বিশ্বকাপে নিখুঁত এক ঝড়ে আনন্দের রং লাল

· Prothom Alo

মার্ক কুকুরেয়াকে এখন তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে একটি ওয়াদা করেছিলেন এই স্প্যানিশ লেফটব্যাক। স্পেন বিশ্বকাপ জিতলে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের মুখের ছবির ট্যাটু করাবেন নিজের শরীরে। স্পেন তো বিশ্বকাপ জিতল। কুকুরেয়াকে এখন কী করতে হবে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কোচই, ‘উল্কি বা ট্যাটু আঁকার জন্য আমার বয়স একটু বেশিই হয়ে গেছে। তবে আমার শিষ্যরা এককথার মানুষ। আমি জানি, তারা কথা রাখবে।’

Visit mwafrika.life for more information.

দে লা ফুয়েন্তের বয়স ৬৫ বছর। তেল চকচকে টাক ও নাকের ওপর চশমাটা দেখে মনে হয়, বেশ রাশভারী মানুষ। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে স্পেনকে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতানোর পর বেরিয়ে এল দে লা ফুয়েন্তের ভেতরের রসিক–সত্তা। কুকুরেয়ার শরীরের কোন অংশে নিজের মুখের ট্যাটুটা দেখতে চান—সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হলে মিস্টি করে হেসে স্পেন কোচ বলেন, ‘হয়তো শরীরের এমন কোনো জায়গায়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। ওয়াদা করলে সেটা তো রাখতেই হবে।’

কুকুরেয়াকে এখন কোচের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে

কে জানে, বিশ্বকাপ ফাইনাল সামনে রেখে কুকুয়েরার মতো কত স্প্যানিশ এমন প্রতিশ্রুতির বাঁধনে নিজেকে আটকেছেন। এখন অবশ্য খুশি মনেই সেসব ওয়াদা রাখার কথা। সেই খুশির রং কী হতে পারে—লাল? স্পেনের জার্সির রং যে এখন তাদের দেশের মানুষের উৎসবের রংও। মাদ্রিদের প্লাজা দে সিবেলিসে জনতার উল্লাসমুখর উদ্‌যাপনে যে রাস্তায় ছড়িয়েছিল মুঠো মুঠো লাল আবির।

এই স্পেন না জিতলে অবিচার হতো

সেই আবিরমাখা স্প্যানিশদের চোখ দুটো নিশ্চয়ই স্ক্রিনে রদ্রিকে বারবার খুঁজে ফিরেছে। চোটের ‘নরক’ দেখে আসা এ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার যে স্প্যানিশ আর্মাডার সাত রাজার ধন ফিরিয়ে আনার প্রাণভোমরা। ২০২৪ সালে ইউরো জয়ের পর সে বছর ডিসেম্বরে এসিএল চোটে রদ্রির ক্যারিয়ারই শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপে জিতলেন গোল্ডেন বল। বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ব্যালন ডি’অর—চারটি বড় ট্রফির পদকই আছে রদ্রির শোকেসে। শুধু ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার ও জিনেদিন জিদান অতীতে এমন সাফল্য পেয়েছেন।

রদ্রি তাতে সর্বশেষ সংযোজন হওয়ার পর যা বলেছেন, সেটা কঠিন সময়ে উঠতি ফুটবলারদের লড়াইয়ের রেফারেন্স পয়েন্ট, ‘সবকিছু যেন একদম নিখুঁত চিত্রনাট্য! এমন কিছুর আশা করিনি আমি। আমি চাই তরুণ প্রজন্ম দেখুক, কেউ স্বর্গের উচ্চতা স্পর্শ করার পর নরকের অতলে তলিয়ে গিয়েও কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রতিকূলতা জয় করে ঘুরে দাঁড়ানোর অনন্য শিক্ষাও এটি।’

গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি

শিক্ষা রয়েছে পৃথিবীর বাকি দলগুলোর জন্যও। নারী ও পুরুষ সব পর্যায়ের ফুটবল মিলিয়ে সর্বশেষ ৫ বছরে ১৬টি ট্রফি জিতেছে স্পেন। অর্থাৎ, সময়টা আগে থেকেই ছিল স্পেনের, বিশ্বকাপ জিতে বর্তমানও তাদের এবং তরুণ খেলোয়াড়দের দিকে তাকিয়ে বলা যায় নিকটবর্তী ভবিষ্যতও স্পেনের। দেশটির ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগের চোখে এ আধিপত্য আসলে ‘নিখুঁত এক ঝড়...আরেকটি এভারেস্ট। ছেলেদের দল ইউরো জয়ের দুই বছর পর জিতেছিল বিশ্বকাপ। সেটাই আবারও করলাম আমরা।’

ফেরান তোরেস জয়সূচক গোলটি না করলে বালাগের এই ‘পারফেক্ট স্টর্মে’র ঝাপটা নিউ জার্সির ফাইনালে শেষ পর্যন্ত লাগত কি না, কে জানে! অথচ বিশ্বকাপে ফেরান গোল না পাওয়ায় তাঁকে নিয়ে কত সমালোচনাই না হয়েছে। ফেরান কী বলছেন শুনুন, ‘ভাগ্যে লেখা ছিল। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তিনি সব সময় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দেন।’

‘নীরব ঘাতক’ রদ্রি যেভাবে বিশ্বকাপ–সেরা

ফেরান সেই শক্তির বলে স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসে নাম লেখানোর পর দে লা ফুয়েন্তের মূল্যায়ন, ‘ফেরানকে নিয়ে শুধু এটুকু বলব, জীবন সত্যিই সুবিচার করে। যারা পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ায়, তারা প্রতিদান পাবেই। এই সাফল্য সে নিজ যোগ্যতায় অর্জন করেছে এবং এটা পাওয়ার অধিকার শুধুই তার।’

ভালো আক্রমণভাগ নাকি ম্যাচ জেতায়। আর ভালো রক্ষণভাগ জেতায় ট্রফি। স্পেনকে দেখেও ঠিক তাই মনে হয়। এই বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচ খেলে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে। বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের এটাই সবচেয়ে কম গোল হজমের রেকর্ড। পাউ কুবারসির মতো কুকুরেয়াও সেই রক্ষণভাগের প্রাণ। রক্ষণের দায়িত্ব পালন নিয়ে কুকুরেয়া বলেন, ‘গোল হজম না করলে ম্যাচ জেতা অনেক সহজ হয়ে যায়। পুরো টুর্নামেন্টেই আমরা রক্ষণে দারুণ কাজ করেছি। তবে এর কৃতিত্ব শুধু ডিফেন্ডার বা গোলরক্ষকের নয়, এটি ছিল পুরো দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।’

স্পেনের ট্রফি নিয়ে উদ্‌যাপন

কুকুরেয়ার শেষ কথাটাই সবচেয়ে বড় সত্যি। স্পেন সত্যিই দল হিসেবে খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যেমনটা হয়েছিল ১৬ বছর আগেও। পাসের খেলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তো দল হিসেবেই খেলতে হয়। তাই স্পেন যে সবচেয়ে বেশি পাস (৫,৪৭০) খেলে এবার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলো, সেটাই আসলে স্বাভাবিক। এখন সময় তাই সামনে তাকানোর। সে বিষয়েই ড্রেসিংরুমের একটি ঘটনা সংবাদ সম্মেলনে জানালেন দে লা ফুয়েন্তে, ‘ম্যাচ শেষে কিছু খেলোয়াড় আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “আমাদের কি এখনো সব জেতা বাকি?” বলেছি, সেপ্টেম্বরের পরবর্তী ম্যাচটা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।’

ছবিতে ছবিতে দেখুন বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরু থেকে শেষ

Read full story at source