৫ মাস বয়সে বাবাকে হারিয়ে মাত্র ১৪ বছরেই কিনেছেন বাড়ি, মুম্বাইয়ের বস্তি থেকে হালের বলিউড ক্রেজ মহিমা
· Prothom Alo

মহিমার গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর সাকসেস স্টোরি নয়; বরঞ্চ এক কিশোরীর দায়িত্ববোধ এবং নিজের পরিবারের ভাগ্য বদলে দেওয়ার আখ্যান।
Visit biznow.biz for more information.
শোবিজের ঝলমলে দুনিয়ায় সাফল্য অনেক সময় বাইরে থেকে মনে হয় যেন রাতারাতি পাওয়া। কিন্তু মহিমা মাকওয়ানার গল্প একেবারেই আলাদা। আলো ঝলমলে পর্দায় আসার আগে পেরোতে হয়েছে কঠিন পথ। মুম্বাইয়ের বস্তির সাধারণ একটি চালাঘরে বেড়ে ওঠা, মাত্র পাঁচ মাস বয়সে বাবাকে হারানো, মায়ের একার সংগ্রাম, এই সবকিছুকে পেছনে ফেলে আজ বলিউড সিনেমা ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের পরিচিত মুখ এই ২৭ বছরের অভিনেত্রী। হালের সাড়া জাগানো মুসাফির ক্যাফে দিয়ে রীতিমতো ক্রেজ তৈরি করেছেন এই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও মেধাবী অভিনেত্রী। মহিমার গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর সাকসেস স্টোরি নয়; বরঞ্চ এক কিশোরীর দায়িত্ববোধ এবং নিজের পরিবারের ভাগ্য বদলে দেওয়ার আখ্যান।
হালের সাড়া জাগানো মুসাফির ক্যাফে দিয়ে রীতিমতো ক্রেজ তৈরি করেছেন এই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও মেধাবী অভিনেত্রীপাঁচ মাস বয়সেই বাবাকে হারান
মুম্বাইয়ের বস্তি এলাকার একটি সাধারণ চালাঘরে মহিমার বেড়ে ওঠা। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর মহিমা ও তাঁর বড় ভাইকে একাই বড় করার দায়িত্ব নেন তাঁদের মা। সীমিত আয়, সংসারের নানা চাপ—সবকিছুর মধ্যেও সন্তানদের স্বপ্ন দেখাতে পিছপা হননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল মহিমার। সেই আগ্রহই একসময় তাঁকে নিয়ে যায় অডিশনের জগতে। মাত্র ৯ বছর বয়সে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজতে অডিশন দেওয়া শুরু করেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল মহিমারশৈশবটা তাই অন্য অনেক শিশুর মতো ছিল না। স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি টেলিভিশনের শুটিং। কখনো টানা ১২ ঘণ্টা সেটে থাকতে হয়েছে। মুম্বাইয়ের ব্যস্ত লোকাল ট্রেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাতায়াত করেছেন। শুটিংয়ের ফাঁকে মেকআপ রুমের এক কোণে বসেও পড়াশোনা করেছেন। অডিশনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতাও কম নয়।
১৩ বছরেই বদলে যায় জীবন
মহিমার জীবনের বড় মোড় আসে ১৩ বছর বয়সে। জি টিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক 'সাপনে সুনহানে লাড়াকপান কে'-তে রচনার চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। ধারাবাহিকটি তাঁকে দ্রুত দর্শকের পরিচিত মুখ করে তোলে।
অল্প বয়সেই অভিনয় থেকে আয় শুরু করেছিলেন মহিমা। সেই অর্থ নিজের জন্য জমিয়ে না রেখে পরিবারের জন্য ব্যবহার করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে মায়ের জন্য একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। মুম্বাইয়ের চালাঘরের জীবন ছেড়ে নিজের পরিবারের একটি স্থায়ী ঠিকানা হয়। এই ঘটনা মহিমার জীবনের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়।
অল্প বয়সেই অভিনয় থেকে আয় শুরু করেছিলেন মহিমাঅভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনা
শৈশবেই অভিনয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও পড়াশোনাকে পাশে সরিয়ে রাখেননি মহিমা। বরং বিনোদনজগতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে শিক্ষাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। তিনি ব্যাচেলর অব মাস মিডিয়া (বিএমএম) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। সাংবাদিকতায় বিশেষায়িত এই পড়াশোনা তাঁকে গণমাধ্যম, জনসংযোগ ও গল্প বলার ধরন সম্পর্কে ধারণা দেয়। অভিনয়ের জগতের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক বুঝতে এই শিক্ষাও তাঁকে সহায়তা করেছে।
