানাধিকারকে পরস্পরের শত্রু মনে করেন না।

অবিবাহিত নারী বিদেশে গেলে পুলিশের কী সমস্যা

আমরা কোন পথে যাব

নারী তার অধিকার এক দিনে হারায় না। একেকটি মাঠ, একেকটি রাস্তা, একেকটি স্কুল তাদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কখনো প্রকাশ্যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে, যেমন ঘটছে আফগানিস্তানে। কখনো তা ঘটে স্ব–আরোপিত নৈতিকতার যুক্তিতে, যেমন ঘটছে বাংলাদেশে। দুটোই নারীর অধিকার ও মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।

আজ যদি তিন তরুণীর বিমানযাত্রা, কয়েকজন মেয়ের ফুটবল খেলা কিংবা একজন সহকর্মীর নিজের পোশাক বেছে নেওয়ার অধিকারকে আমরা ‘তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাই, কাল হয়তো নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের অধিকার রক্ষায় পাশে দাঁড়ানোর লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

  • হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source