‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উম্মে কুলসুম কীভাবে মোসাদের লক্ষ্যবস্তু হলেন
· Prothom Alo

১৯৭৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ভোরের সেই লগ্নে থমকে গিয়েছিল গোটা আরব বিশ্ব। মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের পর কায়রোর রাজপথে দ্বিতীয় বৃহত্তম শোকমিছিল দেখা গিয়েছিল সেদিন। প্রিয় শিল্পীকে শেষবিদায় জানাতে রাস্তায় নেমেছিলেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ।
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
উম্মে কুলসুমকে স্মরণ করা হয় ‘লেডি অব অ্যারাবিক সং’ বা আরবি সংগীতের সম্রাজ্ঞী হিসেবে। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠ এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল আরব বিশ্বকে। রেডিওতে তাঁর মাসিক লাইভ কনসার্টের প্রচার চলাকালে শহরগুলোর ব্যস্ততা থমকে যেত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেম, বিরহ আর আকুলতার ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর গান।
তবে কুলসুমের প্রভাব শুধু মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর ৫০ বছর পর সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কিছু তথ্য নতুন করে আলো ফেলছে এ কিংবদন্তির জীবনের ওপর। দাবি করা হচ্ছে, তাঁর কণ্ঠস্বর এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কয়েক দশক আগেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ‘হিট লিস্ট’ বা গুপ্তহত্যার তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর।
ফিলিস্তিনের ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’
ব্যাপক সংঘাতে সীমান্তগুলো এত বিভক্ত হওয়ার আগে লেভান্ট অঞ্চলে (ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলীয় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল) সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করত উম্মে কুলসুমের গান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তিনি অন্তত তিনবার ফিলিস্তিন সফর করেন। জাফা, হাইফা ও জেরুজালেমের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে গান গেয়েছেন তিনি।
দাবি করা হচ্ছে, উম্মে কুলসুমের কণ্ঠস্বর এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কয়েক দশক আগেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ‘হিট লিস্ট’ বা গুপ্তহত্যার তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর।
বিখ্যাত ফিলিস্তিনি সংগীতশিল্পী ওয়াসিফ জওহরিয়ার নথিতে উম্মে কুলসুমের সেই সফরের বর্ণনা পাওয়া যায়। ট্রেনের বগিতে শহর থেকে শহরে ঘুরে তিনি গেয়েছেন ‘এন কোন্ত আসমেহ’–এর (যদি আমি ক্ষমা করি) মতো কালজয়ী গানগুলো। জনশ্রুতি আছে, ফিলিস্তিনের এক থিয়েটারে তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে এক ভক্ত চিৎকার করে তাঁকে ‘কাওকাব আল-শার্ক’ বা ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
ত্রাস সৃষ্টি, টার্গেট কিলিং: ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকুলসুমের এই পরিবেশনাগুলো ছিল সমৃদ্ধ ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রমাণ। সেখানে প্রাণবন্ত থিয়েটার ও সাহিত্যজগৎ গড়ে উঠেছিল। জামিল আল-বাহরি ও নাজিব নাসসারের মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন সেই অঙ্গনের অংশ। ১৯৪৮ সালের নাকবার (ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়) পর এই জগৎ অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে যায়।
১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর প্যারিসের অলিম্পিয়া থিয়েটারে কনসার্টের পর তাঁর সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে মিসরীয় গায়িকা উম্মে কুলসুমজাতীয় মিশন ও মোসাদের নজর
ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উম্মে কুলসুমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে মিসরীয় সংবাদপত্র ‘আল বালাগ’ খবর প্রকাশ করে যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে উম্মে কুলসুম ছাড়াও সালিমা পাশা মুরাদ, সিহাম রিফকিসহ বেশ কয়েকজন আরব শিল্পীর বিরুদ্ধে ‘মৃত্যুদণ্ড’ ঘোষণা করা হচ্ছে।
উম্মে কুলসুম, মিসরের সংগীতশিল্পী ও অভিনেত্রী১৯৬৭ সালের নাকসার (ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে আরব দেশগুলোর পরাজয়) পর আমি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করিনি। আমার সামনে দুটো পথ ছিল। চুপ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অথবা আমার অস্ত্র—‘আমার কণ্ঠ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ও যুদ্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা দেওয়া। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম।এই শিল্পীদের ‘অপরাধ’ ছিল, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আরব সেনাবাহিনী ও জনগণের মনোবল চাঙা করা। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সেই কথিত দণ্ড তুলে নেওয়া হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ উম্মে কুলসুমের গানকে নিছক বিনোদন নয়; বরং নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছিল।
তবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পরাজয় বা ‘নাকসা’র পর উম্মে কুলসুমের রাজনৈতিক ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ হয়। পরে তিনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আল-হিলাল ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৬৭ সালের নাকসার পর আমি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করিনি। আমার সামনে দুটো পথ ছিল। চুপ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অথবা আমার অস্ত্র—“আমার কণ্ঠ” নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ও যুদ্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা দেওয়া। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম।’
