কথা বলার আগে একজন মুমিন যে ৮ বিষয়ে খেয়াল রাখেন

· Prothom Alo

মানুষের ব্যক্তিত্ব, চিন্তা ও মানসিক রুচির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে তার কথাবার্তায়। একজন মানুষ কীভাবে কথা বলে, শব্দ নির্বাচনে কতটা সতর্ক থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় আলাপে কতটা সংযম বজায় রাখে, তা দিয়েই নির্ধারিত হয় তার আত্মিক গভীরতা ও চরিত্রের মান।

ইসলাম তাই মানুষের মুখনিঃসৃত ভাষাকে নিছক কোনো সাধারণ অভ্যাস হিসেবে দেখেনি; বরং একে সরাসরি ইমানি দায়িত্ব ও আমলনামার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করেছে।

Visit esporist.com for more information.

পবিত্র কোরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) তার পাশেই নিয়োজিত থাকে।’ (সুরা কাফ, আয়াত: ১৮)

কথা বলার ক্ষেত্রে মুমিনের মৌলিক আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা স্পষ্ট করে রাসুল (সা.) এক অনন্য মূলনীতি ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন উত্তম ও কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

এই নীতিমালার আলোকে কথা বলার সময় প্রতিটি মুমিনের আটটি জরুরি বিষয় খেয়াল রাখা আবশ্যক।

সব সত্য কথা সব সময় বা সব স্থানে উচ্চারণ করা বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। একটি কথা সত্য হলেও তা যদি সময়োপযোগী না হয়, কারও অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি ডেকে আনে।

১. তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা

মুমিনের জবান কখনো অসত্য, বানোয়াট কিংবা অর্ধসত্যের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। কোনো কথা শোনামাত্রই তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে প্রচার করা মিথ্যাচারের শামিল।

আল্লাহ–তাআলা সত্য ও সুদৃঢ় ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সত্য কথা বলো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৭০)

২. অনর্থক আলাপ বর্জন

সব সত্য কথা সব সময় বা সব স্থানে উচ্চারণ করা বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়। একটি কথা সত্য হলেও তা যদি সময়োপযোগী না হয়, কারও অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি ডেকে আনে কিংবা সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত ফিতনা সৃষ্টি করে, তবে সেখানে সংযম বজায় রাখাই ইসলামের দাবি।

মুমিন সব সময় নিজেকে প্রশ্ন করবে—এই কথাটি বলা কি ধর্ম বা দুনিয়ার কোনো উপকারে আসবে?

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এমন বিষয় সম্পূর্ণ বর্জন করা, যা তার জন্য অর্থহীন বা অনর্থক।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)

কোরআনে যেভাবে নামাজের কথা বলা হয়েছে

৩. অন্যের সম্মান রক্ষা

কৌতুক বা হালকা আলাপের ছলেও কাউকে খাটো করা, কারও শারীরিক ত্রুটি নিয়ে হাসাহাসি করা কিংবা কাউকে এমন কোনো উপনামে ডাকা, যা সে অপছন্দ করে—ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ পারস্পরিক সম্মান রক্ষার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হচ্ছে, সে উপহাসকারীর চেয়ে আল্লাহর কাছে উত্তম হতে পারে...এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)

৪. গিবত ও অপবাদ থেকে আত্মরক্ষা

কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা দুর্বলতার আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে—ইসলামি শরিয়তে তাকে ‘গিবত’ বা পরনিন্দা বলা হয়। এমনকি বিষয়টি যদি সত্যিও হয়, তবুও তা অন্যের সামনে প্রকাশ করা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)।

আল্লাহ–তাআলা গিবতের বীভৎসতা তুলে ধরে বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কারও গিবত না করে। তোমাদের কেউ কি নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করো...।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

