যে নারী বিজ্ঞানী নিউক্লিয়ার ফিশন ব্যাখ্যা করেও নোবেল পাননি

· Prothom Alo

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণা দেশ-কাল ও সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ত বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের মাধ্যমে। লিজ মাইটনার ছিলেন এই আন্দোলনের এক অগ্রপথিক। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী এমন এক সময়ে তেজস্ক্রিয়তা ও পারমাণবিক গবেষণায় নিজের ক্যারিয়ার গড়েছিলেন, যখন খুব কম নারীরই উচ্চশিক্ষায় জ্যেষ্ঠ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ ছিল।

Visit truewildgame.online for more information.

১৯৩৮ সালে নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য লিজ মাইটনারের নাম আজ বিজ্ঞানের ইতিহাসে উজ্জ্বল। এ আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানকে যেমন বদলে দিয়েছিল তেমনি আধুনিক যুদ্ধের নীতিনির্ধারণেও বড় ভূমিকা রেখেছিল। ফিশন-সংক্রান্ত কাজের জন্য ১৯৪৪ সালে লিজের দীর্ঘদিনের সহযোগী অটো হানকে রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। লিজ মাইটনারের এই নোবেল বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা আজও বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত বিতর্ক হয়ে আছে।

১৮৭৮ সালে ভিয়েনায় জন্ম নেওয়া লিজ মাইটনার ১৯০৬ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী দ্বিতীয় নারী ছিলেন। এরপর তিনি বার্লিনে চলে যান। সেখানে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্কের বক্তৃতা শোনার সুযোগ পান। সেখানেই অটো হানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত সম্পর্কের সূচনা হয়। ১৯১৭ সালে এই জুটি প্রোটেক্টিনিয়াম মৌলটি শনাক্ত করেন। এতে তিনি জার্মান বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯২৬ সালে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম নারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। লিজের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরমাণুর গঠন ও ইউরেনিয়াম থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গমনের সম্ভাবনা। সেই সময় তাঁর বিভিন্ন ধারণা শুধু গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিল।

১৯৩৩ সালের পর জার্মানির রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। ১৯৩৮ সালে তিনি জীবন বাঁচাতে জার্মানি থেকে পালিয়ে নেদারল্যান্ডস হয়ে সুইডেনে আশ্রয় নেন। কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউটে নিজের দীর্ঘদিনের পদ এবং স্থাবর-অস্থাবর সবকিছুই তাঁকে পেছনে ফেলে আসতে হয়। স্টকহোমে নির্বাসনে থাকলেও অটো হানের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ১৯৩৮ সালের শেষের দিকে অটো হান ও ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়ামকে আঘাত করার পর এক অদ্ভুত ফলাফল পান, যা তাঁরা ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না। লিজের ভাইয়ের ছেলে অটো রবার্ট ফ্রিশ তখন তাঁর কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন। লিজ ও ফ্রিশ মিলে সেই পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করেন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছান ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসটি দুটি ছোট অংশে বিভক্ত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার নাম তাঁরা দেন ফিশন। তাঁদের এই যুগান্তকারী ব্যাখ্যা ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

পারমাণবিক বিভাজন আবিষ্কারের কৃতিত্বস্বরূপ ১৯৪৪ সালে যখন অটো হান নোবেল পান, লিজ মাইটনারের নাম সেখানে অদ্ভুতভাবে অনুপস্থিত ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, রসায়ন বনাম পদার্থবিজ্ঞানের সীমানা আর লিঙ্গবৈষম্য এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটান প্রজেক্টে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু শান্তিবাদী লিজ সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেছিলেন, বোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না! যুদ্ধের পর তিনি সুইডেন ও ব্রিটেনে তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। নোবেল না পেলেও তিনি ম্যাক্স প্লাঙ্ক মেডেল ও এনরিকো ফের্মি অ্যাওয়ার্ডের মতো সম্মাননা লাভ করেন। এমনকি পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌলটির নাম তাঁর সম্মানে রাখা হয়েছে মাইটনারিয়াম।

১৯৬৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিস্তম্ভে ভাইপো অটো ফ্রিশ একটি মর্মস্পর্শী এপিটাফ লিখেছিলেন, লিজ মাইটনার এমন একজন পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি কখনো তাঁর মানবতা বোধ হারাননি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

Read full story at source