মিসরীয় সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য কুলসুম ব্যাপক তহবিল সংগ্রহের অভিযান শুরু করেন। একে তিনি অভিহিত করেন ‘জাতীয় মিশন’ হিসেবে। এই মিশন তাঁকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে নিয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে তিনি প্যারিসের অলিম্পিয়া থিয়েটারেও গান পরিবেশন করেন। সেখানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
এ কনসার্ট ছিল ব্যতিক্রমী। ইতিহাসবিদ নামিক সিনান তুরান বলেন, প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের অনুরোধে অলিম্পিয়ার পরিচালক ব্রুনো কোকাত্রিক্স কুলসুমকে আমন্ত্রণ জানান। অলিম্পিয়া থিয়েটারে গান পরিবেশনের আগে মিসরের বেতার উপস্থাপক জালাল মোয়াওয়াদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ প্যারিসে গাইছেন উম্মে কুলসুম, কাল গাইবেন অধিকৃত জেরুজালেমে’।
১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে মিসরীয় সংবাদপত্র ‘আল বালাগ’ খবর প্রকাশ করে যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে উম্মে কুলসুমসহ বেশ কয়েকজন আরব শিল্পীর বিরুদ্ধে ‘মৃত্যুদণ্ড’ ঘোষণা করা হচ্ছে। তাঁদের ‘অপরাধ’ ছিল, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আরব সেনাবাহিনী ও জনগণের মনোবল চাঙা করা।
এ কথা শুনে থিয়েটারের পরিচালক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পর্দার পেছনে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু উম্মে কুলসুম নিজ অবস্থানে অটল ছিলেন। কুলসুম দৃঢ়ভাবে বলেন যে তিনি একটি জাতীয় মিশনে রয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এতে যদি আপনাদের লজ্জা হয়, তবে আমরা সব গুছিয়ে চলে যাব।’ শেষ পর্যন্ত তিনি সেই দ্বন্দ্বে জয়ী হন। ঘোষণাটি আবার দেওয়া হয় এবং দর্শকদের তুমুল করতালিতে থিয়েটার মুখর হয়ে ওঠে।
১৯৩৫ সালে ফিলিস্তিনি পত্রিকা আল-দিফায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন। শিরোনাম ছিল, ‘ফিলিস্তিনের শহরগুলোতে গান ও আনন্দের উৎসব’। এতে জেরুজালেম, জাফা ও হাইফায় উম্মে কুলসুমের কনসার্টের প্রচার করা হয়‘অপারেশন কাউ’স আইজ’
সাংবাদিক তৌহিদ মাগদির লেখা ‘উম্মে কুলসুম অ্যান্ড দ্য মোসাদ: সিক্রেটস অব অপারেশন কাউ’স আইজ’ বইয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথির বরাতে বলা হয়, মোসাদ কীভাবে তাঁর ওপর নজরদারি চালাত। কায়রোতে কুলসুমের বাড়িতে আড়িপাতার চেষ্টা থেকে শুরু করে তাঁকে ভয় দেখিয়ে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করার নানা ছক এঁকেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।
এপস্টেইন ফাইলস: যৌন অপরাধের আড়ালে মোসাদ ও সিআইএর গোপন জালগোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, উম্মে কুলসুম একক প্রচেষ্টায় ১২টি আধুনিক ট্যাংক বা পাঁচটি যুদ্ধবিমান কেনার মতো অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, মোসাদ তাঁকে হত্যার জন্য একজন গ্রিক এজেন্টকে নার্স সাজিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনাও করেছিল। তাঁর হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিষপ্রয়োগে হত্যার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। অভিযানটি ব্যর্থ হলেও এটি প্রমাণ করে যে আরব প্রতিরোধের স্তম্ভ হিসেবে তাঁর অবস্থান কতটা উঁচুতে ছিল।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের লোগোবিতর্ক ও উত্তরাধিকার
২০২০ সালে ইসরায়েলের লোদ ও হাইফা পৌরসভা উম্মে কুলসুমের নামে রাস্তার নামকরণের সিদ্ধান্ত নিলে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। সমালোচকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইহুদি নিধনের’ গান গাওয়ার বানোয়াট অভিযোগ আনেন। মূলত বিতর্কটি ছিল ১৯৬৮ সালের ‘আসবাহা আনদি আলানা বুন্দুকিয়াহ’ (আমার এখন একটি রাইফেল আছে) গানটি নিয়ে। সিরীয় কবি নিজার কাব্বানির লেখা সেই গানে প্রকৃতপক্ষে ছিল (আরব) প্রতিরোধ ও ঘরবাড়ি হারানোর আর্তনাদ।
মোসাদ উম্মে কুলসুমকে হত্যার জন্য একজন গ্রিক এজেন্টকে নার্স সাজিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনাও করেছিল। তাঁর হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিষপ্রয়োগে হত্যার সেই চেষ্টা সফল হয়নি।ব্যক্তিগত জীবনে উম্মে কুলসুম অনেক ইহুদি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সুরকার দাউদ হোসনি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ। তাঁর এক প্রিয় বন্ধু ছিলেন ইহুদি অভিনেত্রী রাকিয়া ইব্রাহিম। তবে রাজনৈতিকভাবে কুলসুম ছিলেন জায়নবাদ ও উপনিবেশবাদের ঘোর বিরোধী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে তিনি তাঁর শিল্পকে আলাদা করেননি।
ইরানের ভেতর ইসরায়েলের গোয়েন্দা তৎপরতার জাল কতটা বিস্তৃত১৯৭০–এর দশকের শুরুর দিকে উম্মে কুলসুমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁর শেষ পরিবেশনা ‘লাইলাত হোব’ (ভালোবাসার এক রাত)–এ সংগীতশিল্পীরা লক্ষ করেন, প্রকৃতির শক্তির মতো যে কণ্ঠ একসময় গর্জে উঠত, তাতে ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। শেষবারের মতো পর্দা নামার পর মঞ্চে নেমে আসে এক ‘সীমাহীন নীরবতা’।
মৃত্যুর অর্ধশতক পরও উম্মে কুলসুম শুধু একজন গায়িকা নন। তিনি রেডিওর প্রতিধ্বনি, হারিয়ে যাওয়া বহু সাংস্কৃতিক ফিলিস্তিনের প্রতীক এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি গানও যে দুর্গের মতো শক্তিশালী হতে পারে; তার স্মারক হয়ে আছেন।
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্
মোসাদ ও ইরানের মধ্যে অন্তরালে যে যুদ্ধ চলছে