বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমিতে বাংলাদেশের ৭ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি

· Prothom Alo

বাংলাদেশের মাটির নিচের পানিতে আর্সেনিকের সমস্যা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের কাজের প্রভাব পৌঁছে যায় মানুষের পানীয় জলের নিরাপত্তায়। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়লে কীভাবে ফসল বাঁচানো যায়, সেই গবেষণাও শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে যায় আমাদের খাবারের সঙ্গে। ধানের রোগ প্রতিরোধ, নতুন ওষুধের সম্ভাবনা খোঁজা, পাট থেকে প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরি, চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কিংবা সৌরকোষের জন্য নতুন উপাদান তৈরি—এসবও বিজ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন শাখার কাজ। এমন নানা ক্ষেত্রে গবেষণার স্বীকৃতি এবার একসঙ্গে পেলেন বাংলাদেশের সাত বিজ্ঞানী।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার অগ্রগতিতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস (TWAS) ২০২৭ সালের নতুন ফেলো হিসেবে বাংলাদেশের সাত বিজ্ঞানীকে নির্বাচিত করেছে। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুন নাহার, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান এবং অধ্যাপক এ. কে. এম. আখতার হোসেন।

একই সঙ্গে অধ্যাপক কামরুন নাহার পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘টিডব্লিউএএস ফায়জাহ এম. আল-খারাফি পুরস্কার’। আর বাংলাদেশের আরেক বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরী নির্বাচিত হয়েছেন এই কাউন্সিলের সদস্য। তিনি ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষকদের উপস্থিতি এবার আরও দৃশ্যমান হলো।

অন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর নতুন গবেষণা
বাংলাদেশের আরেক বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরী নির্বাচিত হয়েছেন এই কাউন্সিলের সদস্য। তিনি ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো হওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ

টিডব্লিউএএসের পুরো নাম দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সেস ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স ইন ডেভেলপিং কান্ট্রিজ। এই সংস্থাটির যাত্রা শুরু ১৯৮৩ সালে। প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের কয়েকজন বিজ্ঞানী। ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরে সংস্থাটির সদর দপ্তর। এটি ইউনেসকোর একটি কর্মসূচি হিসেবেও কাজ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মানসম্মত গবেষণাকে উৎসাহ দেওয়া, বিজ্ঞানীদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো এর অন্যতম লক্ষ্য।

এই একাডেমির ফেলো নির্বাচন সাধারণ কোনো পুরস্কার দেওয়ার মতো ঘটনা নয়। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণার মান, বৈজ্ঞানিক অবদান ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিবেচনা করে ফেলো নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত ব্যক্তিরা একাডেমির স্থায়ী সদস্য হন। অর্থাৎ এটি এক বছরের জন্য পাওয়া কোনো পদ নয়; আজীবন সদস্যপদের স্বীকৃতি।

মেঘনাদ সাহার অন্য ভুবন
টিডব্লিউএএস -এর যাত্রা শুরু ১৯৮৩ সালে। প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালামসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের কয়েকজন বিজ্ঞানী। ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরে সংস্থাটির সদর দপ্তর।

২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর টিডব্লিউএএস ৮৭ জন নতুন ফেলো নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ ও ২৯ জন নারী। নির্বাচিত বিজ্ঞানীদের ৭৭ জন উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে টিডব্লিউএএস যে ৬৬টি দেশকে চিহ্নিত করেছে, সেখান থেকে এবার ১৫ জন নতুন ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনই বাংলাদেশের। নতুন সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে একাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে।

এই সাত বিজ্ঞানীর কাজের ক্ষেত্র কিন্তু এক নয়। কেউ কাজ করছেন ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে, কেউ ধানের রোগ প্রতিরোধ নিয়ে, কেউ খুঁজছেন উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক প্রাণীতে থাকা নতুন জৈব সক্রিয় যৌগ। কেউ পাটের আঁশ থেকে তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব উপাদান, আবার কেউ কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজছেন। তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্রগুলো আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল আছে—প্রতিটি গবেষণার সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ।

