ইরানে দেয়া রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার
· Prothom Alo

পারস্যের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গুণীজনেরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। ১৯৩২ সালে পারস্য-ভ্রমণের সময় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ইরানি সাংসদ দশ্তি। এটি ‘পারস্যে দেয়া রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার’ শিরোনামে ১৯৯৯ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত হয় প্রথম আলোর ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে। এত দিন কাগজের পাতাজুড়ে থাকা সেই সাক্ষাৎকারটি আজ ‘অন্য আলো’ অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
Visit tr-sport.click for more information.
পারস্য ছেড়ে আমার চলে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে। বেশি দিন এখানে থাকিনি, তবু নিজেকে ভিনদেশী বলে বোধ হচ্ছে না। অবাক ব্যাপার, যদিও আপনাদের ভাষা জানি না, তবুও কোনো না কোনোভাবে আমি আপনাদের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি, অনায়াসেই যোগাযোগ করতে পারছি আপনাদের সঙ্গে এবং অনুভব করছি আপনাদের সখ্যের উষ্ণতা। আপনাদের আর আমাদের লোকজনের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। জীবনের প্রতি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি আর মেজাজমর্জি অনেকটাই একজাতীয় বলে মনে হয়।
দশ্তি: ভাষারা এক্ষেত্রে যা হোক, গৌণ; প্রধান গুরুত্বের বিষয় হচ্ছে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গড়ন, যা নিজেকে ব্যক্ত করে সরাসরি ইঙ্গিত আর অভিব্যক্তির মাধ্যমে।
বুশায়ারে থাকতে আমাকে বলেছিলেন, পারস্যে আমাদের কাছে আপনি এসেছেন প্রাচীন ভারতকে আবিষ্কারের জন্য। একদম খাঁটি কথা, আমাদের আসল চেতনাটা হচ্ছে প্রাচীন ভারতীয়; এটা এসেছে অতীত থেকে, যখন আমরা ছিলাম একই অভিন্ন কৃষ্টির অংশীদার। এমনকি এখনো ভেতরে বিরাজ করে একটি আসক্তি আর সে কারণেই আপনি আমাদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: হ্যাঁ, আমার জন্য পথটি খোলা ছিল আমার জন্মের আগে থেকেই। প্রকৃতপক্ষে, আমি যখন ছোট ছিলাম, বঙ্গদেশে আমাদের বাড়িতে ইরানি চেতনার ছিল এক প্রাণবন্ত প্রভাব। আমার পরম পূজনীয় পিতা আর বড় দাদারা গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন ফার্সি মরমী সাহিত্য ও শিল্পকলার সঙ্গে। আরো পেছনে গেলে আবিষ্কার করা যাবে যে, বাংলা ভাষা এক সময় আপনাদের শব্দভান্ডার থেকে শব্দ নিয়েছে অবাধে, যেগুলো এখন আমরা ব্যবহার করি তাদের ব্যুৎপত্তি না জেনেই। এটা যখন আপনি লক্ষ করবেন, তখন অবশ্যই জানবেন যে, আপনাদের সংস্কৃতির কিছু জিনিস বয়ে চলেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মধ্য দিয়ে। কারণ শব্দেরা হচ্ছে চিন্তা আর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের প্রতীক। এমনকি ভারতে মুসলিম শাসনের আগেও ভারত আর ইরানের মধ্যে ছিল সক্রিয় সাংস্কৃতিক বিনিময়। আমাদের ধ্রুপদী শিল্পকলায় ও সাহিত্যে খুঁজে বের করতে হবে তাদের সরাসরি চিহ্নগুলোকে।
আপনাদের জীবনযাপন আর আচার-অভ্যাস আমার কাছে মোটেও অচেনা ঠেকেনি। আপনাদের রীতিনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া ও আপনাদের চেতনাকে উপলব্ধি করা আমার পক্ষে খুব সহজ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদশ্তি: আশা করি, আপনাকে আমরা খুব বেশি বিরক্ত করছি না। আমরা সবাই চেয়েছি আপনার সঙ্গে মোলাকাত করতে, কথা বলতে আর আপনার ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে পেতে চেয়েছি অনুপ্রেরণা। আপনাকে যতোটা পাওয়া উচিত ছিল, ততোটা সম্ভব হয়নি আমাদের পক্ষে।
রবীন্দ্রনাথ: জানেন, আমি সেটাই চেয়েছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল আপনাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করার। ইচ্ছে ছিল পেশা ও সামাজিক স্তর নির্বিশেষে ব্যক্তিকে জানার। স্বীকার করি, এনগেজমেন্টের ধকল মাঝে মধ্যে শরীর-স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে বটে, তবে সেটাকে আমি কখনো কিছু মনেই করিনি। আপনাদের লোকজনের সঙ্গে মোলাকাত, তাদের সঙ্গে পারস্যের হালফিল ঘটনাবলি নিয়ে বাতচিত, যেটাতে আমার অত্যন্ত আগ্রহ, এটাই আমার জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
জনৈক ভদ্রলোক: বঙ্গদেশে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ইতিমধ্যেই পারস্য সংস্কৃতির একটি বিভাগ চালু করেছেন?
রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, কারণ আমি সব সময় অনুভব করি যে, আমাদের উভয়ের জন্যই দরকার পরস্পরকে জানা, শুধু এই জন্য নয় যে, আমরা একই বংশের, বরং এই জন্য যে, আপনাদের সাহিত্য ও শিল্পকলায় এমন কিছু আছে যা আমাদের কাছে জাগায় গভীর আবেদন। পারসিক মেজাজ হচ্ছে কাব্যিক মেজাজ, আপনারা ভালোবাসেন সঙ্গীত আর খোশগল্প। প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের মতো আপনাদেরও রয়েছে ভালোবাসা।
যদি আপনারা কট্টর ধর্মীয় ‘মোল্লা’ হতেন, আমাদের হিন্দু পুরুতদের মতো, তা হলে আমরা আপনাদের আমন্ত্রণ জানাতে সাহস করতাম না। দুর্ভাগ্যবশত ভারতবর্ষে আমাদের বড় বড় সম্প্রদায়ের মধ্যে দুটি সম্প্রদায়ে রয়েছে এই ধরনের গোঁড়া প্রতিনিধি আর এই কারণেই আমরা একত্রিত হতে পারছি না। আমি সহযোগিতা দাবি করছি আপনাদের পণ্ডিত আর শিল্পীবর্গের, যাদের প্রভাব আমাদের একত্রিত করবে সাংস্কৃতিকভাবে আর সংশোধন করবে আমাদের পার্থক্যগুলোকে, যেগুলো আদৌ কোনো মৌলিক পার্থক্যই নয়।
সাক্ষাৎকারটি ‘প্রথম আলো’র ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিলআজ এক জার্মান বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম— লিপজিগের ড. স্ট্রাটিল সৌয়ের— যিনি... ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কাজে বার্লিন থেকে এসেছেন এখানে সারাটা পথ মোটরগাড়িতে চড়ে, তিনিও আমাকে বলছিলেন ইউরোপ সম্পর্কে সেই একই কথা। সমগ্র পশ্চিমা সভ্যতা চলেছে এক কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে। পশ্চিমে জীবনযাত্রা যে ধরনের লাগামছাড়া যান্ত্রিকতায় মজে আছে, তাতে ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।
দশ্তি: পারসিক সঙ্গীত আপনার কেমন লাগে?
রবীন্দ্রনাথ: সত্যিই খুব ভালো রাগে। আপনাদের সাম্প্রতিক রীতি বা ধারাগুলোর কিছু কিছু পুরোপুরি বুঝি না। আমার কাছে মনে হয়েছে, আপনাদের দেশজ সঙ্গীত ঘরানার মধ্যে ওগুলো পুরোপুরি আত্তীকৃত হয়নি। ওগুলো ইউরোপকে মনে করিয়ে দেয় বেশি করে। যা হোক, আপনাদের ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো ওগুলো আমাকে অতোটা নাড়া দেয় না।
দশ্তি: আমাদেরও ওই একই মত। ঐকতানের প্রবর্তন এতোই সাম্প্রতিক যে, তা আমাদের সঙ্গীতকে সার্থকভাবে সমৃদ্ধ করতে পারেনি। তবে এ রকম হতে পারে, আমরা হয়তো ধীরে ধীরে বিকশিত করে তুলবো এমন এক সঙ্গীতকে যা এসব নবরীতি নবধারার সুবাদে হয়ে উঠবে খুব সুন্দর।
রবীন্দ্রনাথ: অবশ্যই তা হবে। বাইরের প্রভাব আত্তীকরণের, আর সেই সঙ্গে আপনাদের নিজস্ব অনন্য যে সংস্কৃতি তার অভিব্যক্তি নিয়ে আরো পরিপূর্ণরূপে ব্যক্ত হওয়ার এক বিস্ময়কর সহজাত ক্ষমতা আগাগোড়াই রয়েছে আপনাদের মধ্যে। সঙ্গীতেও আপনারা নিশ্চয়ই লাভবান হবেন ইউরোপীয় প্রভাবের দ্বারা। সব সময়ের তরে আমার এক দুঃখবোধ রয়েছে এ জন্য যে, আমাদের নিজস্ব সঙ্গীতের ওপর ইউরোপীয় সঙ্গীতের কোনো সরাসরি প্রভাব নেই; এ জন্য যে, মহৎ ইউরোপীয় সঙ্গীতস্রষ্টারা যেমন বিটোফেন, এঁরা কোনোই প্রভাব ফেলেননি প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোর ওপর। যেমন ফেলেছিলেন ইউরোপের মহৎ কবিরা, মহৎ দার্শনিকেরা; কিংবা এঁরা প্রভাব ফেললেও খুবই সামান্য। কারণ, ইউরোপীয় সঙ্গীত প্রশ্নাতীতভাবে মহৎ এবং নিঃসন্দেহে আমাদের সঙ্গীত হয়ে উঠবে আরো অনেক সমৃদ্ধ, যদি তা তার নিজের প্রাণবন্ত বুনটের ভেতর শুষে নিতে পারে ইউরোপীয় সঙ্গীতের সৃজনশীল প্রভাবগুলোকে।
