সাজেক অবরোধের সময়কার ঘটনা দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে পুরোনো ও বিদেশের ভিডিও
· Prothom Alo

‘আসসালামু আলাইকুম, পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি বাঁচাতে চান, তাহলে অতি দ্রুত এদের আইনের আওতায় আনা হোক। কারণ, এরা ইউপিডিএফ নামের একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশের কোনো সেনাবাহিনী, প্রশাসনকে পার্বত্য জেলার মধ্যে ঢুকতে দিচ্ছে না, একের পর এক ফায়ার করতেছে। অতএব ভিডিওটা শেয়ার করে বাংলাদেশ সরকার পর্যন্ত একটু পৌঁছে দিন।’
Visit palladian.co.za for more information.
এমন বক্তব্যসহ ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওর ওপরের অংশে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে অস্ত্র হাতে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। এরপর সারি করে রাখা অস্ত্রের দৃশ্য দেখানো হয়। নিচের অংশে এক তরুণকে বক্তব্যটি দিতে দেখা যায়।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৪ লাখ ৪৪ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে। এতে ১৭ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে, ১৪ হাজারের বেশিবার শেয়ার হয়েছে।
দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ‘Rongjali Narzary’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে অস্ত্র হাতে ভিডিওটির সঙ্গে হুবহু একই ভিডিও পাওয়া যায়। ২০ অক্টোবর সেখানে এটি প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতের আসামের কোকরাঝাড়ের বাসিন্দা। ওই প্রোফাইলে একই ধরনের আরও ভিডিও রয়েছে।
অর্থাৎ আসামের এক কনটেন্ট নির্মাতার প্রকাশিত ভিডিওকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনা বলে প্রচার করা হচ্ছে।
লিংক: এখানে
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে। অবরোধের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একাধিক ভিডিওতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের দেখা গেলেও যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওগুলো ভিন্ন দেশের ভিন্ন ঘটনার।
জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা) সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের সমঝোতা না হওয়ায় সাজেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। ২৭ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী আজ অবরোধের ষষ্ঠ দিন। চলমান এই কর্মসূচি সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে হচ্ছে।
২২ অক্টোবর ‘সাজেকে পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইউপিডিএফের গুলিবর্ষণ: সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তিন হাজার পর্যটক উদ্ধার’ শিরোনামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির খবর অস্বীকার করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে এ দাবি করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী২৫ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পাহাড়ে কয়েকটি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। পর্যটন মৌসুমকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা হয়। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
ছড়িয়েছে মিয়ানমারের পুরোনো ভিডিও
‘সাজেক ভ্যালি বন্ধ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ’—এমন দাবিতে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কয়েকজন তরুণকে গোল হয়ে বসে অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে দেখা যায়। তাঁদের মাঝখানে কয়েকটি অস্ত্র সাজিয়ে রাখা ছিল। ভিডিওর ওপর লেখা, ‘দাবি উঠেছে এরা এমন অস্ত্র পেলো কোথায়?’
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ১৭ লাখবার দেখা হয়েছে এবং এতে ১৪ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে।
দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ‘Kyaukse Revolution Army K.R.A’ নামের একটি ফেসবুক পেজ পাওয়া যায়। মিয়ানমারভিত্তিক এই পেজে গত ২২ সেপ্টেম্বর একই দৃশ্যের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
লিংক: এখানে
ভিডিওটির বার্মিজ ক্যাপশনের অর্থ, ‘সত্যি বলতে, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের মানুষের রক্তের অভাব নেই।’ অর্থাৎ সেখানে মানুষের সাহসের কথা বোঝানো হয়েছে। পেজটি নিজেদের মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয় এবং এ ধরনের প্রচারণামূলক ভিডিও প্রকাশ করে।
অন্যদিকে ২২ অক্টোবর রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার উজোবাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তবে আলোচিত ভিডিওটি এর প্রায় এক মাস আগে মিয়ানমারভিত্তিক পেজটিতে প্রকাশিত হয়েছিল।
সিনেমার শুটিংয়ের দৃশ্যকে বলা হচ্ছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা
২২ অক্টোবর সাজেকে সংঘর্ষের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দুই নারীসহ কয়েকজন পুরুষকে পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র হাতে অবস্থান করতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা আরাকান আর্মি ও ইউপিডিএফের সদস্য এবং অবরোধে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২১ অক্টোবর চালু করা ‘সুনীতা চাকমা’ নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওটি ৩ লাখ ৮০ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে।
ভিডিওটি গত ২৩ জুলাই ‘Derhasar Brahma’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়েছিল। ভিডিওর শিরোনামে হ্যাশট্যাগ দিয়ে এটিকে সিনেমার শুটিংয়ের নেপথ্যের দৃশ্য বা ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
লিংক: এখানে
পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, Derhasar Brahma একজন ক্যামেরা পারসন। তাঁর পেজে সিনেমাটি নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি পোস্টে ‘JT2’ হ্যাশট্যাগ রয়েছে। অন্য একটি পোস্ট থেকে জানা যায়, এটি ‘JANGKHRITHAINI THWISAM 2’ নামের একটি সিনেমা।
লিংক: এখানে
অর্থাৎ ভিডিওটি বাংলাদেশের কোনো পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার নয়, বরং একটি সিনেমার শুটিংয়ের অংশ।
ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রবেশের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও থাইল্যান্ডের
অস্ত্র হাতে একদল সশস্ত্র ব্যক্তির ভিডিও প্রকাশ করে ফেসবুকে দাবি করা হচ্ছে, ইউপিডিএফের ‘উগ্রবাদী গোষ্ঠী’ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে।
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ২০ আগস্ট ‘ARMY ESAN’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। মূল ভিডিওর থাই ভাষার ক্যাপশনে লেখা, ‘প্রশিক্ষণে আসার সময়েও তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বর্ম পরে আসে।’ সেখানে ইউপিডিএফের কোনো উল্লেখ নেই।
লিংক: এখানে
৩ অক্টোবর ‘Karen Thai News’ নামের আরেকটি ইউটিউব চ্যানেলেও একই ভিডিও প্রকাশিত হয়। চ্যানেলটির বিবরণে কারেন জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ভিডিও তৈরির পাশাপাশি প্রকৃতিবিষয়ক ভিডিও প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। কারেন একটি সিনো-তিব্বতি জাতিগোষ্ঠী, যাদের বসবাস মূলত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে।
ফলে ভিডিওটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রবেশের দৃশ্য বলার ভিত্তি পাওয়া যায়নি; বরং এটি কারেন জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত ভিডিও।
পুরোনো ভিডিও দিয়ে পাহাড়িদের গুলিবর্ষণের দাবি
পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর ওপর গুলি ছুড়ছেন—এমন দাবি করে ফেসবুকে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একটি পেজেই ভিডিও ভিউ হয়েছে ২২ লাখ বার এবং প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৫২ হাজার।
ভিডিওটি ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই ‘CNN Prima News’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ও বিবরণ অনুযায়ী, এটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় রুশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনীর গুলিবর্ষণের দৃশ্য।
লিংক: এখানে
এ ছাড়া একাধিক আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও ভিডিওটি একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি ভিডিও প্রতিবেদনেও একই দৃশ্য পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময়ের ভিডিওকে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক সংঘাতের দৃশ্য বলে প্রচার করা হচ্ছে।