জিনসের পকেটে এই ছোট্ট ধাতব বোতাম থাকে কেন

· Prothom Alo

জিনসের পকেটের কোনায় থাকা ছোট্ট ধাতব বোতামগুলো কেন থাকে, ভেবেছেন কি? অনেকেই এই বোতামগুলোকে স্রেফ নকশা মনে করি। কিন্তু আদতে এগুলোর পেছনে আছে এক দারুণ প্রয়োজনীয় কারণ।

জিনসের পকেটের কোনায় থাকা ছোট্ট ধাতব বোতামগুলো কেন থাকে, ভেবেছেন কি?

জিনস বা ডেনিম প্যান্টের পকেটে ছোট্ট এই ধাতব বোতামগুলো থাকে কেন, তা জানতে হলে আগে জানতে হবে জিনসের ইতিহাস। আজ স্টাইলের জন্য যে জিনস পরি, এর জন্ম হয়েছিল মূলত খনিশ্রমিক ও কঠোর পরিশ্রমী মানুষদের জন্য।

Visit grenadier.co.za for more information.

আঠারো শতকের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে সোনার খনি আর রেলপথ তৈরির কাজ ব্যাপকভাবে শুরু হয়। তখন শ্রমিকেরা এক বড় সমস্যায় পড়েন।

খনির ভেতরের পরিবেশ আর দিনভর কঠোর পরিশ্রমের ফলে তাঁদের সাধারণ প্যান্টগুলো খুব দ্রুত ছিঁড়ে যেত। এই কঠিন কাজের জন্য এমন এক বিশেষ পোশাকের প্রয়োজন ছিল, যা সহজে ছিঁড়বে না এবং অনেক দিন টিকবে।

ডেনিম নামটির উৎপত্তি যেভাবে

সেই চিন্তা থেকে নতুন ধরনের প্যান্ট তৈরি করেন যুক্তরাষ্ট্রের লিভাই স্ট্রাউস নামের এক কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি খেয়াল করেন, সাধারণ সুতি বা লিনেনের প্যান্ট খনির পরিবেশে টিকছে না।

তখন তিনি ফ্রান্সের নিম শহরের একধরনের শক্ত সুতার কাপড় দিয়ে প্যান্ট বানাতে শুরু করেন। এই কাপড়কে বলা হতো ‘সার্জ দে নিম’। মানুষের মুখে মুখে ছোট হয়ে পরবর্তী সময়ে এই ‘দে নিম’ থেকেই আজকের ‘ডেনিম’ শব্দটি এসেছে।

সে সময় ডেনিম কাপড়টি ছিল যেমন মোটা, তেমনই টেকসই। ১৮২৯ সালের দিকে লিভাই স্ট্রাউস যুক্তরাষ্ট্রে এই প্যান্ট বিক্রি শুরু করেন।

পোশাক আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, জানেন?সোয়েট শার্টে এমন ত্রিভুজ অংশ থাকে কেন

জিনস নামটা যেভাবে এল

জিনসের পকেটের কোনায় যে ছোট্ট ধাতব বোতামগুলো দেখা যায়, সেগুলোকে বলে ‘রিভেট’

অন্যদিকে জিনস নামটির পেছনেও আছে এক মজার কাহিনি। ইতালির জেনোয়া শহরের এই কাপড়কে নীল রং করে জাহাজের পাল বা কাজের পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। ফরাসিরা একে বলত ‘ব্লু দে জেনেস’, যা থেকে পরবর্তীকালে ‘ব্লু জিনস’ নামটির উৎপত্তি হয়। শব্দটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

শুরুর দিকে এই প্যান্টগুলো ছিল ঢিলেঢালা ও কেবল নীল রঙের। নীল রং ব্যবহার করার বৈজ্ঞানিক কারণও ছিল। প্রাকৃতিক নীল বা ইন্ডিগো ডাই কাপড়ের ভেতরে না ঢুকে কেবল ওপরের স্তরে লেগে থাকত বলে বারবার ধোয়ার পরও সুতার ভেতরের অংশ অক্ষত ও মজবুত থাকত। সেই থেকে বেশির ভাগ জিনসের রং নীল।

