আধুনিক অবকাশযাপন, স্বস্তির জীবন

· Prothom Alo

একঘেয়েমি দূর করে প্রশান্তির খোঁজে মানুষ এখন ঝুঁকছে আধুনিক অবকাশযাপন ও ওয়ার্কেশনের দিকে। দেশের বর্ধিষ্ণু হোটেল–রিসোর্ট শিল্পের সম্ভাবনা, খরচ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ নিয়ে বিশেষ আয়োজন ‘চেক-ইন’।

Visit turconews.click for more information.

যান্ত্রিক নগরের ব্যস্ততা, ট্রাফিক জ্যাম আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পেতে এখন আর মানুষ শুধু ক্যালেন্ডারের দীর্ঘ ছুটির অপেক্ষায় থাকে না। আধুনিক জীবনে অবকাশযাপন এখন বিলাসিতা নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক অপরিহার্য বিনিয়োগ। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের হোটেল ও রিসোর্ট শিল্পে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এখানে যেমন আরামদায়ক সময় কাটানো যাচ্ছে, তেমনি করপোরেট জগতের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চলছে বিয়ে থেকে শুরু করে নানা রীতি–রেওয়াজের অনুষ্ঠান।

হোটেল ও রিসোর্টগুলো এখন অতিথির পছন্দ-অপছন্দ বিশ্লেষণ করে সেবা দিচ্ছে। চেক-ইন করার আগেই আপনার ঘরের তাপমাত্রা কত থাকবে, বালিশটি নরম হবে না শক্ত, কিংবা সকালের নাশতায় ডায়েট চার্ট অনুযায়ী কী থাকবে—সবই এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ডায়েট-স্পেসিফিক এবং কাস্টমাইজড সেবার মাধ্যমে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেই রুমের আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে রুম সার্ভিস—সবই এখন হাতের মুঠোয়।

করপোরেট রিট্রিট ও ওয়ার্কেশন

ছুটি মানেই এখন আর কাজ বন্ধ নয়, আবার কাজ মানেই চার দেয়ালের অফিস নয়। গত কয়েক বছরে ‘ওয়ার্কেশন’ (ওয়ার্ক ও ভ্যাকেশন) ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রিসোর্টগুলো এখন উচ্চগতির ইন্টারনেট আর নিরিবিলি ওয়ার্ক স্টেশনের সুবিধা দিচ্ছে, যাতে পাহাড় বা সমুদ্রের দিকে তাকিয়েই সেরে নেওয়া যায় জরুরি মিটিং।

পাশাপাশি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বার্ষিক সাধারণ সভা বা টিম বিল্ডিংয়ের জন্য রিসোর্টগুলোকে বেছে নিচ্ছে। প্রথাগত কনফারেন্স রুমের বাইরে খোলা আকাশের নিচে বা সুসজ্জিত লনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন। এতে কর্মীদের মধ্যে কাজের স্পৃহা বাড়ছে।

কেন মানুষ রিসোর্টমুখী

একটানা শহুরে জীবন মানুষের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। আধুনিক যুগে মানুষ এখন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ খুঁজছে। লাক্সারি রিসোর্টগুলো এখন স্পা, স্টিম বাথ, যোগব্যায়াম এবং মেডিটেশনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখছে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আধুনিক নাগরিক সুবিধা—এই কম্বিনেশনই মানুষকে যান্ত্রিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি দিচ্ছে। পাঁচ তারকা হোটেলের ইনফিনিটি পুল কিংবা রিসোর্টের বারান্দায় বসে কফি খাওয়ার মুহূর্তটুকু এখন নাগরিক জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওনা।

এখন পরিবেশবান্ধব ও টেকসই স্থাপত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাঁশ, কাঠ আর মাটির শৈল্পিক ব্যবহার যেমন দেখা যাচ্ছে, তেমনি থাকছে লাক্সারি সুযোগ-সুবিধা। 

ব্যবসার হালচাল

বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ছোট-বড় আট শতাধিক মানসম্মত হোটেল–রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশে, কক্সবাজার এবং সিলেটে লাক্সারি ক্যাটাগরির হোটেলের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। সরকারের পর্যটন বোর্ড এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ এখন ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

