লজিস্টিকস খাতে বিদেশি কোম্পানিকে আরও সুযোগ দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ

· Prothom Alo

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের মতো লজিস্টিক খাতে বিদেশি যৌথ মালিকানার কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের মুনাফা দেশ থেকে নিয়ে যাবে ওই বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এই খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ নষ্ট হবে তরুণদের। শুধু তা-ই নয়, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসার পুরোটা বিদেশিদের হাতে চলে গেলে দেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানি যেকোনো সময় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ কথা বলেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে আজ বুধবার এই গোলটেবিলের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর)। এতে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার।

Visit moryak.biz for more information.

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি)। বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সংসদ সদস্য (নওগাঁ-৩) ফজল হুদা, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরিফুল আহসান প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধে কী আছে
মূল প্রবন্ধে সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালা সংশোধন করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বর্তমানে যৌথ মালিকানায় বিদেশি কোম্পানির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ৪০ শতাংশ। বিধিমালা সংশোধনের খসড়ায় বিদেশি কোম্পানির ৬০: ৪০ ইকুইটি কাঠামো শিথিল করে ৫১: ৪৯ করার প্রস্তাব রয়েছে। এমনকি শতভাগ বা ৪০ শতাংশের অধিক বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের পথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগও বিবেচনাধীন বলে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ২০১৫ সালে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে শতভাগ বিদেশি মালিকানা করেছিল সরকার। সে সময় যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪৯ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নামানো হয়।

সাকিব আনোয়ার বলেন, ইতিমধ্যে শিপিং এজেন্ট ও কাস্টমস এজেন্ট বিধিমালায় ৬০: ৪০ থেকে ৫১: ৪৯ অনুপাতে প্রণয়ন করা হয়েছে। আইসিডি ও অফ-ডকে ৪৯ শতাংশ মালিকানার সুযোগ পেয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এখন লজিস্টিকস খাতে যে মান স্থির হবে তা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সেবা খাতেও অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ড কোম্পানি বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার কোনো জাহাজ বা বিমানের মালিক নন; বরং পণ্য প্রেরক ও বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে সেতুবন্ধ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি স্বল্প সম্পদভিত্তিক সেবাশিল্প। এখান থেকে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো সুফল পায় না দেশ—এমন তথ্য উল্লেখ করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, এই ব্যবসায় প্রবেশে প্রকৃত খরচ কার্যত শূন্য। শাখা কার্যালয়ের ক্ষেত্রে বিডার অনুমোদনের পর দুই মাসের মধ্যে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আকারে আনতে হবে। এটিই একমাত্র মূলধনি শর্ত। এটি বিনিয়োগ নয়, অফিস পরিচালনার ব্যয়।

সাকিব আনোয়ার আরও বলেন, এজেন্সি ব্যবসায় দেশীয় মালিকানা বাধ্যতামূলক করার নজির বাংলাদেশে নতুন নয়। যেখানে এটা করা হয়েছে সেখানেই সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বেড়েছে। সেই তুলনায় ৬০ শতাংশের দাবি অত্যন্ত মধ্যপন্থী, এটি বিদেশি অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে না, কেবল নিয়ন্ত্রণ দেশীয় হাতে রাখে।

ফ্রেইড ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, সিঅ্যান্ডএফ এবং কুরিয়ার এক্সপ্রেস—এই চার উপখাতে অভিন্ন ৬০: ৪০ ইকুইটি কাঠামো, শেয়ার, লভ্যাংশ অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকার তিন স্তরেই দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ ছয়টি প্রস্তাব করেন সাকিব আনোয়ার। বাকি পাঁচ প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিদেশি অংশীদারত্বযুক্ত লাইসেন্সধারীর জন্য ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবরুদ্ধ হিসাবে সংরক্ষণ এবং তার ৪০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে গুদাম, সরঞ্জাম ও পরিবহনে বিনিয়োগ করা।

লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের একাংশ। আজ বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে।

বক্তারা কী বলেন
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় কোনো বিনিয়োগ না করেই মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে। তবু দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৬০ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে, এটা সারপ্রাইজিং। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সচেতনতা নেই, সেটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা দরকার।’

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সভাপতি মো. আরিফুল আহসান বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে ১ হাজার ২৫০ সদস্যের মধ্যে ১৩টি বিদেশি মালিকানা ও ৩০-৩৫টি যৌথ মালিকানার রয়েছে। তারাই ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ২০ শতাংশ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান। অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই। ব্যবসায় যা মুনাফা হয়, তা তারা বিদেশে নিয়ে যায়। এখানে কোনো বিদেশি বিনিয়োগের কিছু নেই। তারপরও কেন বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দিতে আগ্রহ, আমাদের বোধগম্য নয়।’

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএইএবি) সভাপতি কবির হোসেন বলেন, দেশে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার। তবে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে দরকার বিদেশি বিনিয়োগ নেই। তার কারণ একই অফিস, লোক ও জ্ঞান নিয়ে কার্যকর পরিচালনা করে বিদেশি কোম্পানি। এত দিন দেশীয় এজেন্টরা কাজটি করত, এখন করছে বিদেশি কোম্পানি। পার্থক্য কিছু নেই।

আরআইএফ লাইনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের লাইসেন্স হস্তান্তর করা যায় না। অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না। সে জন্য নতুন প্রজন্ম এই ব্যবসায় আসছে না। এতে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আশির দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা পণ্য রপ্তানি করতে অনেকে মিলে জাহাজ ভাড়া করতেন। তারপর দেশীয় উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন। এই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সুরক্ষা দিতে হবে।

লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তাদের একাংশ। আজ বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে।

আইনজীবী এম সাকিবুজ্জামান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেই স্থানীয় এজেন্টরা দৌড়ের ওপর থাকেন। ব্যবসা ও রাজনীতি এক হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন জাহাজে থাকা পণ্য কে হ্যান্ডেল করবে, তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান দুশ্চিন্তায় থাকেন। এ জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আকিল বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ নাকি বাণিজ্য কোনটা চান, সেটি বিডাকে পরিষ্কার করতে হবে। বিনিয়োগ আনতে হলে সহজ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কম টাকা লাগে। তাই এই খাত সুরক্ষিত রাখতে হবে।’

সংসদ সদস্য ফজল হুদা বলেন, ‘নওগাঁ থেকে কারওয়ান বাজারে এক ট্রাক আলু আনতে খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। নওগাঁ থেকে রেললাইন নির্মাণে বিনিয়োগ করতে চাইলে আমরা শতভাগ মালিকানার বিদেশি কোম্পানিকে স্বাগত জানাব। কিন্তু ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কেন কাগজ বেঁচে খাবেন। আমরা মনে করি, যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪০ শতাংশ থাকা উচিত। ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে দেশি কোম্পানিকে সুরক্ষা দিতে বিদেশি কোম্পানির জন্য কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে।’

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন, আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হুসাইন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন মাহমুদ অ্যান্ড সবুজ কোম্পানির অংশীদার সবুজ এইচ চৌধুরী।

Read full story at source