জীবন কীভাবে মোড় নেয়, ভাবলে অবাক লাগে

· Prothom Alo

এ বছর ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংলিশ ফুটবলার হ্যারি কেইন। কৈশোরে তাঁকেও কিন্তু অনেক বাধা, বিপত্তি, সংশয় পেরিয়ে আসতে হয়েছে। পড়ুন প্লেয়ারস ট্রিবিউন–এ প্রকাশিত তাঁর লেখার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

ছোটবেলায় ‘ব্যর্থতা’ ব্যাপারটা ছিল খুব অদ্ভুত।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

একটা ঘটনা বলি। আমাদের চিংফোর্ডের বাড়ির ঠিক পেছনেই একটা পার্ক ছিল। বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে প্রায়ই সেখানে ফুটবল খেলতে যেতাম। কোনো গোলপোস্ট ছিল না, ছিল না খেলার উপযোগী কোনো নির্দিষ্ট মাঠও। একটু ঘাস আর দুটা গাছ পেলেই আমরা খুশি। তখন আমি আর্সেনালের যুব দলে খেলতাম। বয়স আট। একদিন বাবার সঙ্গে পার্কে যাচ্ছি। আচমকা বাবা বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’

‘হ্যাঁ, বলো।’

মনে আছে, এরপর বাবা কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ‘শোনো হ্যারি, আর্সেনাল তোমাকে আর দলে রাখছে না।’

সেই মুহূর্তে আমার কেমন লেগেছিল, তা ঠিক মনে করতে পারি না। সত্যি বলতে, এর অর্থ কী, সেটাও হয়তো তখন ভালোভাবে বুঝতাম না। বয়সটাই তো কম। তবে বাবার প্রতিক্রিয়া আমার মনে আছে। আর সেটা আমার মনে কী প্রভাব ফেলেছিল, সেটাও মনে আছে। বাবা আমাকে দোষারোপ করেননি। আর্সেনালকেও দোষ দেননি। এমনকি তাঁকে খুব একটা বিচলিতও মনে হয়নি। শুধু বলেছিলেন, ‘চিন্তা কোরো না, হ্যারি। আমরা আরও পরিশ্রম করব। সামনে এগিয়ে যাব। অন্য কোনো ক্লাব খুঁজে নেব। ঠিক আছে?’

এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার আরও বেশি মন খারাপ হওয়ার কথা ছিল। যে বাবা মরিয়া হয়ে চান, তাঁর সন্তান পেশাদার ফুটবলার হোক, তাঁর প্রতিক্রিয়া হয়তো অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন আলাদা। যা-ই ঘটুক না কেন, তিনি কখনো আমার ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি। সব সময় ইতিবাচক ছিলেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁর মুখে কথা ছিল একটাই, ‘তো চলো, কাজে নেমে পড়ি।’

আমরা সেটাই করেছিলাম।

আর্সেনাল ছাড়ার পর কিছুদিন এদিক-ওদিক খেলেছি। পরে নিজের এলাকার দলে ফিরে যাই। সেখান থেকে ওয়াটফোর্ডের এক স্কাউটের নজরে পড়ি। তিনি আমাকে ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। জীবন কীভাবে মোড় নেয়, ভাবলে অবাক লাগে! ওয়াটফোর্ডের হয়ে টটেনহামের বিপক্ষে খেলার পরই টটেনহামের যুব একাডেমিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাই।

মিরপুরের ব্যতিক্রমী বিনোদনকেন্দ্র ওয়াওজা এন্টারটেইনমেন্ট মিউজিয়াম হলে কী কী আছে, কেন যাবেন

মনে আছে, প্রথমবার যখন আর্সেনালের বিপক্ষে খেলতে নামি, তখনো আমার মধ্যে একধরনের জেদ কাজ করছিল। শুনতে হাস্যকর লাগতে পারে। প্রতিবার তাদের বিপক্ষে খেলতে নামলেই মনে মনে বলতাম, ‘বটে! এবার দেখা যাবে কে পারে আর কে পারে না।’

এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই ঘটনা আমার জীবনে সেরা স্মৃতিগুলোর একটা। কারণ, এর মাধ্যমে এমন এক জেদ ও তাড়না তৈরি হয়েছিল, যা আগে টের পাইনি।

ফুটবলকে নতুন চোখে দেখা

দ্য ডেন স্টেডিয়ামে আমার প্রথম দিককার একটা ম্যাচের কথা মনে পড়ে। রেফারি একটি ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। মাত্র একটি ভুল সিদ্ধান্ত! আর তাতেই দর্শকেরা মাঠের মধ্যে একের পর এক জিনিস ছুড়ে মারতে শুরু করেন। যে যা হাতের কাছে পাচ্ছিলেন, তা-ই! পরিস্থিতি সামলে দর্শকদের শান্ত করতে পাঁচ মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

ভাবুন তো, আমার বয়স তখন ১৮। চারদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, ‘বাপরে! কী অবিশ্বাস্য!’

