চাঁদ দূরে সরে গেলে পৃথিবীর কী কী পরিবর্তন হবে

· Prothom Alo

রাতের আকাশে রূপালি চাঁদ দেখে কবিরা কতই না কবিতা লিখেছেন! বিরহী প্রেমিকেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের হিসাব-নিকাশ শুনলে প্রেমিকদের চেয়ে বরং সাধারণ মানুষেরই বেশি দীর্ঘশ্বাস ফেলার কথা। কারণ, আমাদের সেই প্রিয় চাঁদ মামা কিন্তু একটু একটু করে আমাদের ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।

এই কথা শুনে হয়তো আপনার মনে হতে পারে—সর্বনাশ! কাল থেকেই কি তবে জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে যাবে? আকাশে কি আর চাঁদ দেখা যাবে না? আসলে মহাকাশের এসব হিসাব-নিকাশ বেশ মজার, আবার কিছুটা রোমাঞ্চকরও। চাঁদ দূরে সরে গেলে পৃথিবীর কী হাল হবে, তা নিয়ে রীতিমতো পিলে চমকানো খবর থাকলেও, আশার কথা হলো, আমাদের জীবদ্দশায় অন্তত তেমন কিছুই হচ্ছে না!

Visit bettingx.club for more information.

বর্তমানে চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরে বসে তার রূপের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। আমাদের দিন কাটছে মোটামুটি ২৪ ঘণ্টায়। কিন্তু এই ২৪ ঘণ্টার দিনটা সবসময় এমন ছিল না। চাঁদ যখন পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, তখন এর মহাকর্ষীয় টানের কারণে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। এই জোয়ারের সময় পানি ফুলে ওঠে এবং সমুদ্রের তলদেশের সঙ্গে একটা বিশাল ঘর্ষণের সৃষ্টি করে। সোজা কথায়, সমুদ্রের পানি যেন পৃথিবীর ঘোরার গতির চাকায় একটুখানি ব্রেক কষে দেয়।

এই ব্রেক কষার কারণে পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ফলে দিন বড় হচ্ছে। হিসাব বলছে, প্রতি ১০০ বছরে আমাদের দিন ১.৮ মিলি সেকেন্ড করে বড় হচ্ছে। পৃথিবীর এই কমে যাওয়া শক্তির একটা অংশ আবার চাঁদ নিজের পকেটে পুরে নিচ্ছে এবং শক্তি পেয়ে সে একটু ওপরের কক্ষপথে উঠে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ৩.৭৮ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে।

চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কেন
সাগরের পানি শুকিয়ে গেলে চাঁদের জন্য আরেক বিপদ। এত দিন ধরে সমুদ্রের পানির যে বিশাল ঘর্ষণ চাঁদকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল, পানি না থাকায় সেই ঘর্ষণটাই আর থাকবে না।

কোটি কোটি বছর আগের প্রবাল জীবাশ্ম ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আজ থেকে প্রায় ১৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এক বছর হতো ৪৮৫ দিনে! তখন পৃথিবী অনেক জোরে ঘুরত, আর এক দিন পার হতো মাত্র ১৮ ঘণ্টায়। এভাবেই চলতে থাকলে, আজ থেকে প্রায় ১০০ কোটি বছর পর পৃথিবীর এক দিন হবে ২৭ ঘণ্টার। আর চাঁদ মামা আমাদের ছেড়ে আরও ১০ শতাংশ দূরে, অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার দূরে গিয়ে বসবে। যারা কাজের চাপে সারাদিন হা-হুতাশ করেন যে ‘২৪ ঘণ্টায় দিন না হয়ে আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো’, তাদের জন্য এটা সুখবর হতে পারত, যদি না তারা ১০০ কোটি বছর আগে জন্মাতে পারতেন!

১০০ কোটি বছর পরের পৃথিবীটা কিন্তু মোটেও শান্তশিষ্ট থাকবে না। কারণ তখন সূর্যমামা রীতিমতো ভিলেনের রূপ ধারণ করবে। সূর্যের উজ্জ্বলতা এখনকার চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যাবে। আমরা যদি এর আগেই নিজেদের পরিবেশ ধ্বংস করে বিলুপ্ত না হই, তবে ওই বাড়তি রোদের তাপে পৃথিবীতে এক ভয়ংকর গ্রিনহাউস ইফেক্ট শুরু হবে। ফলাফল? পৃথিবীর সব মহাসাগরের পানি চায়ের কেটলির মতো টগবগ করে ফুটে পুরোপুরি উবে যাবে!