চলুন এই বিজ্ঞানীদের কাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু জানার চেষ্টা করি।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু: দুনিয়ার অর্ধেক কণা যাঁর নামে
২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর টিডব্লিউএএস ৮৭ জন নতুন ফেলো নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জন পুরুষ ও ২৯ জন নারী। নির্বাচিত বিজ্ঞানীদের ৭৭ জন উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর।

কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ: ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপত্তা নিয়ে চার দশকের গবেষণা

বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি দেশের অন্যতম বড় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পানিতে এই বিষাক্ত উপাদান কতটা আছে, কোথায় বেশি, কীভাবে তা কমানো যায়, তার উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।

ভূগর্ভস্থ পানির উৎস, স্তর, প্রবাহ এবং পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের বলা হয় হাইড্রোজিওলজিস্ট বা ভূগর্ভস্থ পানিবিজ্ঞানী। বাংলাদেশের মতো দেশে এ গবেষণার গুরুত্ব অনেক। কারণ লাখ লাখ মানুষ পান করার জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। সেই পানিতে আর্সেনিক বা অতিরিক্ত লবণাক্ততা থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকিতে পড়ে, তেমনি নিরাপদ পানির ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ

কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদের গবেষণার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির সম্পদ, আর্সেনিক দূষণ এবং পানির লবণাক্ততা কমানোর উপায়। প্রায় চার দশকের গবেষণাজীবনে তিনি ২৫০টির বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। টিডব্লিউএএসের বিবরণ অনুযায়ী, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স পাওয়া বিজ্ঞানীদের শীর্ষ ২ শতাংশের মধ্যেও স্থান পেয়েছেন। বাংলাদেশের পানীয় জলে আর্সেনিক ও লবণাক্ততা কমানোর গবেষণা জাতীয় নীতি এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক উদ্যোগেও প্রভাব রেখেছে।

এ ধরনের গবেষণা শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য তৈরির জন্য নয়। কোন এলাকার পানি পান করার উপযোগী, কোথায় বিকল্প পানির উৎস প্রয়োজন, কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও এমন গবেষণা কাজে লাগে।

প্রাণিবিজ্ঞানীদের প্রাণ ছিলেন ড. রেজাউর রহমান
ভূগর্ভস্থ পানির উৎস, স্তর, প্রবাহ এবং পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের বলা হয় হাইড্রোজিওলজিস্ট বা ভূগর্ভস্থ পানিবিজ্ঞানী। বাংলাদেশের মতো দেশে এ গবেষণার গুরুত্ব অনেক।

কামরুন নাহার: প্রতিকূল পরিবেশেও ফসল বাঁচানোর গবেষণা

বাংলাদেশের কৃষির জন্য লবণাক্ততা ও খরা বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলীয় অঞ্চলে মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে গেলে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। আবার বৃষ্টির অভাব বা দীর্ঘ সময় পানি না পেলে গাছের কোষের ভেতরেও নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। সব গাছ সমানভাবে এসব চাপ সহ্য করতে পারে না। তাই কোন প্রক্রিয়ায় গাছ প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে, তা জানা কৃষিবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই প্রশ্ন নিয়েই কাজ করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুন নাহার। তিনি একজন উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ববিদ। উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিপাক, কোষের কার্যক্রম এবং পরিবেশের পরিবর্তনে উদ্ভিদের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, তা নিয়ে গবেষণা করেন এই শাখার বিজ্ঞানীরা।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুন নাহার

অধ্যাপক নাহারের গবেষণার বিশেষ দিক হলো উদ্ভিদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গ্লাইঅক্সালেজ ব্যবস্থা। সহজ করে বললে, প্রতিকূল পরিবেশে গাছের কোষে ক্ষতিকর কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হতে পারে। সেগুলো কোষের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবস্থা এসব ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে গ্লাইঅক্সালেজ ব্যবস্থা কোষে তৈরি হওয়া মিথাইলগ্লাইঅক্সাল নামে ক্ষতিকর উপপণ্যকে নিষ্ক্রিয় করতে ভূমিকা রাখে। এই দুই ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে পারলে লবণাক্ততা বা খরার মতো পরিবেশে গাছকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সে বিষয়ে নতুন ধারণা পাওয়া সম্ভব।