মৌসুম যত এগোচ্ছিল, আমরা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছিলাম। এরই মধ্যে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের কেউ কেউ বলতে শুরু করল, ‘যদি আরও নিচে নামি, আমাদের বেতন অর্ধেক হয়ে যাবে।’ কিংবা ‘এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় গেলে আমার চুক্তিই বাতিল হয়ে যাবে।’

তাঁদের অনেকের ঘরে ছোট ছোট সন্তান ছিল। তখনই খেলাটাকে আমি অন্যভাবে দেখতে শুরু করি। বুঝতে পারি, সবাই শুধু আনন্দের জন্য ফুটবল খেলে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পরিবারের জীবিকা, ভরণপোষণ। বুঝতে শুরু করি, পুরো ব্যাপারটা কতটা অনিশ্চিত ও নাজুক। ফুটবলে তুমি দিনের পর দিন যে অর্জনের জন্য পরিশ্রম করেছ, মুহূর্তেই সব হারিয়ে যেতে পারে।

সেই অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছিল, শিশুসুলভ ভাবনা নিয়ে চলার দিন শেষ।

হ্যারি কেইন

খারাপ সময়ে ঘুরে দাঁড়ানো

সবচেয়ে খারাপ সময়টা সম্ভবত কেটেছে লেস্টার সিটিতে। সেখানে কিছুতেই মূল দলে জায়গা করে নিতে পারছিলাম না। আমার ক্যারিয়ারে সেই প্রথমবারের মতো নিজের সামর্থ্য নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। এতই হতাশ ছিলাম যে বাবাকে বলেছিলাম, আমি ক্লাব ছেড়ে চলে যেতে চাই।

বাবা বলেছিলেন, ‘দেখো, পরিশ্রম করে যাও। কাজ চালিয়ে যাও। সামনে এগোও। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

কয়েক সপ্তাহ পর আবারও নিজের ফ্ল্যাটে বসে আছি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ফুটবল লিগ—এনএফএল নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিলাম। একদিন হঠাৎ টম ব্র্যাডিকে নিয়ে তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র চোখে পড়ে।

প্রামাণ্যচিত্রটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই মানুষ টম ব্র্যাডির সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ করেছে। এমনকি কলেজে পড়ার সময়ও কোচেরা তাঁকে সরিয়ে অন্য একজন কোয়ার্টারব্যাককে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

প্রামাণ্যচিত্রে এনএফএল ড্রাফটের আগে স্কাউটদের তোলা একটি ছবিও দেখানো হয়েছিল। উদাম গায়ে টম ব্র্যাডি। একজন কোচকে বলতে শোনা যায়, ‘ও বেশ লম্বা, রোগা–পাতলা। দেখে মনে হয়, জীবনে কখনো জিমেও যায়নি।’

তাঁর মধ্যে আমি নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাকে নিয়েও মানুষ সব সময় একই ধরনের ধারণা পোষণ করত। বলত, ‘ওকে দেখে তো স্ট্রাইকার মনেই হয় না।’

ব্র্যাডির গল্প আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত করেছিল। নিজের ওপর তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। আর ভালো করার জন্য তিনি প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো একটানা পরিশ্রম করে গেছেন। বিষয়টি আমার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু সেদিন লেস্টারে নিজের সোফায় বসে থাকতে থাকতে আমার মাথার ভেতর যেন হঠাৎ একটা আলো জ্বলে উঠল। আচমকা নিজেকে বললাম, ‘আমি পারব। যতটা সম্ভব কঠোর পরিশ্রম করব। সুযোগ একদিন আসবেই। আর সেই সুযোগ আমি কাজে লাগাব।’

এর কয়েক ম্যাচ পর আমরা খেলতে নেমেছিলাম আমার সাবেক ক্লাব মিলওয়ালের বিপক্ষে। তাদের এক লম্বা-চওড়া ডিফেন্ডার সম্ভবত আমাকে ভয় দেখানোর জন্যই বলল, ‘এই যে হ্যারি, আমি কিন্তু এখনো কোনো হলুদ কার্ড পাইনি।’

আমি বললাম, ‘...আচ্ছা, তো?’

‘না মানে...তোমাকে দিয়েই প্রথম হলুদ কার্ডটা পাওয়ার কথা ভাবছি কি না...’

থ্রো-ইন থেকে বল এল। আমরা দুজনই হেড করার জন্য লাফ দিলাম। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কনুইয়ের ধাক্কাধাক্কিও হলো। আর কী আশ্চর্য! আমার কনুই গিয়ে লাগল ঠিক তাঁর পাঁজরে। অবশ্যই ইচ্ছা করে নয়, দুর্ঘটনাবশত। সে ব্যথায় কুঁকড়ে মাটিতে পড়ে গেল। আর আমি তাঁকে ডিঙিয়ে চলে গেলাম।

কিছুই বলিনি। শুধু পাশ কাটিয়েছি। এভাবেই তাঁকে, নিজেকে এবং সবাইকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলাম—কারও চোখ রাঙানি আমি আর ভয় পাই না।

Read full story at source