আর যদি কারও নামে এমন কোনো দোষ প্রচার করা হয় যা তার মধ্যে নেই, তবে তা হবে জঘন্য অপবাদ, যার শাস্তি আরও কঠিন।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪কুস্তিতে কাউকে আছড়ে ফেলে দেওয়া ব্যক্তি প্রকৃত শক্তিশালী নয়; বরং প্রকৃত বীর ও শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

৫. ক্রোধের মুহূর্তে বাক্যসংযম

মানুষের জীবনের বহু সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে যায় রাগের মাথায় মুখ ফসকে বের হওয়া কয়েকটি অপ্রীতিকর বাক্যের কারণে। রাগের উত্তেজনায় মানুষ অনেক সময় এমন চরম কথা বলে ফেলে, যার জন্য সারা জীবন অনুশোচনায় পুড়তে হয়। তাই রাগের সময় মৌনতা অবলম্বন করা খাঁটি বীরত্বের লক্ষণ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কুস্তিতে কাউকে আছড়ে ফেলে দেওয়া ব্যক্তি প্রকৃত শক্তিশালী নয়; বরং প্রকৃত বীর ও শক্তিশালী সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

৬. ভাষায় মার্জিত রূপ

হক ও সত্য কথা কঠোর ও কর্কশ ভাষায় না বলে নম্র ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা ইসলামের অনুপম শিষ্টাচার।

এমনকি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ জালেম ফেরাউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সময়ও আল্লাহ–তাআলা মুসা ও হারুনকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নরম ও কোমল ভাষায় কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪)

হকপন্থী মানুষের ভাষাও হবে শালীন, প্রজ্ঞাময় ও হৃদয়ে আলোড়ন তোলার মতো বিনম্র।

ভাষা ও সাহিত্যচর্চা ইবাদত

৭. অঙ্গীকার রক্ষা

কথা দেওয়া মুমিনের কাছে এক পরম আমানত। মুখে কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা সাধ্যমতো পূরণ করার আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে; কারণ কথার মূল্য হারিয়ে গেলে বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩৪)।

কথার খেলাপ করাকে হাদিসে মোনাফেকের স্বভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মোনাফেকের নিদর্শন তিনটি: যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয়, তাতে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)

কথা মূলত মানবদেহের একটি তরবারি; যা দিয়ে যেমন কল্যাণ ও শান্তির পরিবেশ তৈরি করা যায়, তেমনি অসাবধান ব্যবহারে নিজের ও অন্যের জীবনকে বিষিয়ে তোলা যায়।

৮. অনুমাননির্ভর কথা প্রচার না করা

সমাজে অনেকেই ‘শুনেছি’, ‘লোকে বলছে’ কিংবা ‘মনে হয় অমুক এমন করেছে’—এ–জাতীয় উড়ো কথার ওপর ভিত্তি করে অন্যের চরিত্র হনন করে। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে কোনো পোস্ট বা খবর যাচাই ছাড়া শেয়ার করাও এই ব্যাধির অংশ।

গুজবের এই বিস্তার রোধে রাসুল (সা.) এক অকাট্য নীতি দিয়েছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা কিছু শোনে, তা-ই অন্যের কাছে বলে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)

কথা মূলত মানবদেহের একটি তরবারি; যা দিয়ে যেমন কল্যাণ ও শান্তির পরিবেশ তৈরি করা যায়, তেমনি অসাবধান ব্যবহারে নিজের ও অন্যের জীবনকে বিষিয়ে তোলা যায়।

কথা বলার ক্ষেত্রে মুমিনের সামনে পথ শুধু দুটি—হয় সত্য, ইনসাফ ও কল্যাণের পক্ষে নির্ভীক ও সুন্দর কথা বলবে; নয়তো নীরব থেকে নিজেকে ও সমাজকে নিরাপদ রাখবে।

নবীজি (সা.) তাই ঘোষণা করেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট থেকে অপর মুসলমান সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)

কোরআনে যেভাবে নামাজের কথা বলা হয়েছে

Read full story at source