পাইয়ের নতুন সমীকরণ আবিষ্কার করেছেন দুই বাঙালি বিজ্ঞানী
অধ্যাপক নাহার একজন উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ববিদ। উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিপাক, কোষের কার্যক্রম এবং পরিবেশের পরিবর্তনে উদ্ভিদের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, তা নিয়ে গবেষণা করেন এই শাখার বিজ্ঞানীরা।

তিনি সংকেতবাহী কিছু অণু ও অল্প পরিমাণে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান ব্যবহার করে গাছের প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল নিয়েও গবেষণা করেছেন। লক্ষ্য হলো, এমন পদ্ধতি বের করা, যা কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের জন্য খুব ব্যয়বহুল হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে চাপ বাড়ছে। তাই কম খরচে ফসলের সহনশীলতা বাড়ানোর গবেষণা খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবেও তাঁর অর্জন উল্লেখযোগ্য। ২০২৪–২০২৫ সালের স্ট্যানফোর্ড-এলসেভিয়ার তালিকায় তিনি বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর মধ্যে স্থান পেয়েছেন। তাঁর গবেষণার h-index ৭৭ এবং গবেষণাপত্রগুলো রেফারেন্স পেয়েছে ২৪ হাজারের বেশি বার। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য, পেয়েছেন একাডেমির স্বর্ণপদক। ২০টি বই সম্পাদনার পাশাপাশি ৪০টির বেশি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে তাঁর অবদান রয়েছে।

এই স্বীকৃতির পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন টিডব্লিউএএস ফায়জাহ এম. আল-খারাফি পুরস্কার। পুরস্কারটি উন্নয়নশীল বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর নারী বিজ্ঞানীদের দেওয়া হয়। প্রতিবছর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র ঘুরিয়ে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে কৃষিবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান ছিল পুরস্কারের নির্ধারিত ক্ষেত্র। পুরস্কারটির সঙ্গে ৪ হাজার মার্কিন ডলারের অর্থমূল্যও রয়েছে। একই সময়ে ফেলো নির্বাচিত হওয়া এবং এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক নাহারের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি।

সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সেরা তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের অনন্যা
অধ্যাপক নাহারের গবেষণার h-index ৭৭ এবং গবেষণাপত্রগুলো রেফারেন্স পেয়েছে ২৪ হাজারের বেশি বার। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য, পেয়েছেন একাডেমির স্বর্ণপদক।

মোহাম্মদ আবদুল লতিফ: ধানের রোগ ঠেকাতে জিন ও জিনোম সম্পাদনা

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। কিন্তু ধানগাছ নানা রোগে আক্রান্ত হয়। ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ এবং টুংরো রোগের কারণে ধানের ফলন কম হতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধী নতুন জাত তৈরি করা ধান গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ

এই কাজেই দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখছেন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফ। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহের ত্রিশালে সুপ্রিম সিড কোম্পানি লিমিটেডের রাইস রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন।

ধানগাছের কোন জিন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে, তা শনাক্ত করা তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি ধানের ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট ও টুংরো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন এবং কোয়ান্টিটেটিভ ট্রেইট লোকাই বা কিউটিএল শনাক্ত করেছেন। কিউটিএল হলো ডিএনএর এমন একটি অঞ্চল, যা রোগ প্রতিরোধ বা খরা সহ্য করার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ নক্ষত্র
মোহাম্মদ আবদুল লতিফ বর্তমানে ময়মনসিংহের ত্রিশালে সুপ্রিম সিড কোম্পানি লিমিটেডের রাইস রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন।

এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনি ২৫টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত তৈরিতে অবদান রেখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জিঙ্কসমৃদ্ধ ব্রি ধান১০০। ধানে জিঙ্কের মতো পুষ্টি উপাদান বাড়ানো গেলে তা মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও সহায়ক হতে পারে।

