বাঙালির ঐশ্বর্যময় চিন্তাধারা
· Prothom Alo

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে দুই শতকের বাঙালির মনন ও চিন্তার বিপুল ভান্ডার সংকলিত হয়েছে ২০৯ খণ্ডে। দীর্ঘ এই কর্মযজ্ঞ শুধু বাঙালির চিন্তার ঐশ্বর্যকে এক মলাটের পরিসরে এনেছে তা নয়, ভবিষ্যৎ জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার জন্যও তৈরি করেছে এক মূল্যবান ভিত্তি।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাঙালির চিন্তাজগৎ যে কত বিস্তৃত, বিচিত্র আর গভীরতায় সমৃদ্ধ, তার পুরো হদিস আমাদের জানা ছিল না। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রধান সম্পাদকতায় ১৬টি বিষয়ে ২০৯ খণ্ডে ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’ প্রকাশের পর আমরা এর বিস্তারিত পরিচয় পেয়ে বিস্মিত হই। চিন্তা মানবজাতির একান্ত স্বকীয় এক ক্রিয়া, যা তাকে সমগ্র প্রাণিজগৎ থেকে শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা দিয়েছে; যা মানবসভ্যতা সৃষ্টি ও তার অব্যাহত অগ্রগতির প্রশ্নে মৌলিক বীজ হিসেবে সর্বদা সক্রিয় রয়েছে। মানবসভ্যতা যেমন গড়েই উঠেছে মানবের চিন্তনক্রিয়ার রেশ ধরে, তেমনই এর অগ্রগতির ইতিহাসের সঙ্গে মানবচিন্তার বিবর্তনের ইতিহাসটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমরা প্রাচীনকালের অনেক সভ্যতার বিকাশের কথা জানি। মেসোপটেমীয়, মিসরীয়, সিন্ধু, ভারতীয়, চীনা, গ্রিক, রোমান প্রভৃতি সভ্যতা এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। এসব সভ্যতার অবদান, অর্থাৎ এর মাধ্যমে মানবের সৃষ্টিশীল চিন্তার উৎকর্ষ কতটা চূড়া স্পর্শ করেছিল, তা দেখে আজও আমরা পরম বিস্ময় নিয়ে অনুধাবনের চেষ্টা করি। কিন্তু আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো, এসব সভ্যতা ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগোতে পারেনি।
অতঃপর ইউরোপে তেরো শতকে সূচিত রেনেসাঁসের আন্দোলন দীর্ঘকালের প্রচেষ্টায় যে সাফল্য অর্জন করে জ্ঞান–বিজ্ঞানচর্চার পথ অবারিত করে তোলে, সেটাই মানবসভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা, নতুন উদ্যম ও নতুন গতি সঞ্চার করে। এর ফলে শিল্পবিপ্লব, যন্ত্রসভ্যতার অভূতপূর্ব বিকাশ ত্বরান্বিত করে পুঁজিবাদের উদ্ভব নিশ্চিত করলে তার অনিবার্য নিয়তি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের সৃষ্টি হয়। তা বিশ্বব্যাপী শোষণের বিপুল আয়োজনের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য অনেক নেতিবাচক ও যন্ত্রণাদায়ক উপাদান সৃষ্টি করলেও পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা অবাধ হওয়ায় মানবসভ্যতার বিকাশের ধারা নিরবচ্ছিন্ন থাকতে পেরেছে। শোষণপ্রক্রিয়ার মধ্যেও ক্রমাগতভাবে জ্ঞানচর্চা আমাদের সভ্যতাকে অবিশ্বাস্য রকম উন্নতির পথে প্রতিনিয়ত উৎকর্ষমণ্ডিত করে তুলছে। আমরা একটির পর একটি ধাপ অতিক্রম করে দ্রুতবেগে জ্ঞানরাজ্যের বিচিত্র পথে এগিয়ে চলেছি।
মানবসভ্যতার এই আধুনিক ধারার সঙ্গে আমরা বাঙালিরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনসূত্রে পরিচিত হয়েছি; কিন্তু একই যাত্রায় ভিন্ন ফলও ফলেছে। ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের শোষণজালে আবদ্ধ করার পাশাপাশি সেই সূত্রে আসা একধরনের আধুনিকতা আমাদের জীবনকে ইতিবাচক-নেতিবাচক উপাদানে একরূপ বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত করেছে, এ কথাও ঠিক। কিন্তু এরই পাশাপাশি রেনেসাঁসীয় আধুনিকতা আমাদের জ্ঞানচর্চার পথে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা আমাদের সমাজকে বিপুলভাবে করেছে আলোড়িত, উজ্জীবিত ও সমৃদ্ধ। মধ্যযুগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধুনিকতার পথে আমাদের তীব্রভাবে বেগবান ও ঋদ্ধ করে তুলেছে, বহু যুগের অন্ধত্ব থেকে আমাদের মুক্তি দিয়েছে, সন্দেহ নেই।
বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহের একটি বিষয়ভিত্তিক খণ্ড ‘বাঙালির দর্শনচিন্তা’র প্রচ্ছদসপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পঠিত লেখাগুলোর নির্বাচনযোগ্যতা নিয়ে সম্মিলিত আলোচনার পর সেটি মনোনয়ন করা হতো। গবেষকদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক থেকে শুরু করে তরুণ লেখক পর্যন্ত। কয়েক বছর ধরে চলে এই বাছাইপর্ব।
বাংলাভাষী অঞ্চলে জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ একঝাঁক উন্নত চিন্তার মহৎ মানব সৃষ্টি হয়েছেন, যাঁরা তাঁদের চিন্তা ও কর্মযজ্ঞ দ্বারা সমগ্র সমাজকে বিপুল জাগরণের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথ সুগম করেছেন। উনিশ ও বিশ শতকীয় এই উন্নত মানবমণ্ডলীর অগ্রসর চিন্তাসমষ্টিকেই আলোচ্য ২০৯ খণ্ডে ধারণ করা হয়েছে। তবে কোনো বিষয়ে জ্ঞানচর্চার পুরোনো ধারাকেও এখানে সমন্বিত ও সংযুক্ত করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো বিষয়ের চিন্তাধারা অপেক্ষাকৃত নবীন হওয়ায় তা পুরো দুই শ বছরকে হয়তো স্পর্শ করতে পারেনি।
বিরাট কর্মযজ্ঞ
বাঙালির দুই শতকের চিন্তাধারার যে ১৬টি বিষয় এখানে বিধৃত হয়েছে সেগুলো হলো: শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত, ভাষা, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, নারী, চলচ্চিত্র ও পরিবেশ। এর মধ্যে ১৩টি বিষয়ের সম্পাদক একজন করে মোট ১৩ জন। বাকি তিনটি বিষয় সম্পাদনায় একাধিক গবেষক যুক্ত হয়েছেন। এক দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০০২-০৩ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এর প্রাথমিক বাছাইপর্ব। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বিষয়ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ লেখা গবেষকদের কাছে সরবরাহ করা হতো, পাশাপাশি গবেষকেরাও উন্নত লেখার সন্ধান দিতেন। গবেষকেরা লেখা পড়ে প্রতিটি রচনার সারসংক্ষেপ লিখে বৈঠকে আসতেন। সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পঠিত লেখাগুলোর নির্বাচনযোগ্যতা নিয়ে সম্মিলিত আলোচনার পর সেটি মনোনয়ন করা হতো। গবেষকদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক থেকে শুরু করে তরুণ লেখক পর্যন্ত। কয়েক বছর ধরে চলে এই বাছাইপর্ব।
তারপর আসে খণ্ড বিভাজন পর্ব। সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি খণ্ডের জন্য সম্পাদকেরা একটি করে সম্পাদকীয় লিখবেন এবং সমগ্র বিষয়ের ওপর লিখবেন একটি বড় আকারের ভূমিকা। এ ছাড়া বাছাইপর্বে প্রতিটি লেখার শুরুতে সারসংক্ষেপ লেখা তো হয়েছিলই। এভাবে খণ্ডগুলো সুবিন্যস্তভাবে সুনির্দিষ্ট রূপ পায়। তবে এখানেই শেষ নয়। শুদ্ধভাবে প্রকাশের লক্ষ্যে পেশাদার প্রুফ রিডারের মাধ্যমে তিনটি প্রুফ সংশোধন করা হয়। তারও পরে খ্যাতিমান বানান বিশেষজ্ঞকে দিয়ে সব বিষয়ের সব খণ্ড পাঠ করিয়ে সংশোধন করিয়ে নেওয়া হয়। এতেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এরপর বিষয়ভিত্তিক সম্পাদকদের দিয়ে আবার ভুলত্রুটি পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া হয়।
বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহের একটি বিষয়ভিত্তিক খণ্ড ‘বাঙালির ইতিহাসচিন্তা’র প্রচ্ছদসিকি শতাব্দীর দীর্ঘ কালপর্ব জুড়ে এক বিপুল কর্মযজ্ঞ শেষে ২০৯ খণ্ডের এ প্রকাশ সমগ্র বাংলার সমৃদ্ধ চিন্তাজগৎকে একত্রীভূত করার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এভাবে শেষ পর্যায়ে এসে কতকগুলো বিষয়ের খণ্ডসংখ্যা নিয়ে প্রধান সম্পাদকের মনে প্রশ্ন দেখা দেয়। অনেক লেখা যথোপযুক্ত মনে না হওয়ায় সেসব বাদ দিয়ে কোনো কোনো বিষয়ের সম্পাদককে দিয়ে খণ্ডসংখ্যা কমানো হয়। যেখানে সম্পাদকের অনুপস্থিতি বা অসম্মতির কারণ ঘটে, সেখানে অন্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে খণ্ডগুলো পুনঃসজ্জিত করা হয়। কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনো সম্পাদকের বাছাই নিয়ে প্রধান সম্পাদকের যদি মনে হয় বাছাই যথার্থ হয়নি; কোনো ক্ষেত্রে মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাদ পড়ে গেছে, সেসব ক্ষেত্রে ভিন্ন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে অগুরুত্বপূর্ণ রচনা বাতিল ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা যোগ করে খণ্ডগুলোকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। অর্থাৎ প্রধান সম্পাদককে শেষ মুহূর্তেও বিশুদ্ধতার প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকা পালন করতে হয়।
চূড়ান্ত বলে কিছু নেই
তবে এ সত্যও স্বীকার্য যে এত সব প্রয়াস–প্রক্রিয়া সত্ত্বেও বাঙালির চিন্তাসমষ্টির এই বিপুল আকর গ্রন্থাবলিকে চূড়ান্ত এবং শুদ্ধতম বলে মান্য করার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। এত সব বিশুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরেও এখানে থেকে যেতে পারে নানা ভুলত্রুটি, সীমাবদ্ধতা বা অসম্পূর্ণতা। এসব দূর করতে হলে পরবর্তী প্রতিটি সংস্করণেই অব্যাহত রাখতে হবে এক নিরন্তর নিষ্ঠাশীল ও বৃহৎ পরিসরের কর্মপ্রচেষ্টা।
তবু মানতে হবে, সিকি শতাব্দীর দীর্ঘ কালপর্ব জুড়ে এক বিপুল কর্মযজ্ঞ শেষে ২০৯ খণ্ডের এ প্রকাশ সমগ্র বাংলার সমৃদ্ধ চিন্তাজগৎকে একত্রীভূত করার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একুশ শতকের সূচনাপর্বে যখন প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে একঝাঁক তরুণ-প্রবীণ গবেষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে কেন্দ্র করে একেকটি লেখার মান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেটিকে পরিহার কিংবা মনোনয়ন করা হতো, তখন এই পরিণতির কথা ভাবাও যায়নি। সেই দিনগুলো ছিল বড় আনন্দের। পাহাড় থেকে ঝরনা নেমে আসার মতো কলকাকলিতে মুখর। সেই ঝরনা যে ক্রমশ নদীতে পরিণত হয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে মিলিত হবে, তা কারও ধারণাতেই ছিল না। পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নেতৃত্বে পুরো কর্মযজ্ঞকে সেদিকেই এগিয়ে দিয়েছে।
বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহের একটি বিষয়ভিত্তিক খণ্ড ‘বাঙালির নারীচিন্তা’র প্রচ্ছদএখানে সংকলিত জাতির শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের সেরা রচনাসমূহ জাতীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রধানত দুই কারণে। প্রথমত, তা আমাদের সমগ্র জাতির জাগতিক ও আত্মিক উন্নতি সাধনের ক্ষেত্রে পালন করবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দ্বিতীয়ত, এই রচনাসমষ্টি আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অপরিমিত অভিমুখ উন্মুক্ত করবে
জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ
আমরা বিচিত্র বিষয়কেন্দ্রিক দুই শতকীয় এই চিন্তাসমষ্টিকে একত্রে পাচ্ছি, এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি ঘোষণা করছে রেনেসাঁস-পরিস্রুত বাঙালি চিন্তাবিদদের নিষ্ঠবান মননশীল শক্তিরও এক বৃহত্তর বহিঃপ্রকাশ। এটি হয়ে উঠেছে ওই সব বিষয়ের প্রকৃত আকরগ্রন্থ। বাঙালি মনীষীরা রেনেসাঁসের ধারায় যে উন্নত ও গভীর চিন্তা দ্বারা সমগ্র জাতির মননভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন, তা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে এক বিপুল সম্পদের ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। আমরা আমাদের সমাজকে অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অপসংস্কৃতির অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করে যদি একটি জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত রূপ দান করতে চাই, তাহলে সে ক্ষেত্রে উন্নত চিন্তার ধারক মনীষীদের রচনাসমৃদ্ধ এই ২০৯ খণ্ডের সংকলন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এখানে সংকলিত জাতির শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের সেরা রচনাসমূহ জাতীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রধানত দুই কারণে। প্রথমত, তা আমাদের সমগ্র জাতির জাগতিক ও আত্মিক উন্নতি সাধনের ক্ষেত্রে পালন করবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দ্বিতীয়ত, এই রচনাসমষ্টি আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য অপরিমিত অভিমুখ উন্মুক্ত করবে, যা বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের যেমন অসংখ্য দ্বার উন্মোচন করবে, তেমনি উদ্ঘাটন করবে জাতীয় জীবনের বহুবিধ অগণিত সত্য, যে সত্যের পথ ধরে একটি কল্যাণকর সহনশীল পরমতসহিষ্ণু জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে।
বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহের একটি বিষয়ভিত্তিক খণ্ড ‘বাঙালির ধর্মচিন্তা’র প্রচ্ছদআমাদের পরম সৌভাগ্য যে মুক্তবুদ্ধির প্রেরণায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দুই শ বছরের অতীত যে উন্নত নিষ্ঠাশীল সমৃদ্ধির ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা আমাদের ভবিষ্যতের জ্ঞান অনুশীলনের উন্নততর ধারা সম্বন্ধেও অত্যন্ত আশাবাদী করে তোলে।
একুশ শতকে বিশ্বের জ্ঞানচর্চা সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম নানা ডিসিপ্লিনে বিভক্ত হয়ে ক্রমাগতভাবে বিস্তৃতি ও গভীরতা লাভ করছে। সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের মননশীলতাকে উন্নত করতে হলে, পারম্পর্য রক্ষা করে যথার্থ পথে অগ্রসর হতে হলে, এই ২০৯ খণ্ডের সংকলন নিঃসন্দেহে একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এটি এমন এক উদ্যোগ, যা আমাদের জ্ঞানানুশীলনের অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ মেলবন্ধন সৃষ্টি করবে। আমরা তো জানি একটি সমৃদ্ধ অতীতই একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের নির্মাণ সুনিশ্চিত করে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে মুক্তবুদ্ধির প্রেরণায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দুই শ বছরের অতীত যে উন্নত নিষ্ঠাশীল সমৃদ্ধির ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা আমাদের ভবিষ্যতের জ্ঞান অনুশীলনের উন্নততর ধারা সম্বন্ধেও অত্যন্ত আশাবাদী করে তোলে। এ কারণেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশিত ২০৯ খণ্ডের ‘বাঙালির চিন্তামূলক রচনা সংগ্রহ’–এর বহুল প্রচার, পঠন ও ব্যবহার একান্তভাবে কামনা করি।
সৈয়দ আজিজুল হক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়