হিন্দু ও মুসলমান কেন ’৪৭-কে ভিন্নভাবে স্মরণ করে
· Prothom Alo

ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার ৭৯ বছর পার হলো গত আগস্টে। যদিও প্রকৃত বিভাজন বুঝতে হলে তখনকার এবং বর্তমানের মানচিত্রের দিকে তাকাতে হয়, আর প্রথম বিভাজনের সেই মানচিত্র ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পর আরও বদলে গেছে, তবু সেই বিভাজনের ইতিহাস এবং মানুষের ওপর তার প্রতিক্রিয়া জানা দরকার।
১৯৪৭ সালের বিভাজন আক্ষরিক অর্থে পুরো ভারতকে টুকরো টুকরো করেনি। তবে ভারতের দুটি বৃহৎ অঞ্চলকে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত করেছিল।
Visit tr-sport.click for more information.
এর ফলে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। যে দুটি অঞ্চল বিভক্ত হয়েছিল, সেগুলো হলো বাংলা ও পাঞ্জাব।
কিন্তু বিভক্ত হওয়ার পরও আজ পর্যন্ত এই দুই অঞ্চলের মানুষের মনে ফেলে আসা মাটির জন্য টান রয়ে গেছে।
দেশভাগ ১৯৪৭: ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত আঁকার গল্প১৯৪৭ থেকে ১৯৫২: একুশের হয়ে ওঠাযদিও এই স্মরণবেদনা বা নস্টালজিয়া আজকের প্রজন্মের থাকার কথা নয়, তবু প্রায়ই সাহিত্য ও সিনেমায় হারিয়ে যাওয়া সেই স্মৃতির পুনরুত্থান দেখি।
পাঞ্জাব থেকে চলে আসা উদ্বাস্তুদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাবেক পৈতৃক নিবাস নিয়ে আগ্রহ দেখি।
দেখি, কেউ কেউ একবার হলেও পূর্বপুরুষের ভিটা দেখে আসতে চান। একইভাবে দেখি, পূর্ববঙ্গের সাবেক অধিবাসীদের মধ্যেও নিজেদের পিতৃভূমি নিয়ে গভীর স্মরণবেদনা রয়েছে।
দেখি আর ভাবি, এই স্মরণবেদনা কি স্বাভাবিক? শুধু কি পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া মানুষই এই স্মরণবেদনায় ভোগেন?
নাকি যাঁরা ভারত ছেড়ে পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যেও কিংবা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এ ধরনের অনুভূতি রয়েছে?
এ প্রশ্নগুলো নিয়েই আমার কিছু ভাবনা। এ লেখা সে ভাবনারই কিছু ফসল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের চার কুশীলব (বাঁ থেকে) জওহরলাল নেহরু, সিরিল র্যাডক্লিফ, লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর্যাডক্লিফ রোয়েদাদ বঙ্গকে অসমভাবে বিভক্ত করেছিল। পূর্ববঙ্গ পেয়েছিল প্রায় ৬৪ শতাংশ ভূখণ্ড আর পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছিল ৩৬ শতাংশ।
এই বিভাজন নির্ভর করেছিল ‘অখণ্ড বঙ্গ’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল, তার ওপর। ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, বঙ্গ প্রদেশের আয়তন ছিল ৭৭ হাজার ৪৪২ বর্গমাইল।
এর মধ্যে পূর্ববঙ্গের ভাগে পড়ে প্রায় ৪৯ হাজার ২৫৯ বর্গমাইল। সিলেট তখন আসামের অংশ ছিল। গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটিকে সাধারণত এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়।
সহজ ভাষায় বললে, বঙ্গভাগের আগে প্রতি ১০০ বর্গমাইলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ ছিল ৩৫ থেকে ৩৬ শতাংশ আর পূর্ববঙ্গের ভাগ ছিল ৬৪ থেকে ৬৫ শতাংশ।
অর্থাৎ আয়তনের দিক থেকে পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৭৫ গুণ বড় ছিল।
১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, বঙ্গের দুই অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাতও ছিল বেশ ভিন্ন। পূর্ববঙ্গে হিন্দু ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ এবং মুসলমান ৭০ শতাংশ।
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং মুসলমান ৩০ শতাংশ। পুরো বঙ্গের হিসাবে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ এবং মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ শতাংশ।
