১৫ বছরে শিশুনিকেতন: শৈশবের আলোয় এক দীর্ঘ পথচলার পুনর্মিলন
· Prothom Alo

‘একটি শিশুর শিক্ষার আলো, একটি জাতির আশা,
শিশুনিকেতন ছড়িয়ে দিক মানবতার ভালোবাসা।’
Visit asg-reflektory.pl for more information.
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত শিশুনিকেতন। পথচলার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে থ্রিএম (মিট, মিংগল ও মেক মেমোরিজ) অনুসরণ করে গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো শিশুনিকেতনের প্রথম রিইউনিয়ন। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পর একই ছাদের নিচে মিলিত হলেন শিশুনিকেতনের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক, ফ্যাসিলিটেটর, স্বেচ্ছাসেবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। দিনটি নিছক একটি পুনর্মিলন নয়; বরং একটি স্বপ্নের ১৫ বছরের পথচলাকে ফিরে দেখার দিন।
‘এসো গড়ি শিশুনিকেতন হয়ে শিশুর অধিকার সচেতন’—এই স্লোগানে শিশুনিকেতন ২০১২ সালের ৩ আগস্ট অধ্যাপক মুহা. জুলফিকার আলী ইসলাম স্যারের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন অগ্রণী ভূমিকা রাখেন ৪৭, ৪৮, ৪৯ ও ৫০তম ব্যাচের উদ্যমী শিক্ষার্থীরা। তাঁরা নিজ হাতে মাটি কেটে, বাঁশ ও অর্থ সংগ্রহ করে কাঠামো দাঁড় করান। আর এ ধারা অব্যাহত রেখেছেন পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।
শিশুনিকেতন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর পাশের রেললাইনের ধারে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করা। এটি হয়ে ওঠে শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক বিকাশের একটি উন্মুক্ত পরিসর। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি নীরব বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
শিশুনিকেতনের বিশেষত্ব এখানেই, এটি কেবল শিশুদের পড়াশোনার জায়গা ছিল না; এটি ছিল স্বপ্ন দেখার জায়গা। যেসব শিশুর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় টিকে থাকা ছিল কঠিন, তাদের আত্মবিশ্বাস, মূল্যবোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সামাজিকতা ও নিজের অধিকার সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আর এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তরুণ শিক্ষার্থীরাও শ্রেণিকক্ষের সমাজবিজ্ঞানকে বাস্তব জীবনের মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
তবে এর পেছনের কাজটি শুধু একটি সাধারণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে শুরু হয়নি। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইনসিডিন বাংলাদেশের কাছ থেকে শিশু অধিকার ও ইউএনসিআরসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নেন। তাঁরা সোশিওলজি ইয়ুথ গ্রুপ (এসওয়াইজি) গঠন করেন এবং এরপর শিশুনিকেতন নামে একটি অনানুষ্ঠানিক বা স্বেচ্ছাসেবী স্কুল চালু করেন। পরবর্তী সময় রাজশাহী ইউনিভার্সিটি সোশিওলজি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (আরইউএসএএ) শিশুনিকেতনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়।
শিশুনিকেতনের দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন ব্যক্তি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ও দেশি–বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। নানা সময়ে শিশুদের জন্য শিক্ষা উপকরণ, বই-খাতা, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসার সহায়তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রদানের মাধ্যমে তারা শিশুনিকেতনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি অনেক ব্যক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত সহযোগিতাই শিশুনিকেতনের পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করেছে।
এই ১৫ বছরের পথচলায় অনেক মুখ এসেছে, অনেক মুখ বিদায় নিয়েছে। কেউ ছিলেন শিক্ষক, কেউ ফ্যাসিলিটেটর, কেউ স্বেচ্ছাসেবক, কেউবা ছিলেন সেই ছোট্ট শিক্ষার্থী, যার চোখে একদিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন জ্বলে উঠেছিল। সময়ের স্রোতে সবাই নিজ নিজ জীবনে ছড়িয়ে গেলেও শিশুনিকেতন তাদের স্মৃতির একটি অভিন্ন ঠিকানা হয়ে থেকেছে। শুধু কাঠামো ও পরিচালনায় পরিবর্তন এসেছে।
প্রথম রিইউনিয়ন সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে আবারও কাছে টেনে এনেছে। পুরোনো পরিচিত মুখ, একসঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি, শিশুদের হাসি, শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সেই দিনগুলো যেন আজ নতুন করে ফিরে এসেছে স্মৃতিচারণায়। কেউ হয়তো এখন পেশাজীবনে প্রতিষ্ঠিত, কেউ গবেষণায়, কেউ শিক্ষকতায়, কেউ দেশের বাইরে, কিন্তু শিশুনিকেতনের স্মৃতিতে সবাই যেন আবার সেই আগের মানুষটি।
১৫ বছর পূর্তি তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স পূর্ণ হওয়ার গল্প নয়। এটি প্রান্তিক শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর গল্প। এটি প্রমাণ করে, একটি ছোট উদ্যোগও সময়ের সঙ্গে বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সমাজবিজ্ঞান যেখানে সমাজকে বোঝার শিক্ষা দেয়, শিশুনিকেতন সেখানে সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগের একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
আজকের এই রিইউনিয়ন নতুন করে সেই দায়বদ্ধতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। অতীতের অর্জনকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের পথচলার প্রত্যয় নিয়ে শিশুনিকেতন আরও অনেক শিশুর জীবনে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেবে—এই প্রত্যাশা থাকুক ১৫ বছর পূর্তির দিনে।
*লেখক: সবুজ মোল্যাহ, সমাজবিজ্ঞান, ৫৯তম ব্যাচ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়