অনিশ্চিত করব্যবস্থা, নীতির দুর্বল প্রয়োগ বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে

· Prothom Alo

বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও ধারাবাহিক নীতির অভাবের পাশাপাশি এর যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বিনিয়োগের পরিবেশ দুর্বলই থেকে যাচ্ছে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য এ দেশে প্রায়ই খরচের তুলনায় অনিশ্চয়তাই প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁদের মতে, অনিশ্চিত করব্যবস্থা, নীতির দুর্বল প্রয়োগ এবং পরস্পরবিরোধী নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা খরচ বাড়াচ্ছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সময়ক্ষেপণ করছে।

আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তাঁরা বলেছেন, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নির্ভরযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ঝুঁকির মধ্যে থেকেই যাবে।

Visit casino-promo.biz for more information.

ঢাকায় জাপান দূতাবাস, জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই) এবং জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকার (জেসিআইএডি) যৌথ উদ্যোগে ‘জাপান বিজনেস ডে’ শীর্ষক দিনব্যাপী ওই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। ওই অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি। সেমিনারে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতিবিষয়ক ২০২৫ জেট্রো সমীক্ষা উপস্থাপন করা হয়।

শু-কু-কাইয়ের প্রেসিডেন্ট মানবু সুগাওয়ারা বলেন, বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে সুস্পষ্ট, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যথাযথ নীতির প্রয়োগ অপরিহার্য। প্রায়ই পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার তুলনায় ব্যবসায় অনিশ্চয়তাই বেশি প্রাধান্য পায়। তিনি কর সংস্কারকে একটি অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দ্রুততর সেবা এবং নির্ভরযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি সহজতর পদ্ধতি, সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তুলে ধরে সুগাওয়ারা বলেন, পরস্পরবিরোধী নির্দেশনার কারণে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দেরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের খরচ বাড়ে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল, সুবিন্যস্ত ও সময়সীমাভিত্তিক অনুমোদন, লাইসেন্স ও নবায়নসহ একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর আহ্বান জানান তিনি।

ভিসা ও ব্যবসার অনুমোদন পেতে ক্রমাগত বিলম্বের কথা উল্লেখ করে সুগাওয়ারা বলেন, এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করতে হবে। তাঁর ওয়ার্ক পারমিট মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন তিনবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা জানিয়ে বিনিয়োগের নেতিবাচক পরিবেশ তুলে ধরেন।

মিতসুবিশি করপোরেশনের এদেশীয় প্রতিনিধি হিরোশি উয়েগাকি জাপানি সংস্থাগুলোর জন্য বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ শক্তিশালী করতে মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানান। তিনি বিলম্ব কমাতে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতি রেখে তথ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক দক্ষতা এবং দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের উন্নতির ওপর জোর দেন। আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং কার্যক্রমকে আরও মসৃণ করতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) গুরুত্ব তুলে ধরেন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী আস্থা নিশ্চিত করতে এবং একটি স্থিতিশীল, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ইঙ্গিত দিতে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন হিরোশি উয়েগাকি।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তারেক রফি ভূঁইয়া বলেন, ইপিএ একটি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে জাপানে নিরবচ্ছিন্ন বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ টেকসই করার জন্য বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রফি ভূঁইয়া বলেন, বিনিয়োগকারীরা পূর্বাভাসযোগ্যতা, ধারাবাহিক নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থাকে গুরুত্ব দেন। টেকসই জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সংস্কারগুলোকে অবশ্যই ইপিএর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন এবং উন্নয়ন সহায়তানির্ভরতা থেকে সরে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে জাপানের বিনিয়োগ আরও বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এই বিনিয়োগে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎপাদন খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি জোর দেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা শক্তি গড়ে তোলা যায়।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সরকার নীতিগত সংস্কারের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই সংস্কারের মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া শিথিল করা বাজারভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন সাধন।

সেমিনারে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জাপানি প্রতিষ্ঠানসহ টেকসই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে একগুচ্ছ সংস্কার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে কর প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে এবং অনিশ্চিত প্রয়োগজনিত চাপ কমাতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও তিনি জোর দেন, যাতে পরস্পরবিরোধী নির্দেশনার কারণে কার্যক্রমে বিলম্ব না ঘটে।

আশিক চৌধুরী লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করতে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর আহ্বান জানান এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট পরিকল্পনা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক লাভের পরিবর্তে কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। এই চুক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি নিশ্চয়তা দেয় এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য পরিবেশকে শক্তিশালী করে।

২০২৫ জেট্রো সমীক্ষা উপস্থাপনের সময় জেট্রোর এদেশীয় প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকা বলেন, শক্তিশালী মুনাফার প্রত্যাশা এবং সম্প্রসারণে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে জাপানি ব্যবসাগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। তিনি প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে জোর দিয়ে বলেন, এই ক্ষেত্রগুলোর উন্নতি আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।

এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মনজুর বলেন, বাংলাদেশের উচিত নিজেকে একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, জাপানে রপ্তানি করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হওয়া। ইপিএকে কাজে লাগালে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব আরও গভীর হতে পারে এবং বাণিজ্য ও সেবা খাতকে উৎসাহিত করা সম্ভব।

পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাপানের সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের অধীনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক। তবে কিছু দুর্বলতা এর সুফলকে ম্লান করে দিতে পারে। সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্বল সহযোগিতা, সরকারি-বেসরকারি সংলাপের অভাব এবং বেসরকারি খাতের সীমিত সংযোগ নীতি বাস্তবায়ন ও বিনিয়োগ পরিবেশ সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করে।

Read full story at source