দশ্তি: আমি তাঁদের একজন যাঁরা বিশ্বাস করেন, পারস্যের উচিত মার্কিনি সংস্কৃতিকে শতকরা ১০০ ভাগ আত্তীকরণ করা। বিদেশি প্রভাবের ভয়ে আমি শঙ্কিত নই। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, আমাদের স্বভাবকে আমাদের মর্জিকে কোনো কিছুই পারবে না আমূল বদলে দিতে। অতএব আমরা নিরাপদে নেমে পড়তে পারি মার্কিনায়নে। তখন আমরা পদ্ধতিগতভাবে হবো আমেরিকান, কিন্তু কৃষ্টিগতভাবে থাকবো আগাগোড়া পারসিক। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা এই একই নীতি অনুসরণ করেন শান্তিনিকেতনে।
রবীন্দ্রনাথ: সময় এসেছে মানবসভ্যতা সম্পর্কে আমাদের গভীরভাবে ভাববার। আপনি নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন ইউরোপীয় সভ্যতার ওপর লেখা স্পেংলারের বই। বইটি আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার নিয়তি সম্পর্কে উত্থাপন করেছেন নানা অনুসন্ধানী প্রশ্ন, আর ইতিহাস থেকে আমাদেরকে দিয়েছে এক বিপজ্জনক সদৃশ্য ও সমান্তরালতা।
আপনি যখন শতকরা ১০০ ভাগ মার্কিনায়নের কথা বলছেন তখন এ কথাও অবশ্যই মনে রাখবেন যে, খোদ আমেরিকা আজ এক আসন্ন সঙ্কটের মুখোমুখি এবং এখন পর্যন্ত সে অর্জন করেনি সে রকম কোনো স্থিতিশীলতা যা প্রমাণ দেবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কলকব্জার অটুটত্বের।
আজ এক জার্মান বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম— লিপজিগের ড. স্ট্রাটিল সৌয়ের— যিনি... ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কাজে বার্লিন থেকে এসেছেন এখানে সারাটা পথ মোটরগাড়িতে চড়ে, তিনিও আমাকে বলছিলেন ইউরোপ সম্পর্কে সেই একই কথা। সমগ্র পশ্চিমা সভ্যতা চলেছে এক কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে। পশ্চিমে জীবনযাত্রা যে ধরনের লাগামছাড়া যান্ত্রিকতায় মজে আছে, তাতে ইতিমধ্যেই দেখা দিচ্ছে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া।
তাড়াহুড়ো করে পশ্চিমা জীবনের অনুকরণে যাওয়ার আগে, প্রাচ্যে আমরা অবশ্যই বিষয়টা ভেবে দেখব ঐকান্তিকভাবে। ইউরোপীয় জীবনযাত্রার ভিত্তিমূলেই কোথাও যেন রয়েছে এক গভীর সমন্বয়হীনতা। চারদিকে আছে বস্তুগত সমৃদ্ধি, কিন্তু উধাও হয়েছে সুখ। আর কিভাবেই বা হতে পারতো অন্য রকম? আধুনিকতার উপরি প্রলেপ ভেদ করে যান, দেখবেন প্রায় আদিম এক বর্বরতা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। নানান জৈবিক চাহিদা যেমন, জাঁকালো পোশাক-আশাক, দামি গাড়ি, অঢেল খানাদানা, অঢেল আবাসন, অর্থাৎ বলতে গেলে যেগুলো আমাদের জৈব অস্তিত্বের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটায়, সেসব সামগ্রীর জন্য এক বিরামহীন চিন্তা ভাবনা, এক বিরামহীন খাই খাই ভাব— জনসাধারণের কাছে এ-ই হচ্ছে ক্ষিপ্র আধুনিক জীবন, এ ছাড়া আর কী? কোনো সময় নেই আত্মোপলব্ধির জন্য, কোনো সময় নেই মানবিক সখ্যের জন্য, সময় নেই সে সবের জন্য যা মানুষের বেঁচে থাকাকে করে তোলে অর্থবহ ও মূল্যবান।