ধানের নতুন জাত তৈরিতে তিনি ব্যবহার করেছেন মার্কার-সহায়ক নির্বাচন পদ্ধতি। এতে ডিএনএর নির্দিষ্ট চিহ্ন বা মার্কার দেখে বোঝা যায়, কোনো গাছে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন আছে কি না। ফলে একেকটি গাছ বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করেও প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাবনাময় গাছ বেছে নেওয়া যায়।

তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণায় আছে ন্যানোকণার সাহায্যে ধানের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রিসপার ক্যাস৯ পদ্ধতিতে জিনোম সম্পাদনা। জিনোম সম্পাদনার মাধ্যমে ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনা যায়। ধানের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে এই প্রযুক্তি নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তাঁর ১৯১টি পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র রয়েছে।

বিশ্বের সেরা তরুণ প্রকৌশলীদের তালিকায় বাংলাদেশের বাহাউদ্দিন
উদ্ভিদ রোগতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ আবদুল লতিফের সাম্প্রতিক গবেষণায় আছে ন্যানোকণার সাহায্যে ধানের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রিসপার ক্যাস৯ পদ্ধতিতে জিনোম সম্পাদনা।

মোহাম্মদ আবদুর রশীদ: প্রকৃতির ভেতর নতুন ওষুধের সম্ভাবনা

গাছ, অণুজীব কিংবা সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে এমন অনেক রাসায়নিক যৌগ থাকে, যেগুলোর কিছু মানুষের রোগের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে। এসব প্রাকৃতিক উৎস থেকে যৌগ আলাদা করা, তাদের গঠন বোঝা এবং কোনটির কী ধরনের জৈবিক কার্যকারিতা আছে, তা পরীক্ষা করেন ন্যাচারাল প্রোডাক্টস কেমিস্ট বা প্রাকৃতিক যৌগবিষয়ক রসায়নবিদেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ এই ক্ষেত্রের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গবেষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ

তাঁর গবেষণায় স্থলজ উদ্ভিদ, অণুজীব এবং সামুদ্রিক প্রাণী থেকে নানা জৈব সক্রিয় যৌগ আলাদা ও শনাক্ত করা হয়েছে।

তিনি ২০০টির বেশি জৈব সক্রিয় যৌগ আলাদা করে সেগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে ৭০টি ছিল নতুন অণু। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের পরীক্ষামূলক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। সেখানে তাঁর শনাক্ত করা কয়েকটি যৌগের ক্যানসার ও এইচআইভি প্রতিরোধী সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।

অস্কার ক্লেইন মেডেল পেলেন বাঙালি বিজ্ঞানী অশোক সেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুর রশীদ ২০০টির বেশি জৈব সক্রিয় যৌগ আলাদা করে সেগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করেছেন।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো যৌগ পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষ বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার ইঙ্গিত দিলেই সেটি সরাসরি ওষুধ হয়ে যায় না। ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে আরও অনেক ধাপের পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে নতুন সম্ভাবনাময় যৌগ শনাক্ত করা ওষুধ আবিষ্কারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অধ্যাপক রশীদের গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৬২০টির বেশি। এর মধ্যে ৩১৫টি স্কোপাস সূচিবদ্ধ। স্কোপাস হলো বিশ্বজুড়ে পিয়ার-রিভিউড বা সমকক্ষ-পর্যালোচিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ।

 তাঁর h-index ৪৮ এবং গবেষণাপত্রগুলো ১০ হাজার ৮০০ বারের বেশি উদ্ধৃত হয়েছে বা রেফারেন্স পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত স্কোপাসভিত্তিক গবেষণা-তথ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা লেখক হিসেবে স্থান পেয়েছেন। গবেষণার পাশাপাশি দেশের ফার্মেসি শিক্ষার উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন ছিলেন তিন মেয়াদে। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে নতুন অণু, প্যাটেন্ট পেলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী
তবে নতুন সম্ভাবনাময় যৌগ শনাক্ত করা ওষুধ আবিষ্কারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অধ্যাপক রশীদের গবেষণাপত্রের সংখ্যা ৬২০টির বেশি। এর মধ্যে ৩১৫টি স্কোপাস সূচিবদ্ধ।