উদ্যোক্তারা এখন কেবল অবকাঠামো নয়, বরং জনবল প্রশিক্ষণেও বিনিয়োগ করছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, দামি আসবাবের চেয়ে একজন হাসিমুখের কর্মীর সঠিক আতিথেয়তা অতিথিদের বেশি টানে। আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশি উদ্যোক্তারাও এখন বৈশ্বিক মানের সেবা নিশ্চিত করছেন।

ঢাকায় পাঁচ তারকা চেইন হোটেলের এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় হোটেল ব্যবসা নির্ভর করছে বিজনেস ট্রাভেলারদের ওপর। এসব হোটেলের বেশির ভাগ আয় হচ্ছে ওয়াকিং প্রোগাম থেকে। তবে ছুটির দিনে ফ্যামিলি স্টেকেশন করতে এখন অনেকেই আসছেন। এ থেকেও আয় বাড়ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন ব্যবসার গতি বাড়ছে। পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবসা ভালো হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে।  তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ধারায় আছে হোটেল ব্যবসা। রাজনৈতিক স্থিতশীলতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর এই ব্যবসা নির্ভর করছে। আমরা আশা করছি আগামী দিনে এ ব্যবসা আরও ভালো যাবে।’

নগরবাসীর ‘রিফ্রেশমেন্ট বাটন’

তুরানুর ইসলাম

যান্ত্রিক শহর ঢাকা। ইটপাথরের এই বিশাল জঙ্গলে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে মানুষের জীবন। যানজট, কর্মস্থলের প্রবল চাপ আর দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি—সব মিলিয়ে ঢাকার কর্মব্যস্ত মানুষের জীবনে ক্লান্তির যেন কোনো শেষ নেই। এই হাঁসফাঁস করা নগরজীবনে একটুকু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে ইদানীং দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ডে–আউট কালচার’। ছুটির দিনে কেবল চার দেয়ালে বন্দী থাকার বদলে ঢাকার মানুষ এখন খুঁজছেন এক দিনের ছোট্ট কোনো ছুটি। এই ডে–আউট যেন তাঁদের জীবনের কাঙ্ক্ষিত এক ‘রিফ্রেশমেন্ট বাটন’।  

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, সাপ্তাহিক ছুটির দিন মানেই ছিল বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা, ভালো–মন্দ খাওয়া আর টেলিভিশনের সামনে বসে সময় কাটানো। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে বিনোদনের ধরন। এখন শুক্রবার বা শনিবার এলেই পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনকে নিয়ে অনেকেই বেরিয়ে পড়েন। গন্তব্য খুব বেশি দূরের নয়; হয়তো ঢাকার অদূরে গাজীপুরের কোনো ছিমছাম রিসোর্ট, পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকার খোলা প্রান্তর কিংবা নারায়ণগঞ্জের কোনো ঐতিহাসিক স্থান। সবুজের কাছাকাছি এক দিনের এই ট্রিপগুলো মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় সারা সপ্তাহের নাগরিক ক্লান্তি।

শহরের বুকেই একটুখানি প্রশান্তি

যাঁদের শহরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ মেলে না, তাঁরা বেছে নেন শহরের ভেতরের নান্দনিক কোনো ক্যাফে বা রেস্তোরাঁ। ছুটির দিনে ধানমন্ডি, বনানী বা গুলশানের রুফটপ ক্যাফেগুলোয় এখন তিলধারণের ঠাঁই থাকে না। ভালো খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি সুন্দর একটি পরিবেশে সময় কাটানো, আর সুন্দর স্মৃতিগুলো ক্যামেরাবন্দী করা—এসবই এখন ডে–আউট কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ডে–আউট কেবলই বিনোদন নয়; বরং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। একটানা কাজের চাপে মানুষের মধ্যে যে ‘বার্নআউট’ বা চরম অবসাদ তৈরি হয়, তা কাটাতে এক দিনের এই ছুটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে। প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে একান্ত কিছু সময় কাটানো মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে নতুন সপ্তাহে কাজে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও উদ্দীপনা পাওয়া যায়।

জীবনের ইঁদুরদৌড়ে টিকে থাকতে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া অপরিহার্য। ডে–আউট কালচার এখন আর কোনো বিলাসী শখ নয়; বরং যান্ত্রিক শহরে মানসিকভাবে সুস্থ ও সতেজ থাকার এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। তাই প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই এই ‘রিফ্রেশমেন্ট বাটন’–এ চাপ দেওয়া এখন সময়েরই দাবি।

Read full story at source