এ হচ্ছে, নিশ্চিতভাবে, বর্বরতার এক আধুনিক রূপ, যা কিনা তার সমস্ত সম্পদকে, সকল ঐশ্বর্যকে নিঃশেষ করে ফেলে স্রেফ জীবনযাপনের, শূন্যতায় ঘেরা জীবনযাপনের, খাড়া চূড়ায় বেয়ে ওঠার জন্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে লেখা 'পারস্য-যাত্রী' ভ্রমণকাহিনির মূল পাণ্ডুলিপির একটি পাতাআমার কথা হচ্ছে এটাই, যে সব সত্যের রয়েছে সার্বজনীন মূল্য, সেগুলোকে আত্তীকরণের বিপক্ষে নই আমি; বাস্তবিকপক্ষে, ওগুলোকে আমাদের নিজেদের বলে দাবি করার অধিকার আমাদের জন্মগত। কিন্তু আমি তৈরি মডেল গ্রহণের বিপক্ষে, আমি বিপক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতি বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন বাহ্যিক ঘটনাবলি অনুকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেবার।
দশ্তি: আমাদের চৈতন্য তা-ই নেয়, যা সে পারে। ঠিক কতোটুকু গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে তা আমরা সচেতনভাবে ঠিক করতে পারি না। আত্তীকরণের পুরো প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে একটি অবচেতনের প্রক্রিয়া। সুতরাং শুধু যে বাইরের প্রভাবই আমাদের সভ্যতার মৌলিক চরিত্রকে পুরোপুরি ডোবাবে বা শেষ করে দেবে, সম্ভবত সে রকম ভয় নেই। যদি আমরা মার্কিনি জীবনযাত্রা-প্রণালীর দ্বারা লাভবান হতে চেষ্টা করি, যদি ওগুলোকে আমাদের জনগণের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করি, তবে সেগুলোর মধ্যে হয়তো মাত্র কয়েকটাকে আমরা বেছে নেবো। ব্যস, আর সেটাই হবে আমাদের লাভ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারতের বিখ্যাত স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের ওপর গ্রিক আইডিয়ালগুলো রেখে গেছে তাদের উত্তরাধিকার। অথচ গ্রিক প্রভাবের গোড়ার দিকে আমরা হয়তো আশঙ্কা করতাম যে, নানা গ্রিক মোটিফ ও কলাকৌশল নিয়ে ভারত তার ঐতিহ্যের ওপর নিরীক্ষা করতে গিয়ে সে বোধ হয় তার ঐতিহ্যেরই ক্ষতি করছে। পারস্যে আমাদেরও অতিবাহিত হয়েছে ওইরূপ বহিরাগত প্রভাবের কালপর্ব। তবে তা কেবলই প্রাণিত করে গেছে আমাদের অন্তর্নিহিত পারসিক বৈশিষ্ট্যকে। আমরা দ্রুত ঝেড়ে ফেলেছি অনুকরণ পর্বকে আর তা থেকে ধরে রেখেছি কিছু কিছু উপকারী জিনিস।
রবীন্দ্রনাথ: কেন তাহলে মার্কিনি জীবনযাত্রা প্রণালীর ওপর জোর দিচ্ছেন? আর কিভাবেই বা আলাদা করে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করছেন একটি বিশেষ দেশের কথা, যখন আপনারা চাইছেন বিজ্ঞানের সুস্থ ছোঁয়া? মার্কিনিও নয়, পশ্চিমাও নয়, বরং তার সত্যের দিকে থেকে বিজ্ঞান হচ্ছে বৈশ্বিক, সার্বজনীন। আমেরিকা, বিশেষ ওই দেশটার আমি নিন্দা করছি না, শুধু এটুকু তুলে ধরছি যে, আপনি যখন একটি