নামটি 'বাংলা প্রদেশ'ও হতে পারতর্যাডক্লিফের মুখে বিষাদের ছায়া ছিলএখন দেখা যাক, ১৯৪৭ সালের বঙ্গভাগ দুই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল। কত মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিল; কত মানুষকে তাঁদের বাড়ি ও ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে হয়েছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বঙ্গভাগের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ হিন্দু পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে চলে যান।
এই ধারা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। ধাপে ধাপে এক হিসাবে দেখা যায়, পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছরে মোট প্রায় ৬০ লাখ হিন্দু পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
তুলনামূলকভাবে, ১৯৪৭ সালের পর ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসন করেন। তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছিল বিহার প্রদেশ থেকে।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব অভিবাসীর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া অনেকেই ১৯৫১-৫২ সালে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান।
তাহলে প্রশ্ন হলো, হিন্দুরা কি মুসলমানদের তুলনায় বঙ্গভাগকে বেশি আক্ষেপের সঙ্গে স্মরণ করেন?
ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার চেচরীরামপুর গ্রামের পৈতৃক ভিটায় ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথমবারের মতো পা রাখেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কণ্ঠশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী। এ সময় আবেগে কেঁদে ফেলেন তিনি।সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, হ্যাঁ। ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখায়, বাঙালি হিন্দুরা, বিশেষত পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু উদ্বাস্তুরা বঙ্গভাগ নিয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বেদনা বহন করেছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাঙালি মুসলমানরা কোনো কষ্ট বা অনুশোচনা অনুভব করেননি। তাঁদের আবেগের ধরন ছিল ভিন্ন এবং সেই আবেগ প্রকাশের পথও ছিল আলাদা।
প্রশ্ন হলো, হিন্দুদের আক্ষেপ কেন বেশি তীব্র? এর প্রধান কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অসম অভিবাসন। বঙ্গভাগের সময় পূর্ববঙ্গের লাখ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।
বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। এই ব্যাপক উচ্ছেদ একটি শক্তিশালী স্মৃতি-সংস্কৃতি তৈরি করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হারানোর বেদনা।
দ্বিতীয়ত, হারানো বাড়ি। উদ্বাস্তু হিন্দুদের কাছে পূর্ববঙ্গের গ্রাম, পুকুর, খেত, মন্দির—সবকিছুই হয়ে ওঠে পবিত্র স্মৃতির অংশ।
উদ্বাস্তুদের সাহিত্যেও বারবার পূর্ববঙ্গকে একটি হারানো স্বদেশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; কোনো প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে নয়।
ফলে জন্মভূমি হারানোর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনা ধীরে ধীরে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত, ভাগাভাগি করা গ্রামীণ জীবনের স্মরণবেদনা। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সত্ত্বেও বহু হিন্দু উদ্বাস্তু তাঁদের মুসলমান প্রতিবেশীদের স্নেহভরে স্মরণ করেন।
মৌখিক ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, হিংসার নায়ক বা উসকানিদাতাদের সঙ্গে সাধারণ মুসলমান গ্রামবাসীকে আলাদা করে দেখা হয়।
অনেক মুসলমান প্রতিবেশী তখন হিন্দুদের রক্ষা করেছিলেন। তাই এই স্মরণবেদনা মূলত একটি যৌথ বঙ্গের স্মরণবেদনা, শুধু হিন্দু বঙ্গের নয়।
কেউ কেউ পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে তাঁদের অনেকে ফিরে আসেন। কারণ, নতুন দেশে যাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকের পূরণ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনও ছিল শক্তিশালী। পরে পাসপোর্ট ও ভিসার নিয়ম কঠোর হয়ে গেলে তাঁদের অনেকে আর নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি।
