আইইউবির শিক্ষার্থীদের কসপ্লেতে যখন ফিরে আসে বাঙালির শিকড়
· Prothom Alo

বাবার বিয়ের পাঞ্জাবি, মায়ের জামদানি, দাদির ৫০ বছরের পুরোনো শাড়ি—পোশাক, খাবার, সাহিত্য আর শিল্পে আইইউবির শিক্ষার্থীদের অন্যরকম বাংলাদেশ।
কসপ্লে বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অ্যানিমে, কমিকস, সিনেমা কিংবা কল্পজগতের নানা চরিত্র। কিন্তু সেই পরিচিত কসপ্লের ধারণাকেই যখন বাঙালির পোশাক, খাবার, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তৈরি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থীদের এক আয়োজন যেন সেই গল্পই বলল—নিজের শিকড়কে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প।
অনুষ্ঠানের শুরু হয় আর্ট অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স কোর্সের শিক্ষার্থীদের চিত্রপ্রদর্শনী উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে।
Visit betsport24.es for more information.
প্রধান অতিথি শিল্পী ও বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ফিতা কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। পরে তিনি ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি দেখেন এবং তাদের কাজের প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইইউবির ডিপার্টমেন্ট অব সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ট হিউম্যানিটিজের অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুর রহমান, আর্ট অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স কোর্সের শিক্ষক অধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্তী, ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের শিক্ষক অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু এবং দুই কোর্সের শিক্ষার্থীরা।
পাঠ্যক্রম যখন শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে যায়
স্বাগত বক্তব্যে ড. কাজী মাহমুদুর রহমান তুলে ধরেন কারিকুলাম ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রামের ধারণা। আইইউবির পাঠ্যক্রমে আর্ট অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স) এবং ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ—এই দুটি ফাউন্ডেশন কোর্সের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ শিল্প ও সংস্কৃতিকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ঐতিহ্য বয়ে চলে প্রজন্মান্তরে, বলেছেন অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নুঅধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, শিল্পকে কীভাবে বোঝা যায়, কীভাবে অনুভব করা যায় এবং কীভাবে প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করা যায়—এই আয়োজন তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। অন্যদিকে অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু তাঁর বক্তব্যে ভৌগলিক নির্দেশক বা জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন (জিআই) পণ্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের পাশাপাশি পোশাক, খাবার ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কীভাবে ঐতিহ্য বহন করে, সে বিষয়টি তুলে ধরেন।
কসপ্লেতে বাঙালির গল্প
এই আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের শিক্ষার্থীদের হেরিটেজ কসপ্লে। এখানে কসপ্লে মানে কেবল কোনো কাল্পনিক চরিত্রের সাজ নয়; বরং নিজের পরিবার, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে চরিত্র ও পোশাক বেছে নেওয়া।
পোশাকে ফিরেছে স্মৃতিকেউ এসেছেন বাবার বিয়ের পাঞ্জাবি পরে। কেউ পরেছেন মায়ের বিয়ের জামদানি শাড়ি। একজন শিক্ষার্থী পরেছেন তাঁর নানির প্রায় ৫০ বছর পুরোনো জামদানি শাড়ি। আবার কেউ কেউ বাংলা সাহিত্যের পরিচিত চরিত্র—ব্যোমকেশ বক্সী, দেবদাস, বাকের ভাই, রাণী, রূপা প্রমুখের সাজে হাজির হয়েছেন। নারী শিক্ষার্থীরা কেউ পরেছিলেন রাজশাহী সিল্ক কেউবা টাঙ্গাইল কিংবা জামদানি শাড়ি।