বিশেষ দেশকে বা বিশেষ মানুষদের অনুকরণ করতে চাওয়ার কথা বলেন, তখন কেবল তাদের জিনিসগুলোকে কিংবা বাহ্যিক ঘটনাগুলোকে নকল করতে পারবেন, কিন্তু মানব চরিত্রের ভিত্তিমূলে নিহিত সত্যগুলোকে আত্তীকরণ করতে পারবেন না। যদি একটি জাতি বা একটি জনগোষ্ঠী তার সেই সব আদর্শকে রূপায়ণে সফল হয় যাদের মূল্য দীর্ঘস্থায়ী, তবে তাদের কাছ থেকে আমাদের যা শিখতে হবে তা হচ্ছে, ওইসব আদর্শকে আত্তীকরণ ও প্রতিষ্ঠা করার সামর্থ্য; অন্যরা যা কিছু তৈরি করেছে নিশ্চয়ই আমরা শুধু সেগুলোকে নকল করবো না। আমার কথা হচ্ছে এটাই, যে সব সত্যের রয়েছে সার্বজনীন মূল্য, সেগুলোকে আত্তীকরণের বিপক্ষে নই আমি; বাস্তবিকপক্ষে, ওগুলোকে আমাদের নিজেদের বলে দাবি করার অধিকার আমাদের জন্মগত। কিন্তু আমি তৈরি মডেল গ্রহণের বিপক্ষে, আমি বিপক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতি বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন বাহ্যিক ঘটনাবলি অনুকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেবার। আমাদের গুরুত্ব যেন পড়ে সত্যের ওপর, কোনো বিশেষ ঘটনাবলির ওপরে নয়— যে বিশেষ ঘটনাবলি বিকশিত হয়েছে বিশেষ কোনো দেশের অনিবার্য স্থানীয় পরিপার্শ্ব পরিস্থিতির ভেতর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে লেখা 'পারস্য-যাত্রী' ভ্রমণকাহিনির মূল পাণ্ডুলিপির একটি পাতাপ্রাচ্যে আমরা এখন হয়তো বস্তুগতভাবে গরিব হতে পারি, কিন্তু আমরা অবশ্যই সংরক্ষণ করব, মানবতার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা ভালো নয় তা বিচার বিবেচনার অধিকার, আমরা অবশ্যই সংরক্ষণ করব আমাদের সভ্যতার বিকাশের পক্ষে মানানসই একটি পথ বেছে নেবার অধিকার। এই বিচার বিবেচনার অধিকার চর্চার মাধ্যমে আমরা যে কেবল আমাদের স্বদেশের সেবা করে যাব তা নয়, বরঞ্চ এর দ্বারা আমরা পালন করব বিশ্বমানবতার প্রতি আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব, যে বিশ্বমানবতার আমরাও একটি অংশ।
দশ্তি: আমি পুরোপুরি একমত। আমেরিকাকে আমি উল্লেখ করেছি একটি উদাহরণ হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথ: সেই জার্মান বৈজ্ঞানিকটি আমাকে বললেন, ইউরোপ তার যান্ত্রিকীকৃত অতিবেগবান জীবনযাত্রায় ক্লান্ত— যে জীবনযাত্রা শুধু বাড়ায় উপকরণ, বাড়ায় বস্তুসামগ্রী কিন্তু ব্যর্থ আত্মার তৃপ্তি বিধানে। ফলে অনেকে আছেন যারা খোঁজেন দূরের কোনো জায়গা যেখানে গিয়ে ভুলে থাকতে পারবেন এই উদ্দেশ্যহীন বেঁচে থাকার তোড়জোড়, জ্বর ও উত্তেজনা, তারা যান দক্ষিণ সাগরের দ্বীপপুঞ্জে, তারা যান মাদাগাস্কারে, যেখানে গিয়ে তারা পশ্চিমা জীবনযাপন প্রণালী ধুয়ে ফেলে নিজেদেরকে পরিষ্কার করে তুলতে পারবেন। তিনি আমাকে লিপজিগের একজন বড় মাপের অধ্যাপকের কথা বললেন, যিনি অন্তরের শান্তি খুঁজতে ছেড়ে দিয়েছেন তাঁর সব বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম, ছেড়েছেন সব কিছু এমনকি যা কিছুকে তিনি তাঁর জীবনের অত্যন্ত প্রিয় বলে বিবেচনা করেছেন সেগুলোকেও। তিনি তাঁর সেই অন্তরের শান্তি