মোবারক আহমদ খান: পাট থেকে প্লাস্টিকের বিকল্প

পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু ব্যবহারের পর তা দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায়। নালা-নর্দমা বন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে মাটি ও জলাশয় দূষণের মতো বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে সহজে পচে যায়, এমন উপাদান তৈরির চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানের কাজের বড় একটি অংশ এই সমস্যার সমাধান খোঁজার সঙ্গে যুক্ত। পাটের সেলুলোজ ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন সোনালি ব্যাগ। এটি পেটেন্টকৃত বায়োপলিমার। টিডব্লিউএএসের এর বিবরণে সোনালি ব্যাগকে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিনের প্লাস্টিকমুক্ত ও কার্বন-নেগেটিভ বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ নীতিতেও এই উদ্ভাবনের প্রভাব রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান

পাটের আঁশে থাকে সেলুলোজ। সেলুলোজ হলো উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরের প্রধান উপাদানগুলোর একটি। উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় এই সেলুলোজকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের উপাদান তৈরি করা সম্ভব। সোনালি ব্যাগ সেই গবেষণারই একটি বাস্তব প্রয়োগ।

মোবারক আহমদ খানের গবেষণা শুধু সোনালি ব্যাগে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বায়োপলিমার, ন্যানোসেলুলোজ, চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী উপাদান, পরিবেশবান্ধব বস্ত্রপ্রযুক্তি, কৃষি এবং জলবায়ু সহনশীল আবাসন উপকরণ নিয়েও কাজ করেছেন। পাটের মতো স্থানীয় সম্পদকে নতুন প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা তাঁর গবেষণার বিশেষ দিক।

তাঁর পরিচয় নিয়েও একটি সংশোধন জরুরি। তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও মহাপরিচালক। ২০২৪ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২০ সালে পেয়েছেন ‘এমআইটি সলভ’ স্বীকৃতি এবং পলিমার গোল্ড মেডেলসহ নানা সম্মাননা।

‘বাংলাদেশে পাটের সম্ভাবনা অনন্ত’— মোবারক আহমদ খান, পাটবিজ্ঞানী
মোবারক আহমদ খান বায়োপলিমার, ন্যানোসেলুলোজ, চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী উপাদান, পরিবেশবান্ধব বস্ত্রপ্রযুক্তি, কৃষি এবং জলবায়ু সহনশীল আবাসন উপকরণ নিয়েও কাজ করেছেন।

মোহাম্মদ সোহেল রহমান: অ্যালগরিদমের সাহায্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যার সমাধান

কম্পিউটার বিজ্ঞানের গবেষণা মানেই শুধু সফটওয়্যার তৈরি বা কম্পিউটার চালানোর নতুন পদ্ধতি বের করা নয়। এর একটি বড় অংশ হলো অ্যালগরিদম নিয়ে কাজ করা। অ্যালগরিদম মানে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সাজানো ধাপে ধাপে নির্দেশনা। তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল হিসাব, ছবি থেকে প্রয়োজনীয় অংশ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের ব্যবহার রয়েছে।

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান কাজ করছেন অ্যালগরিদম ও তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে। তাঁর বিশেষ গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে আছে স্ট্রিং অ্যালগরিদম, কম্বিনেটরিক্স এবং সিকোয়েন্স অ্যানালাইসিস। স্ট্রিং অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অক্ষর, সংকেত বা তথ্যের ধারায় নির্দিষ্ট বিন্যাস খুঁজে বের করা যায়। জীববিজ্ঞানে ডিএনএর মতো জৈব তথ্য বিশ্লেষণেও এ ধরনের পদ্ধতি কাজে লাগে।