বোতামগুলোর কাজ কী

জিনসের পকেটের কোনায় যে ছোট্ট ধাতব বোতামগুলো দেখা যায়, সেগুলোকে বলে ‘রিভেট’। শুরুর দিকে খনি বা কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের একটি বড় সমস্যা ছিল। পকেটের কোনা আর প্যান্টের জয়েন্টগুলো খুব দ্রুত ছিঁড়ে যেত।

১৮৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা শহরের এক দরজি জ্যাকব ডেভিস এ সমস্যার সমাধান বের করেন। তিনি প্যান্টের সেই দুর্বল জায়গাগুলোয় হাতুড়ি দিয়ে ছোট ছোট তামার রিভেট দিয়ে জোড়া লাগান। এতে সাধারণ সেলাইয়ের চেয়ে প্যান্টের স্থায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়।

মার্কিন দরজি জ্যাকব ডেভিস জিনসের ধাতব বোতাম রিভেটের উদ্ভাবক

এভাবেই জন্ম নেয় আজকের এই জনপ্রিয় ‘রিভেটেড ব্লু জিনস’। সে সময় এই প্যান্টগুলো ‘XX’ নামে পরিচিত ছিল, যা পরে বিশ্বজুড়ে ‘৫০১ জিনস’ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

খনিশ্রমিক বা ভারী কাজ করেন, এমন ব্যক্তিদের জন্য এই রিভেট ছিল একটি চমৎকার ও টেকসই সমাধান। পকেটের কোনা বা সেলাই ফেটে যাওয়া ঠেকাতে এটি ম্যাজিকের মতো কাজ করত।

জ্যাকব ডেভিসের তৈরি এই মজবুত প্যান্টগুলো বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। এমনকি সে সময় অন্য দরজিরাও তাঁর এই নকশা নকল করতে শুরু করেন।

জিনস কি না ধুয়ে সারাজীবন পরা যায়?

পেটেন্ট ও ব্যবহার

লিভাইসের শুরুর দিকের ট্রেডমার্ক

ডেভিস বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর এই আইডিয়ার পেটেন্ট করা জরুরি। কিন্তু সে সময় পেটেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় ৬৮ ডলার তাঁর কাছে ছিল না। তাই ১৮৭২ সালে তিনি তাঁর কাপড়ের জোগানদাতা লিভাই স্ট্রাউসের সঙ্গে চুক্তি করেন।

স্ট্রাউস পেটেন্টের খরচ দেন এবং সান ফ্রান্সিসকোয় গিয়ে উৎপাদন তদারকির দায়িত্ব নেন ডেভিস। ১৮৭৩ সালের ২০ মে তাঁরা যৌথভাবে এই রিভেটেড ডেনিম তৈরির পেটেন্ট পান।

১৮৯০ সাল পর্যন্ত এই নকশার ওপর কেবল লিভাই স্ট্রাউস অ্যান্ড কো.–র একচ্ছত্র অধিকার ছিল। অনেক প্রতিযোগী অন্য উপায়ে প্যান্ট মজবুত করার চেষ্টা করলেও তামার রিভেটের মতো সহজ ও সুন্দর সমাধান আর কেউ দিতে পারেনি।

১৮৯০ সালে পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সব কোম্পানিই তাদের জিনসে রিভেট ব্যবহার শুরু করে।

লিভাইসের ট্রেডমার্ক

পরবর্তী সময়ে লিভাইস তাদের ট্রেডমার্ক দুই ঘোড়ার লেবেল, লাল ট্যাব এবং বিখ্যাত লিভাইস নামটি ট্রেডমার্ক করে নেয়।

এখন হয়তো আগের মতো খনিতে কাজ করার জন্য রিভেটের প্রয়োজন পড়ে না। তবু এটি আজও প্যান্টের পকেটে রয়ে গেছে। রিভেট ছাড়া জিনস যেন অসম্পূর্ণ। অনেকে তো রিভেট ছাড়া জিনসকে নকল বলেও মনে করেন!

সূত্র: ইয়াহু লাইফস্টাইল, ফাইভ পকেট জিনস, সিএনএন, বিজনেস ইনসাইডার

অধিকাংশ প্যান্ট বা ব্যাগের চেইনে কেন এই তিনটি অক্ষর লেখা থাকে

Read full story at source