খুঁজে পেয়েছেন এক তিব্বতি আশ্রমে। এটা হতে পারে একটা প্রতিক্রিয়া। তবে এতে আভাস পাওয়া যাচ্ছে সেই সব অত্যন্ত গুরুতর সমস্যার, যেগুলোকে আধুনিক যুগ আর বেশি দিন অগ্রাহ্য করে থাকতে পারবে না। ডার্মস্টাডে, যুদ্ধের পরে, জার্মান ছাত্ররা দুর্বল ফ্যাকাশে মুখে আমাকে ঘিরে জমায়েত হতো, বলতো, ‘স্যার আমরা আমাদের শিক্ষকদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি, তারা আমাদেরকে চালিত করেছেন ভুল পথে। আমরা আমাদের এই জীবন নিয়ে কী করবো?’ তারা প্রত্যাশা করেছিল একজন প্রাচ্যদেশীয় কবির জন্য, যিনি এমন কিছু দেবেন যা মেটাবে তাদের আত্মিক ক্ষুধা, দেবেন এমন কিছু জীবনদর্শন যা প্রয়োজন পশ্চিমা জগতের, তার পরিত্রাণের জন্য।
দশ্তি: হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই কাজ করে যাবো, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান— চেতনা আর প্রাচ্যের জীবন দর্শন এই দুইকে একত্রে আনবার জন্য। আমাদেরকে অবশ্যই বস্তুগতভাবে হতে হবে নিরুদ্বিগ্ন, নিরাপদ আর আত্মিকভাবে ঘটাতে হবে আমাদের মানব চরিত্রসম্পদের উন্নয়ন।
রবীন্দ্রনাথ: আমি বলছি এটাই। জীবনের এক সুষম সামঞ্জস্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, আমরা অবশ্যই বেরিয়ে আসবো মতবাদের জট থেকে, বেরিয়ে আসবো বস্তুগত ফলাফলের সম্মোহ থেকে, যে সুসামঞ্জস্য, আপনি যেমন জানালেন, সম্যক অবহিত থাকে আমাদের পূর্ণাঙ্গ মানব ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে, আমাদের স্বভাবধর্মের দৈহিক ও আত্মিক বিষয়গুলোকে একত্রিত করে। এই সুসামঞ্জস্য অবশ্য কখনোই প্রতিষ্ঠা করা যায় না, যদি আমাদের না থাকে যথেষ্ট মানসিক নিরাসক্তি, নিজেদেরকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে, অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে, আমাদের জাতীয় জীবনের ভিত্তি নির্মাণে যা কিছু স্বল্পস্থায়ী ও ভ্রান্তিজনক সেগুলোকে প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে। একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাছবিচারহীন সাধ্য-সাধনার যে মনোভাব, তার কাছে যদি আমাদের বিচার বিবেচনার ক্ষমতা আত্মসমর্পণ করে তবে তা হবে মারাত্মক। প্রাচ্যে আমরা এখন হয়তো বস্তুগতভাবে গরিব হতে পারি, কিন্তু আমরা অবশ্যই সংরক্ষণ করব, মানবতার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা ভালো নয় তা বিচার বিবেচনার অধিকার, আমরা অবশ্যই সংরক্ষণ করব আমাদের সভ্যতার বিকাশের পক্ষে মানানসই একটি পথ বেছে নেবার অধিকার। এই বিচার বিবেচনার অধিকার চর্চার মাধ্যমে আমরা যে কেবল আমাদের স্বদেশের সেবা করে যাব তা নয়, বরঞ্চ এর দ্বারা আমরা পালন করব বিশ্বমানবতার প্রতি আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব, যে বিশ্বমানবতার আমরাও একটি অংশ।
দশ্তি: জনাব, আমরা ধন্যবাদ জানাই আপনার প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীর জন্য এবং নিশ্চয়তা দিচ্ছি আপনার এই বাণী ধনরত্নের মতো সঞ্চয় করে রাখবে আমাদের জীবনের নানা গভীরতায়।