অন্যদিকে মুসলমানদের স্মরণবেদনা শুরুতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। এর একটি প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক অর্জনের অনুভূতি।
পশ্চিমবঙ্গের অনেক মুসলমানের কাছে ১৯৪৭ সাল মানে ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান, হিন্দু অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য থেকে মুক্তি এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের একটি স্বদেশের জন্ম।
ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তী উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিক গ্রামীণ স্মৃতিচারণায় ট্র্যাজেডির অনুভূতি ছিল ‘হিন্দুদের বেশি, মুসলমানদের কম’।
আরেকটি কারণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম অভিবাসন। অধিকাংশ মুসলমান নিজেদের জায়গাতেই থেকে গিয়েছিলেন। ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ হতে না হওয়ায় তাঁদের নস্টালজিয়ার আবেগগত জ্বালা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
কেউ কেউ পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে তাঁদের অনেকে ফিরে আসেন। কারণ, নতুন দেশে যাওয়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকের পূরণ হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনও ছিল শক্তিশালী। পরে পাসপোর্ট ও ভিসার নিয়ম কঠোর হয়ে গেলে তাঁদের অনেকে আর নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে পারেননি।
তাঁদের স্মরণবেদনা তাই ছিল জটিল। কখনো তা পশ্চিমবঙ্গের জন্য, কখনো অখণ্ড বঙ্গের জন্য। ফলে দুই সম্প্রদায়ের আক্ষেপ ও স্মরণবেদনা তৈরি হয়েছে দুটি ভিন্ন আবেগের পথ ধরে।
হিন্দু উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে পথটি ছিল—বঙ্গভাগ, উদ্বাস্তু হওয়া, ক্ষতি এবং তারপর স্মরণবেদনা। অর্থাৎ ক্ষতি ও স্মরণবেদনা এখানে একই সূত্রে গাঁথা।
পশ্চিমবঙ্গে নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে কার লাভপশ্চিমবঙ্গে কেন বাংলাদেশ–বিরোধিতা বাড়ছেপশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের ক্ষেত্রে পথটি ছিল—বঙ্গভাগ, পাকিস্তান, হতাশা এবং পরে স্মরণবেদনা। এখানে স্মরণবেদনা তাৎক্ষণিকভাবে জন্ম নেয়নি; সময়ের সঙ্গে তা তৈরি হয়েছে।
অখণ্ড বঙ্গের প্রতি স্মরণবেদনা বা আক্ষেপ পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু উদ্বাস্তুদের মধ্যে অত্যন্ত তীব্র ছিল। তাঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যেও এই অনুভূতি রয়েছে, যদিও এর তীব্রতা অনেকটাই কমেছে।
ভারতে বসবাসকারী পশ্চিমবঙ্গীয় মুসলমানদের মধ্যে এই স্মরণবেদনা মাঝারি থেকে তীব্র। আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়া মুসলমানদের ক্ষেত্রে শুরুতে আক্ষেপ বা স্মরণবেদনা ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
তবে ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
হিন্দু উদ্বাস্তুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় বঙ্গভাগের স্মৃতি-সংস্কৃতিতে তাঁদের বয়ানই সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
ফলে বঙ্গভাগকে ঘিরে যে স্মৃতি, সাহিত্য, গল্প ও নস্টালজিয়া আমরা দেখতে পাই, তার বড় অংশই উদ্বাস্তু হিন্দুদের অভিজ্ঞতা ও বয়ান দ্বারা প্রভাবিত।
আজকের স্মরণবেদনা মূলত একটি যৌথ বাঙালি সাংস্কৃতিক জগতের প্রতি আকাঙ্ক্ষা।
এটি রাজনৈতিক ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং এটি সেই হারানো ভূগোল, ভাগাভাগি করা সংস্কৃতি, ভাষা, স্মৃতি, সম্পর্ক ও জীবনযাপনের প্রতি একধরনের টান, যা রাজনৈতিক সীমারেখা দিয়ে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী লেখক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
* মতামত লেখকের নিজস্ব