এখানেই আয়োজনটির বিশেষত্ব। ফ্যাশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের সাজাননি; তাঁরা নিজেদের পারিবারিক স্মৃতি, সাহিত্যিক কল্পনা এবং আঞ্চলিক পরিচয়কেও সামনে এনেছেন। একটি পুরোনো জামদানি এখানে হয়ে উঠেছে পরিবারের ইতিহাসের অংশ, একটি পাঞ্জাবি হয়ে উঠেছে পিতার যৌবনের স্মৃতি, আর কোনো সাহিত্যচরিত্র হয়ে উঠেছে প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির বাহক।
এক টেবিলে বাংলাদেশের স্বাদ
শিক্ষার্থীরা নিয়ে আসেন নিয়ে এসেছিলেন নিজের জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবারপোশাকের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারও জায়গা করে নেয় আয়োজনটিতে। শিক্ষার্থীরা নিয়ে আসেন নিজের জেলার ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছিল বগুড়ার চিনিপাতা দই, কুমিল্লার রসমালাই ও ছানার মুড়কি, টাঙ্গাইলের বাতাসা মিঠাই এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা।
এর সঙ্গে যোগ হয় শিক্ষার্থীদের মায়েদের হাতে তৈরি নানা খাবার—দুধচিতই, নারিকেলের নাড়ু, পাটিসাপটা পিঠা, মাংস পিঠাসহ আরও নানা আয়োজন। ফলে খাবারের টেবিলটিও হয়ে ওঠে বাংলাদেশের পারিবারিক ও আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতির এক ছোট্ট মানচিত্র।
গান, সিনেমা আর স্মৃতির বাংলাদেশ
বিভিন্ন পরিবেশনা উপভোগ করছেন অতিথি ও ছাত্রছাত্রীরাআয়োজনের সাংস্কৃতিক পর্বেও ছিল ঐতিহ্যের ছাপ। ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের দুই নারী শিক্ষার্থী গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। বিশেষ আয়োজন হিসেবে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র একটি অংশ মঞ্চায়ন করেন কোর্সটির একদল শিক্ষার্থী।
ফলে পুরো আয়োজনটি ধীরে ধীরে একটি প্রদর্শনী থেকে পরিণত হয় জীবন্ত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায়—যেখানে ছবি, পোশাক, সাহিত্য, খাবার, গান ও অভিনয় একই সুতোয় বাঁধা পড়ে।
‘আমি কে, আমি কেন বাঙালি’
আয়োজন শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শিল্পী চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, এই অভিজ্ঞতাকে অল্প কথায় প্রকাশ করা কঠিন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই যেন একটি বিষয়ে বিশ্বাস করেন, ‘আমি কে, আমি কেন বাঙালি’।
আমি কে, আমি কেন বাঙালি- এই বিশ্বাসের প্রতিফলন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন চন্দ্র শেখর সাহাতাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ঢাকাকে ঘিরে প্রচলিত হতাশার কথাও। প্রতিদিনের দুর্যোগ, উদ্বেগ ও নানা সমস্যার ভিড়ে ঢাকা যেন তার প্রাণ হারিয়ে ফেলেছে। অথচ এমন ধারণার বিপরীতে এই আয়োজন তাঁকে নতুনভাবে আশাবাদী করেছে। তাঁর ভাষায়, এই অনুষ্ঠান তাঁকে বুঝিয়েছে, এত নেতিবাচকতার মধ্যেও কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়।
চন্দ্র শেখর সাহার পর্যবেক্ষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আনা খাবারের মধ্যে তাঁদের মায়েদের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগও লুকিয়ে ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও আইইউবি এ ধরনের আয়োজনে সবাইকে যুক্ত রাখবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাঙালিয়ানা, মমতা ও ভালোবাসার এই চর্চা অব্যাহত থাকবে।
শেষ পর্যন্ত এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এটিই যে, ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে না দেখে তাকে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের ভাষায় নতুন করে আবিষ্কার করা।
একজন শিক্ষার্থীর গায়ে দাদির অর্ধশত বছরের পুরোনো জামদানি, কারও হাতে মায়ের তৈরি পিঠা, কারও বাংলা সাহিত্যের চরিত্র হয়ে ওঠা, আবার কারও কণ্ঠে পুরোনো দিনের গান—সব মিলিয়ে কসপ্লে এখানে আর কেবল সাজসজ্জা থাকেনি। হয়ে উঠেছে নিজের পরিচয়কে নতুন করে জানার এক অভিনব আয়োজন।
আর সেই জায়গাতেই হয়তো এই আয়োজনের সবচেয়ে সুন্দর বার্তা—ঐতিহ্য কখনো পুরোনো হয় না; নতুন প্রজন্মের স্পর্শে বারবার নতুন করে জন্ম নেয়।