মাতৃত্বের বেদনা, না বলেও কত কিছু বুঝিয়ে দিল কুকুরটি

· Prothom Alo

শীতের দুপুর। কয়েক দিনের টানা মেঘ আর কুয়াশার পর সেদিন যেন সূর্যও একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার রেললাইনের ধারে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। কেউ রোদ পোহাতে এসেছে, কেউ হাঁটছে ধীরে ধীরে, কেউ দাঁড়িয়ে গল্পে মেতে উঠেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ভাপ ওঠা চায়ের গন্ধ। মাঝেমধ্যে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে, কাঁপিয়ে দিচ্ছে চারপাশের মাটি। রেললাইন যেন জীবনের এক ব্যস্ত নদী, যার স্রোত থামে না কখনো।

Visit newsbetting.cv for more information.

সেই কোলাহলের মধ্যেই একটু দূরে জমে ছিল অন্য এক নীরবতা। এমন নীরবতা, যা শব্দের থেকেও বেশি ভারী।

রেললাইনের পাশে পড়ে আছে একটি কুকুরছানার নিথর দেহ। ছোট্ট শরীরটা ট্রেনের চাকায় অনেক আগেই দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। রক্ত শুকিয়ে গাঢ় বাদামি হয়ে আছে পাথরের গায়ে। চারপাশে মানুষের ভিড়, ট্রেনের শব্দ, জীবনের ব্যস্ততা। অথচ সেই ছোট্ট প্রাণটার মৃত্যুর জন্য পৃথিবী একমুহূর্তও থামেনি। শুধু থেমে গিয়েছিল একটি মা।

কুকুরছানাটির পাশে বসে তার মা। চারপেয়ে, বাকরুদ্ধ, অথচ সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় জীব। সে চিৎকার করছিল না, আর্তনাদও করছিল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল সন্তানের নিথর শরীরের দিকে। সেই চোখে ছিল না পশুর দৃষ্টি, ছিল এক মায়ের শূন্যতা। যেন সে এখনো বুঝতে চেষ্টা করছে, কেন তার সন্তান আর নড়ছে না।

চারপাশের মানুষ ধীরে ধীরে খেয়াল করতে শুরু করল দৃশ্যটি। কেউ থমকে দাঁড়াল। কেউ মোবাইল বের করল। কেউ হয়তো একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে চলে গেল। মানুষের পৃথিবীতে মৃত্যু খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু মাতৃত্বের বেদনা কখনো সাধারণ হয় না।

হঠাৎ মা কুকুরটি উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে রেললাইনের পাশের বালু পা দিয়ে খুঁড়তে লাগল সে। ছোট ছোট আঁচড়ে বালু সরিয়ে আবার সন্তানের শরীরের ওপর ফেলতে লাগল। একবার, দুবার, বারবার। যেন সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সন্তানের ক্ষতবিক্ষত শরীরটা ঢেকে দিতে চাইছে। তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। ছিল এক অদ্ভুত মমতা। যেন সে বিশ্বাস করে, এভাবে ঢেকে দিলে তার সন্তান আর ঠান্ডা পাবে না।
বালু শেষ হয়ে গেলে সে আশপাশে ছড়িয়ে থাকা শুকনা খড়কুটো মুখে করে এনে নিথর শরীরটার ওপর বিছিয়ে দিল। খুব যত্নে। যেন কোনো মা শীতের রাতে সন্তানের গায়ে কম্বল তুলে দিচ্ছে।

প্রবাসের একাকিত্ব ও মায়ের শূন্যতা

সেই দৃশ্য দেখে কয়েকজন মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। কিন্তু সত্যি বলতে, সেদিন সেখানে পশু কে ছিল আর মানুষই–বা কে ছিল, সেই প্রশ্নই মনে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

মানুষ প্রতিদিন কত সম্পর্ক ভুলে যায়। কত সন্তান বৃদ্ধ মাকে ফেলে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। কত মা সন্তানের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থেকে একদিন নিঃশব্দে হারিয়ে যান। আর সেখানে একটি বাকরুদ্ধ প্রাণী, যার ভাষা নেই, সমাজ নেই, সভ্যতার অহংকার নেই, সে তার মৃত সন্তানকে শেষ আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

ট্রেন আবার এল। বিকট শব্দ তুলে ছুটে গেল সামনে। মানুষ আবার হাঁটতে শুরু করল। রেললাইন আবার ব্যস্ত হয়ে উঠল আগের মতো। পৃথিবী তার নিয়মেই চলতে থাকল।
কিন্তু মা কুকুরটি তখনো বসে ছিল সেই জায়গাতেই। মাথা নিচু করে। নিথর সন্তানের পাশে। যেন সে পাহারা দিচ্ছে তার শেষ ঘুমকে।

সৈয়দপুর, নীলফামারী

Read full story at source