অফিসের কাজে ফাঁকি দিলে কি বেতন হালাল হবে
· Prothom Alo

হালাল উপার্জনের ব্যাপারে আমরা সাধারণত ঘুষ, দুর্নীতি বা সরাসরি অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে বুঝি। কিন্তু দৈনন্দিন কর্মজীবনে সূক্ষ্ম একটি উপায়ে যে উপার্জনের পবিত্রতা নষ্ট হতে পারে, সেদিকে আমাদের অনেকেরই খেয়াল থাকে না।
আর তা হলো—অফিসের নির্ধারিত সময়ে কাজে ফাঁকি দেওয়া বা ব্যক্তিগত কাজে সময় নষ্ট করা।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
অনেকে মনে করেন, মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন তো আসবেই, তাই কাজের ক্ষেত্রে একটু-আধটু ফাঁকি দিলে বা দেরিতে অফিসে এলে তেমন কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু
ইসলামের দৃষ্টিতে চাকরি একটি চুক্তি এবং অফিসের সময়টুকু একটি আমানত।
চাকরি একটি চুক্তি
ইসলামি আইন অনুযায়ী, যেকোনো চাকরি মূলত নিয়োগকর্তা এবং কর্মচারীর মধ্যে একটি ‘ইজারা’ (ভাড়া বা সেবামূলক) চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে কর্মচারী একটি নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তার নির্দিষ্ট সময় ও শ্রম নিয়োগকর্তার কাছে বিক্রি করেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা তোমাদের চুক্তিগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১)
যখন কেউ অফিসে উপস্থিত থাকেন, তখন ওই নির্ধারিত সময়টুকু প্রতিষ্ঠানের আমানত। সেই সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করা, অকারণে গল্পগুজব করে সময় নষ্ট করা বা বিনা অনুমতিতে আগে চলে যাওয়া আমানতের খেয়ানত।
ইসলামে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ চাকরিজীবীকে ‘আজির খাস’ বলা হয়। অর্থাৎ তিনি নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টায় ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে পারবেন না।হালাল বিনিয়োগ: কেন, কোথায় ও কীভাবে করবেন
মহানবী (সা.) কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তার আমানত তাকে আদায় করে দাও; আর যে তোমার সাথে খেয়ানত করেছে, তুমি তার সাথে খেয়ানত কোরো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৩৫)
বেতনের বিধান
ইসলামে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ চাকরিজীবীকে ‘আজির খাস’ বলা হয়। অর্থাৎ তিনি নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টায় ওই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোথাও কাজ করতে পারবেন না।
‘আজির খাস’ তার বেতনের হকদার হবেন তখনই, যখন তিনি চুক্তির পুরো সময়টি নিয়োগকর্তার কাজের জন্য সোপর্দ করে দেবেন। যদি তিনি ওই সময়ে নিজের ব্যক্তিগত কাজ করেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ থেকে বিরত থাকেন, তবে সেই অনুপাত অনুযায়ী তার বেতনের একাংশ তার জন্য হালাল হবে না।’ (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৭০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
অর্থাৎ, যেটুকু সময় ফাঁকি দেওয়া হলো, মাস শেষে বেতনের ওই অংশের টাকা মূলত অবৈধ উপার্জন হিসেবে গণ্য হবে।
তবে যদি সময় নির্ধারিত থাকে বটে কিন্তু মূলত চুক্তির উদ্দেশ্য হয় নির্ধারিত কাজ এবং সময়ের হেরফেরে মালিকের তেমন আপত্তি না থাকে, অথবা অফিসে কর্মীদের জন্য কাজের বিবেচনায় সময়ে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে কাজ সম্পূর্ণ সম্পাদনের বিনিময়ে বেতন সম্পূর্ণ হালাল হবে।
সময়ের চুরি
কারও পকেট থেকে টাকা চুরি করা যেমন অপরাধ, কাজে ফাঁকি দিয়ে সময় চুরি করাও ঠিক তেমনি অপরাধ। এটিকে ইসলামে ‘প্রবঞ্চনা’ বা ধোঁকা দেওয়া হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
হালাল উপার্জনের বহুমুখী সুফলইসলাম শুধু চুক্তির দায়সারা পূরণই দাবি করে না, বরং প্রতিটি কাজে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা বা ‘ইহসান’ দাবি করে। ফাঁকিবাজি মানসিকতা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)
অফিসে কাজের ভান করে বসে থাকা বা বসের চোখ ফাঁকি দিয়ে দায়িত্ব অবহেলা করা সরাসরি এই হাদিসের আওতাভুক্ত।
কাজে আন্তরিকতার দাবি
ইসলাম শুধু চুক্তির দায়সারা পূরণই দাবি করে না, বরং প্রতিটি কাজে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা বা ‘ইহসান’ দাবি করে। ফাঁকিবাজি মানসিকতা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের ক্ষেত্রে ইহসান (দক্ষতা ও সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে সম্পাদন) অত্যাবশ্যক করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
যে ব্যক্তি তার পেশায় ইহসান বা আন্তরিকতা দেখান, আল্লাহ তাঁর রিজিক ও পরিবারে বিশেষ বরকত দান করেন।
পরিশেষে, মাস শেষে পাওয়া পুরো বেতনটি তখনই শতভাগ হালাল ও পবিত্র হবে, যখন একজন চাকরিজীবী তার দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টা সম্পূর্ণ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন।
নিজের অজান্তে যদি কখনো কাজে ফাঁকি দেওয়া হয়েও যায়, তবে উচিত হলো অন্য সময় অতিরিক্ত কাজ করে তা পুষিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা।
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর বেতন-ভাতা কত ছিল