খবরে না থাকায় ফিফার প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা!

· Prothom Alo

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য এমন একটা ফুটবল বিশ্বকাপ প্রতিবছর হওয়া উচিত। না হলে আমাদের ক্রিকেটারদের বড় কষ্ট।
কারণ, তাঁরা যখনই হারেন, তখনই পুরো জাতি তাঁদের নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে। কে বাদ যাবে, কে অবসর নেবে, কার ব্যাট দিয়ে জ্বালানি বানানো যায়—এসব নিয়ে টক শো বসে যায়। কিন্তু এবার দেখুন কী সৌভাগ্য! ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। মানুষ এখন গোল, অফসাইড, ভিএআর, টাইব্রেকার আর মেসি-রোনালদো-পরবর্তী পৃথিবী নিয়ে এত ব্যস্ত যে বাংলাদেশের হারটা যেন পাশের বাসার প্রেশার কুকারের শব্দের মতো—শোনা যায়, কিন্তু গুরুত্ব পায় না।

জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে লজ্জাজনকভাবে হেরেছে। এরপর প্রথম ওয়ানডেতেও লড়াই পর্যন্ত করতে পারেনি। ফলে আরও একটি শোচনীয় পরাজয়।
কিন্তু বাংলাদেশি দর্শকেরা ব্যস্ত—আজ আর্জেন্টিনা খেলবে, কাল ব্রাজিল, পরশু স্পেন। বাংলাদেশের স্কোর জানার চেয়ে মানুষ এখন বেশি আগ্রহী, ‘আজ রাতে কারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে?’
বাংলাদেশি ক্রিকেটাররাও হয়তো মনে মনে বলছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে শান্তিতে হারতে পারছি!’

Visit playerbros.org for more information.

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নতুন কৌশল হওয়া উচিত—যখনই দলের অবস্থা খারাপ থাকবে, তখনই বিশ্বকাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা কিংবা অলিম্পিকের সময় সিরিজের আয়োজন করা।

আগে কী হতো?
বাংলাদেশ হারলেই ফেসবুকে পাঁচ লাখ পোস্ট। ইউটিউবে দশ হাজার বিশ্লেষণ। ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট শেষ’, ‘বোর্ড ভেঙে দাও’, ‘এবার সবাইকে বদলাও’—এসব শিরোনামে ইন্টারনেট ভরে যেত।
এখন?
বাংলাদেশ হারার খবরের নিচে মাত্র কয়েকটা রিঅ্যাক্ট। তার মধ্যে একটা দিয়েছে স্কোরকার্ড আপলোড করা পেজের অ্যাডমিন।
আরেকটা দিয়েছে ভুল করে।
তৃতীয়জন কমেন্ট করেছে, ‘ভাই, আজ আর্জেন্টিনার ম্যাচ কয়টায়?’

এই প্রথম বুঝলাম, মানুষের অবহেলাও কখনো কখনো আশীর্বাদ হতে পারে।
ক্যাপ্টেন মেহেদী হাসান মিরাজের অবস্থাও বড় করুণ। দল হারছে, নিজের ব্যাটও হাসছে না। অন্য সময় হলে তাঁর প্রতিটি শট নিয়ে বিশ্লেষণ চলত। এখন কেউ সময়ই পাচ্ছে না।
একজন ক্রিকেটপ্রেমীকে জিজ্ঞেস করলাম—বাংলাদেশ কত রানে হারল?
তিনি বললেন—জানি না ভাই। কিন্তু বলুন তো, আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ কী?
আরেকজনকে বললাম—মিরাজের পারফরম্যান্স খুব খারাপ।
তিনি উত্তর দিলেন—হুম, কিন্তু আপনি কি মনে করেন আর্জেন্টিনা থ্রি-ব্যাক খেলবে?
বিষয় পাল্টানোর এমন ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থাকে না। বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে একধরনের অতিপ্রাকৃত শক্তি এনে দেয়।

অবশ্য একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে। বাংলাদেশের পুরো বোলিং আক্রমণের মধ্যে নাহিদ রানা একাই যেন ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন। প্রথম ওয়ানডেতে ২১ রানে ৬ উইকেট!
এমন বোলিং করলে সাধারণত জাতি অন্তত এক সপ্তাহ ধরে স্ট্যাটাস দেয়।
কিন্তু এবার?
লোকজন ভাবছে, ভালোই তো! আচ্ছা, আজ বেলজিয়ামের ম্যাচ কখন?
নাহিদ রানা হয়তো বাড়ি গিয়ে পরিবারকে বলছেন—আমি ৬ উইকেট পেয়েছি।
পরিবারের উত্তর—ভালো কথা। কিন্তু আজকের বিশ্বকাপ ম্যাচটা কয়টায় শুরু?
এমনকি প্রতিবেশীরাও আর মিষ্টি চাইতে আসে না। কারণ, তাদের হাতে তখন বিশ্বকাপের ফিক্সচার।

ফেসবুকের অবস্থাও দেখার মতো।
আগে বাংলাদেশের হার মানেই মিমের বন্যা।
এখন সব মিমের ক্যাপশন—
‘মেসি আবারও টাকা দিয়ে পেনাল্টি কিনল!’
‘ফিফা একা আর কত করবে!’
‘ফিফা আবারও আর্জেন্টিনাকে জেতাতে সব রকম চেষ্টা করছে!’
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেন ফেসবুক অ্যালগরিদমের কাছেও গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
আমি তো সন্দেহ করছি, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে বসে নিজেদের খেলার হাইলাইটস না দেখে বিশ্বকাপের ম্যাচই দেখছেন।
কোচ হয়তো বলছেন—আজকের ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করি।
একজন ক্রিকেটার হাত তুলে বলছে—স্যার, ৫ মিনিট পরে করি? এখন টাইব্রেকার শুরু হবে।

এমনকি সংবাদমাধ্যমেরও কষ্ট হচ্ছে।
শিরোনাম দিতে চায়, ‘বাংলাদেশের হতাশাজনক হার’।
কিন্তু সেই খবর প্রকাশ করার আগেই সম্পাদক বলছেন—না না, আগে বিশ্বকাপের আপডেট দাও। বাংলাদেশের খবর পরে দিলেও চলবে।
এ যেন সেই ছাত্রের মতো, যে পরীক্ষায় ফেল করেছে; কিন্তু সেদিনই স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকায় কেউ তার রেজাল্ট নিয়ে কথা বলছে না।

তবে একটা দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। বিশ্বকাপ না থাকলে এই হার নিয়ে জাতীয় শোক পালন হতো।
এখন হারলেও মানুষ বলছে, ‘আচ্ছা, পরে দেখি। আগে ফুটবলটা দেখি।’
শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নতুন কৌশল হওয়া উচিত—যখনই দলের অবস্থা খারাপ থাকবে, তখনই বিশ্বকাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা কিংবা অলিম্পিকের সময় সিরিজের আয়োজন করা। তাহলে অন্তত ট্রল বা সমালোচনা থেকে রেহাই মিলবে। কারণ, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে কার্যকর ‘ডিফেন্স’ হলো ভালো ব্যাটিং বা বোলিং নয়—ফুটবল বিশ্বকাপ!

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা

Read full story at source