সাগরের পানি শুকিয়ে গেলে চাঁদের জন্য আরেক বিপদ। এত দিন ধরে সমুদ্রের পানির যে বিশাল ঘর্ষণ চাঁদকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল, পানি না থাকায় সেই ঘর্ষণটাই আর থাকবে না। পৃথিবীর শক্ত পাথরগুলো তো আর পানির মতো চাঁদের টানে ফুলে উঠবে না। ফলে চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রায় পুরোপুরি থমকে যাবে। পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যও আটকে যাবে ওই ২৭ ঘণ্টাতেই।

আরও প্রায় ৪০০ কোটি বছর পর সূর্য আকৃতিতে এতই বড় হয়ে যাবে যে, পৃথিবী ও চাঁদকে হয়তো আস্ত গিলে ফেলবে। যদি গিলে নাও খায়, অন্তত এদের পৃষ্ঠের সবকিছু পুড়িয়ে একদম গলিত লাভা বানিয়ে ছাড়বে। সেই ভয়াবহ সময়ে চাঁদ আবার দূরে সরে যেতে পারে, কিন্তু তখন পৃথিবীর বুকে এসব দেখার জন্য কোনো মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী বেঁচে থাকবে না। হয়তো ৬০ কোটি বছর পর ইঁদুরের মতো দেখতে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী পৃথিবীর দখল নেবে, কিন্তু তাদেরও চাঁদের এই দূরে সরে যাওয়া নিয়ে মাথাব্যথার কোনো কারণ থাকবে না।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কি সত্যিই সৌরজগতের বাইরে প্রথম চাঁদ আবিষ্কার করেছে
সবচেয়ে বড় বিপত্তিটা বাধবে পৃথিবীর অক্ষে। বর্তমানে চাঁদের টানে পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৪ ডিগ্রি কোণে বেশ স্থিতিশীল অবস্থায় হেলে আছে। চাঁদ দূরে চলে গেলে এই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে।

চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়বে আমাদের জোয়ার-ভাটা ও সূর্যগ্রহণের ওপর। যেহেতু চাঁদের দূরত্ব বাড়লে এর মহাকর্ষীয় প্রভাব কমে যায়, তাই চাঁদ ১০ শতাংশ দূরে সরে গেলে পৃথিবীতে জোয়ারের উচ্চতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাবে। এখন যে জোয়ারের উচ্চতা ৪ মিটার হয়, তখন তা হবে মাত্র ৩ মিটার। উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হবে।

আরেকটি আক্ষেপের বিষয় হলো, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে। আজ থেকে প্রায় ৬০ কোটি বছর পর চাঁদ এতটা দূরে চলে যাবে যে, আকাশ থেকে একে দেখতে বেশ ছোট লাগবে। তখন আর সে সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না। তখন আমরা শুধু বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পাব, যেখানে চাঁদের কালো ছায়ার চারপাশে সূর্যের আলোর একটি রিং উঁকি দেবে।

সবচেয়ে বড় বিপত্তিটা বাধবে পৃথিবীর অক্ষে। বর্তমানে চাঁদের টানে পৃথিবীর অক্ষ ২৩.৪ ডিগ্রি কোণে বেশ স্থিতিশীল অবস্থায় হেলে আছে। চাঁদ দূরে চলে গেলে এই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে। তখন পৃথিবীর হেলে থাকার কোণ পাগলের মতো এদিক-ওদিক দুলতে থাকবে। ফলে ঋতু পরিবর্তন এবং জলবায়ুতে আসবে চরম ও দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়। দীর্ঘকাল পর পৃথিবীর ঘোরার গতি আর চাঁদের গতি সমান হয়ে গেলে তারা একে অপরের সঙ্গে স্থায়ীভাবে আটকে যাবে। তখন পৃথিবীর একপাশের মানুষ সারা জীবন আকাশে চাঁদকে একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকতে দেখবে!

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

Read full story at source