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান

তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। বায়োইনফরমেটিকস, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছবি বিশ্লেষণ, মহামারি গবেষণা এবং পরিবেশবিষয়ক ব্যবস্থায় এআই প্রয়োগের কাজ করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে MultiResUNet নামের একটি মডেল, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছবি বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের প্রযুক্তির সাহায্যে এক্স-রে, এমআরআই বা অন্য মেডিকেল ছবিতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা নির্দিষ্ট টিস্যুর সীমানা শনাক্ত করা যায়। চিকিৎসকেরা এতে ছবির ভেতরের তথ্য আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন।

গবেষণার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কম্পিউটার বিজ্ঞানী তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন অধ্যাপক রহমান। তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড ইন ইনফরমেটিকস এবং ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্টের মতো প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়েছে।

সীমিত গবেষণা-সুবিধার পরিবেশেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। ২০২৩ সালে পেয়েছেন আর্থ সায়েন্স ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড, ২০২৫ সালে জনস হপকিন্স হেলথকেয়ার ডিজাইন কম্পিটিশন চ্যাম্পিয়ন। জাতীয় আইসিটি পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৭ সালে।

ব্ল্যাকহোলের রহস্য উন্মোচনে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী
বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহেল রহমান কাজ করছেন অ্যালগরিদম ও তাত্ত্বিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে।

এ. কে. এম. আখতার হোসেন: নতুন উপাদান, সৌরকোষ ও হাইড্রোজেন সংরক্ষণ

বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ, চুম্বক, সৌরকোষ কিংবা সুপারকন্ডাক্টরের বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো সলিড-স্টেট ফিজিকস। কোনো কঠিন পদার্থের ভেতরে পরমাণু ও ইলেকট্রন কীভাবে বিন্যস্ত থাকে, তাদের পারস্পরিক আচরণ কেমন, এসবের ওপর নির্ভর করে পদার্থটির বৈদ্যুতিক, চৌম্বকীয় ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য।

বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ. কে. এম. আখতার হোসেন

এই ক্ষেত্রেই প্রায় তিন দশক ধরে গবেষণা করছেন বুয়েটের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ. কে. এম. আখতার হোসেন। তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বহুগুণসম্পন্ন চৌম্বকীয় পদার্থ বা মাল্টিফেরয়িকস, সুপারকন্ডাক্টর এবং ন্যানো-কাঠামোর উপাদান।

মাল্টিফেরয়িক পদার্থের বিশেষত্ব হলো, একই পদার্থে একাধিক ধরনের বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে চৌম্বকীয় অবস্থা বদলানো সম্ভব, আবার চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যেও প্রভাব ফেলা যায়। একে বলা হয় ম্যাগনেটোইলেকট্রিক কাপলিং। উন্নত ইলেকট্রনিক যন্ত্র, সেন্সর এবং তথ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তিতে এ ধরনের উপাদানের সম্ভাবনা রয়েছে।

মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের মাহমুদা সুলতানা
কিছু ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে চৌম্বকীয় অবস্থা বদলানো সম্ভব, আবার চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যেও প্রভাব ফেলা যায়। একে বলা হয় ম্যাগনেটোইলেকট্রিক কাপলিং।

অধ্যাপক হোসেনের গবেষণায় পরীক্ষাগারের ফলাফলের পাশাপাশি ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি বা ডিএফটি ব্যবহার করা হয়। এটি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি গণনাপদ্ধতি। এর সাহায্যে কোনো পদার্থের ইলেকট্রন কীভাবে আচরণ করে, নতুন উপাদানের গঠন কেমন হতে পারে এবং তার বৈশিষ্ট্য কী হতে পারে, তা কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করা যায়।

তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিসামুক্ত পেরোভস্কাইট সৌরকোষ এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণের উপাদান। সৌরকোষে সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। পেরোভস্কাইট উপাদান সৌরকোষে সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিসার পরিবর্তে নিরাপদ উপাদান ব্যবহার করে কার্যকর সৌরকোষ তৈরি করা গেলে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে হাইড্রোজেনকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিব্যবস্থায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক হোসেনের ২৮০টির বেশি পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র রয়েছে এবং তাঁর h-index ৩৭। তিনি ১৩ জন পিএইচডি ও ৪৮ জন এমফিল গবেষককে তত্ত্বাবধান করেছেন। কমনওয়েলথ ও জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্সের ফেলোশিপের পাশাপাশি পেয়েছেন বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভৌতবিজ্ঞান স্বর্ণপদক।

