আর্সেনিকে আক্রান্তদের রক্ষায় যুগান্তকারী আবিষ্কার
· Prothom Alo

প্রকৃতির এক নীরব ও অদৃশ্য ঘাতকের নাম আর্সেনিক। মাটির গভীর থেকে উঠে আসা নলকূপের পানির মাধ্যমে এই বিষাক্ত উপাদানটি মানবদেহে প্রবেশ করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে ২০ কোটির বেশি মানুষ বর্তমানে আর্সেনিকযুক্ত দূষিত পানি পানের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের ফলে ক্যানসার এবং হৃদ্রোগের মতো মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ হতে পারে। তবে মানবদেহে আর্সেনিকের এই বিষক্রিয়া কতটুকু ক্ষতি করছে, তা বোঝার মতো এত দিন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক উপায় ছিল না। এবার সেই দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার এক অভাবনীয় সমাধান খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। মানুষের রক্তের ডিএনএর ভেতরে আর্সেনিকের রাসায়নিক পরিবর্তনের ছাপ শনাক্তের মাধ্যমে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি নির্ণয়ের এক নতুন বৈজ্ঞানিক পথ উন্মোচন করেছেন তাঁরা। এর ফলে বাংলাদেশের আর্সেনিকে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষকে ক্যানসার বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এপিডেমিওলজিতে এই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই যুগান্তকারী পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশের ১ হাজার ১০০ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলাদেশে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের দূষণ একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত মারাত্মক জনস্বাস্থ্যসংকট। বিজ্ঞানীরা উন্নত ডিএনএ মেথিলেশন অ্যারে প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের রক্তের ডিএনএর সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের প্রস্রাবে থাকা আর্সেনিকের মাত্রার গভীর সংযোগ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।
Visit grenadier.co.za for more information.
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জেমস লি বলেন, ‘এটি আমাদের গবেষণার পরিধির ক্ষেত্রে একটি বিশাল বিষয়। আমাদের সংগৃহীত নমুনার বড় আকার এবং উচ্চমাত্রার বিষক্রিয়া থাকায় আমরা মানুষের এপিজেনোমে আর্সেনিক এক্সপোজার বা বিষক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এমন অনেক নতুন স্থান শনাক্ত করতে পেরেছি, যা প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে করা আগের কোনো গবেষণায় কখনো সম্ভব হয়নি।’
বিজ্ঞানীরা মানব জিনোমের ভেতরে ১ হাজার ১৭৭টি সুনির্দিষ্ট স্থান খুঁজে পেয়েছেন, যা সরাসরি আর্সেনিক বিষক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এর মধ্যে সিংহভাগ স্থানই একদম নতুন। আর্সেনিকই যে মানুষের ডিএনএর পরিবর্তনের মূল কারণ, তা নিশ্চিত করার জন্য বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন নামের একটি বিশেষ পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন। কোনো বিষাক্ত উপাদানের প্রভাব সরাসরি মানুষের ওপর পরীক্ষা করা নৈতিকভাবে অসম্ভব হওয়ায় এই পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিটি বিজ্ঞানীদের নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথ সায়েন্সেসের বিজ্ঞানী ব্র্যান্ডন পিয়ার্স বলেন, ‘মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন আমাদের অন্য সব বাহ্যিক চলক বা ভুল সম্ভাবনাকে বাতিল করতে সাহায্য করেছে। এর ফলে আমরা এখন শুধু এটাই বলছি না যে আর্সেনিক এবং ডিএনএ মেথিলেশনের মধ্যে সম্পর্ক আছে। একজন মানুষের শরীর যেভাবে আর্সেনিক মেটাবোলাইজ বা হজম করে, ঠিক সেই কারণেই তার ডিএনএ মেথিলেশনে এই ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলো ঘটে থাকে।
বিজ্ঞানীরা তাঁদের এই বিশাল আবিষ্কারকে আরও সহজ করে তুলতে একটি বিশেষ এপিজেনেটিক বায়োমার্কার তৈরি করেছেন। এখন শুধু একফোঁটা রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেই একজন মানুষের শরীরে আর্সেনিকের উপস্থিতি, তার ত্বকে হওয়া আর্সেনিকের ক্ষত এবং তাঁর সামগ্রিক মৃত্যুর ঝুঁকি কতটুকু, তা নিখুঁতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব।
বায়োমার্কারের স্থায়িত্ব নিয়ে জেমস লি বলেন, ‘দূষিত পানি পানের পর আর্সেনিক খুব অল্প সময়ের জন্য মানুষের শরীরে অবস্থান করে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। তাই ইউরিন টেস্টে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতিনিয়ত ওঠানামা করতে পারে। কিন্তু আর্সেনিক মানুষের ডিএনএ মেথিলেশনে যে পরিবর্তন ঘটায়, তা অত্যন্ত স্থায়ী। এই ডিএনএ বায়োমার্কারটি তৈরি করার ফলে আমরা একজন মানুষের শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে আর্সেনিকের জৈবিক প্রভাব বা ক্ষতির সম্পূর্ণ ইতিহাস সফলভাবে ধরতে পারছি।’
চমকপ্রদ তথ্য হলো, বাংলাদেশের মানুষের রক্ত থেকে তৈরি এই বিশেষ বায়োমার্কারটি যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর পরীক্ষা করা হয়, সেখানেও এটি সফলভাবে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও এই পরীক্ষা নিখুঁতভাবে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পেরেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এ পর্যন্ত অ্যালকোহল বা সিসা বিষক্রিয়া মাপার জন্য যত মেথিলেশন মার্কার তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে আর্সেনিকের এই নতুন মার্কারটিই সবচেয়ে সেরা এবং নিখুঁতভাবে কাজ করেছে। আর্সেনিকের কারণে ডিএনএর যে স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঠিক সেই স্থানগুলোই মূলত হৃদ্রোগ, টাইপ–২ ডায়াবেটিস এবং বিভিন্ন ক্যানসারের সঙ্গে জড়িত। ব্র্যান্ডন পিয়ার্স বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য একটি বড় এবং জরুরি তথ্য। পরিবেশের বিষাক্ত উপাদানগুলো সত্যিই আমাদের শরীরের একদম গভীরে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিনোম বা ডিএনএ কীভাবে কাজ করবে, তার ওপর নিজের এক স্থায়ী ক্ষতিকর ছাপ রেখে যায়।’
সূত্র: ফিজিস ডট অর্গ