বদলে গেছে ফ্যাশন
ক্যারিয়ারের শুরুতে টেলিভিশনের পর্দায় মহিমাকে দেখা গেছে তুলনামূলকভাবে ঐতিহ্যবাহী ও ভারী সাজের পোশাকে। সময়ের সঙ্গে তাঁর ফ্যাশনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন তাঁর স্টাইল অনেক বেশি আধুনিক, পরিপাটি ও ট্রেন্ডি।
একসময় গ্ল্যামারাস লুকেই বেশি দেখা যেত মহিমাকে এখন তাঁর স্টাইল অনেক বেশি আধুনিক, পরিপাটি ও ট্রেন্ডিরেড কার্পেট আর র্যাম্পে মহিমা
রেড কার্পেট আর র্যাম্পে মহিমার লুকে থাকে গ্ল্যামারের ছোঁয়া। স্ট্রাকচার্ড গাউন, একরঙা পোশাকে দেখা যায় তাঁকে।
স্ট্রাকচার্ড গাউন, একরঙা পোশাকে দেখা যায় তাঁকে র্যাম্পেপোশাকের কাটে থাকে শরীরের গড়নকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা। সঙ্গে থাকে হালকা গয়না ও পরিপাটি চুলের সাজ।
ক্যামেরার বাইরে
দৈনন্দিন পোশাকে অবশ্য অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ এই অভিনেত্রী। ওয়াইড-লেগ ট্রাউজার, ক্রপড ব্লেজার, কো-অর্ড সেট কিংবা ঢিলেঢালা লিনেন শার্ট—এ ধরনের পোশাকেই তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। তাঁর ফ্যাশনে আরাম ও প্র্যাক্টিকালিটির সঙ্গে থাকে আধুনিকতার ছোঁয়া।
তাঁর ফ্যাশনে আরাম ও প্র্যাক্টিকালিটির সঙ্গে থাকে আধুনিকতার ছোঁয়াসাজে ‘কমই বেশি’
মেকআপের ক্ষেত্রেও মহিমা খুব বেশি ভারী সাজ পছন্দ করেন না। হালকা ও উজ্জ্বল মেকআপ, স্বাভাবিক ভ্রু আর ন্যুড লিপস—এমন সাজেই তাঁকে বেশি দেখা যায়।
মেকআপের ক্ষেত্রেও মহিমা খুব বেশি ভারী সাজ পছন্দ করেন নাView this post on Instagram
মুসাফির ক্যাফে-তেও তাঁকে খুব ন্যাচারল লুকে দেখা গিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মেকআপহীন ও ফিল্টারবিহীন ছবি প্রকাশ করে স্বাভাবিক সৌন্দর্যের পক্ষে কথা বলেন তিনি।
শরীরচর্চায় যোগ ব্যায়াম ও ওয়েট ট্রেনিং
অভিনেত্রী হিসেবে ফিট থাকা মহিমার জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শরীরচর্চায় তিনি ওয়েট ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি যোগব্যায়াম করেন। তাঁর কাছে শরীরচর্চা শুধু শারীরিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, মানসিক সুস্থতারও অংশ।
ভ্রমণ তাঁর কাছে যেন ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগভ্রমণে প্রকৃতির কাছে
ব্যস্ত শুটিং ও কাজের ফাঁকে ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন মহিমা। তবে তাঁর পছন্দ খুব বেশি কোলাহলপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র নয়। বরং শান্ত, প্রকৃতিঘেরা জায়গায় সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভ্রমণ তাঁর কাছে যেন ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
সবচেয়ে কাছের মানুষ মা
জীবনের শুরু থেকেই মহিমার সংগ্রামের সঙ্গী তাঁর মা। তাই আজও তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ মা-ই। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘরে রান্না করা খাবার খাওয়া এবং অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।
জীবনের শুরু থেকেই মহিমার সংগ্রামের সঙ্গী তাঁর মাবলিউডের অন্তিম সিনেমায় অভিষেক থেকে শুরু করে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন কাজ;ক্যারিয়ারে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন মহিমা। তবে সাফল্যের শিখরে উঠেও তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি যেন সেই মুম্বাইয়ের চালাঘরেই রয়ে গেছে।
ছোট্ট এক মেয়ে আজ নিজের শর্তে তৈরি করেছে বিনোদনজগতের আলাদা পরিচয়কারণ, মহিমা মাকওয়ানার গল্প মনে করিয়ে দেয়, সাফল্য সব সময় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না। কখনো কখনো কঠিন বাস্তবতা, মায়ের আত্মত্যাগ আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই শক্তিতেই ছোট্ট এক মেয়ে আজ নিজের শর্তে তৈরি করেছে বিনোদনজগতের আলাদা পরিচয়।
সূত্র: দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, উইকিপিডিয়া, ইন্সটাগ্রাম
ছবি: মহিমার ইন্সটাগ্রাম