সেঁজুতি সাহা ও লাফিফা জামালের আলোচনায় চিকিৎসায় প্রযুক্তির ব্যবহার
অধ্যাপক হোসেনের ২৮০টির বেশি পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র রয়েছে এবং তাঁর h-index ৩৭। তিনি ১৩ জন পিএইচডি ও ৪৮ জন এমফিল গবেষককে তত্ত্বাবধান করেছেন।

ফিরদৌসী কাদরী: টিডব্লিউএএস কাউন্সিলেও বাংলাদেশের প্রতিনিধি

সাতজন নতুন ফেলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরীর নির্বাচন। তিনি TWAS কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন আগামী দুই বছর।

ফিরদৌসী কাদরী বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও টিকা গবেষণার পরিচিত নাম। সংক্রামক রোগ, রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা, কলেরা ও টাইফয়েডের টিকা এবং টিকার কার্যকারিতা যাচাই নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবন।

অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরী

আইসিডিডিআর,বিতে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতায় যুক্ত থেকেছেন তিনি। তাঁর গবেষণার একটি বড় লক্ষ্য ছিল সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ও সাশ্রয়ী টিকা তৈরি এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

TWAS কাউন্সিল একাডেমির কাজের দিকনির্দেশনা দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের দায়িত্ব পালন করে। নতুন কাউন্সিলের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১ জন নারী এবং চারজন পুরুষ। এই কাউন্সিলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ফিরদৌসী কাদরী।

ফিরদৌসী কাদরী: আমাদের বিজ্ঞানী, আমাদের গৌরব
সংক্রামক রোগ, রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা, কলেরা ও টাইফয়েডের টিকা এবং টিকার কার্যকারিতা যাচাই নিয়ে অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরীর দীর্ঘ গবেষণাজীবন।

গবেষণার স্বীকৃতি, দেশের জন্য সম্ভাবনা

সাত বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় আলাদা। কিন্তু তাঁদের কাজগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে বাংলাদেশের সামনে থাকা কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিরাপদ পানি, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ প্রতিরোধী ফসল, নতুন ওষুধের সম্ভাবনা, প্লাস্টিক দূষণ, চিকিৎসায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত।

এই গবেষণাগুলোর সব ফল যে আগামীকালই বাজারে পাওয়া যাবে বা দেশের সব সমস্যার সমাধান করবে, তা নয়। মৌলিক গবেষণার ফল বাস্তবে কাজে লাগাতে সময়, অর্থ, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পরীক্ষাগারে নতুন কোনো জৈব সক্রিয় যৌগ শনাক্ত হলেই সেটি ওষুধ হয়ে যায় না। পাট থেকে তৈরি নতুন উপাদান উদ্ভাবন করলেই প্লাস্টিকের ব্যবহার রাতারাতি বন্ধ হবে না। আবার ধানের রোগ প্রতিরোধী নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কারের পর তা আগামীকালই মাঠে বুনে দেওয়া যাবে না। এসবের ফল আসবে ধীরে ধীরে।

তবু এসব গবেষণার গুরুত্ব কমে না, বরং এগুলো দেখায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা কেবল দেশের সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন না; তাঁদের গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনেও আলোচিত হচ্ছে। একই বছরে সাতজন বিজ্ঞানীর টিডব্লিউএএস ফেলো নির্বাচন, কামরুন নাহারের আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং ফিরদৌসী কাদরীর কাউন্সিল সদস্য হওয়া সেই স্বীকৃতিরই অংশ।

সূত্র: টিডব্লিউএএস ডট অর্গ, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এবং শেরেবাংলা এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বুয়েট) অফিশিয়াল সাইটবিশ্বমঞ্চে মারজানার আবিষ্কারের জয়জয়কার

Read full story at source