পাকা কলা কি সত্যিই ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে? গবেষণা কী বলছে

· Prothom Alo

কলায় থাকা বিভিন্ন জৈবসক্রিয় যৌগ পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমাতে এবং কোষের নিয়ন্ত্রিত মৃত্যুর প্রক্রিয়া বা অ্যাপোপটোসিস সক্রিয় করতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় স্তন, কোলোরেক্টাল, যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও মুখগহ্বরের ক্যানসারসহ কয়েক ধরনের ক্যানসার মডেলে কলার নির্যাস ও এর কিছু উপাদানের সম্ভাব্য কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে।

সকালের নাশতায় একটি কলা, ব্যায়ামের আগে দ্রুত শক্তির জন্য একটি কলা কিংবা বিকেলের ক্ষুধায় হাতের কাছে থাকা সহজলভ্য এই ফল—প্রতিদিনের খাবারে কলার উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে আলাদা করে এর দিকে তাকানোর প্রয়োজনও হয় না। তবে পরিচিত এই ফল নিয়েই যখন গবেষণাগারে ক্যানসার কোষ, কোষের বৃদ্ধি এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার মতো বিষয় নিয়ে পরীক্ষা চলছে, তখন কলাকে নতুন করে দেখার কৌতূহল তৈরি হয়।

Visit betsport24.es for more information.

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কলায় থাকা বিভিন্ন জৈবসক্রিয় যৌগ পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমাতে এবং কোষের নিয়ন্ত্রিত মৃত্যুর প্রক্রিয়া বা অ্যাপোপটোসিস সক্রিয় করতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় স্তন, কোলোরেক্টাল, যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও মুখগহ্বরের ক্যানসারসহ কয়েক ধরনের ক্যানসার মডেলে কলার নির্যাস ও এর কিছু উপাদানের সম্ভাব্য কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছে।

তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য। পরীক্ষাগারে কোনো ফলের নির্যাস ক্যানসার কোষের ওপর প্রভাব ফেলেছে মানেই মানুষের শরীরে সেই ফল খেলে ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করা যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। গবেষণাগারে ব্যবহৃত নির্যাসের পরিমাণ ও উপাদানের ঘনত্বের সঙ্গে খাবার হিসেবে গ্রহণ করা কলার পরিমাণ এক নয়। মানুষের ওপর বড় পরিসরের ও সুনিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল গবেষণাও এখনো প্রয়োজন।

কলার ভেতরে কী এমন আছে?

কলা শুধু কার্বোহাইড্রেট ও পটাশিয়ামের উৎস নয়। এতে ফেনলিক যৌগ, ক্যারোটিনয়েড, ফাইটোস্টেরলসহ বিভিন্ন জৈবসক্রিয় উপাদান রয়েছে। এসব উপাদানের কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম এবং শরীরের বিভিন্ন কোষীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

একটি গবেষণায় কলার শাঁস থেকে তৈরি বিভিন্ন নির্যাস মানুষের অগ্ন্যাশয় ও ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসারের কোষের ওপর পরীক্ষা করা হয়। নির্দিষ্ট একটি নির্যাস ওই কোষগুলোর বৃদ্ধি কমানোর পাশাপাশি অ্যাপোপটোসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরিবর্তন ঘটায়। তবে এটিও ছিল কোষভিত্তিক গবেষণা; মানুষের শরীরে কলা খাওয়ার প্রভাব নিয়ে করা কোনো পরীক্ষা নয়।

অ্যাপোপটোসিস আসলে কী?

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ চিরকাল বেঁচে থাকে না। কোনো কোষের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বা তাতে গুরুতর ক্ষতি হলে শরীর নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটিকে সরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটিই অ্যাপোপটোসিস বা নিয়ন্ত্রিত কোষমৃত্যু।
ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনেক সময় বিঘ্নিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কোষ প্রয়োজনের পরও টিকে থাকতে পারে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে পারে। তাই কোনো উপাদান যদি পরীক্ষাগারে ক্যানসার কোষের অ্যাপোপটোসিস সক্রিয় করতে পারে, সেটি গবেষকদের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।

তবে গবেষণাগারে পাওয়া এই ফলকে সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় প্রয়োগ করার আগে আরও অনেক ধাপের গবেষণা প্রয়োজন। কোষে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলেই তা যে মানুষের শরীরেও একইভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

পাকার সঙ্গে কি বদলায় কলার বৈশিষ্ট্য?

কলা কাঁচা থেকে পাকার সঙ্গে সঙ্গে শুধু রং, স্বাদ ও গঠনই বদলায় না, এর রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন আসে। কলার বিভিন্ন পাকার পর্যায়ে জৈবসক্রিয় উপাদানের পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

এ নিয়ে প্রাণীভিত্তিক কিছু গবেষণায়ও আকর্ষণীয় ফল পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় পাকা কলার প্রস্তুতি ইঁদুরের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। অন্য একটি গবেষণায় পাকা কলার লেকটিন ইঁদুরের কিছু সাইটোকাইনের মাত্রা পরিবর্তন করেছে, যার মধ্যে টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর আলফাও ছিল।

টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর বা টিএনএফ শরীরের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া ও প্রদাহের সঙ্গে জড়িত একটি সিগন্যালিং প্রোটিন। ক্যানসার জীববিজ্ঞানে এর ভূমিকা জটিল। কিছু পরিস্থিতিতে এটি টিউমারবিরোধী প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, আবার অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত টিএনএফ বিভিন্ন রোগপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই শুধু টিএনএফের মাত্রা বেড়েছে বলেই কোনো খাবার ক্যানসার প্রতিরোধ করে—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

তাহলে বেশি পাকা কলা কি বেশি উপকারী?

গবেষণায় পাকার সঙ্গে কলার কিছু জৈবসক্রিয় বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়েছে। প্রাণী ও পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণাতেও কিছু সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু মানুষের খাদ্যাভ্যাসে কোন পর্যায়ের পাকা কলা ক্যানসারের ঝুঁকিতে কী প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্রমাণ এখনো নেই।

তাই শুধু ক্যানসার প্রতিরোধের আশায় অতিরিক্ত পাকা কলা খাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কলা তাহলে খাবেন কেন?

ক্যানসারের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও কলা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখার মতো একটি পুষ্টিকর ফল। এতে কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। সহজে বহন করা যায়, রান্নার প্রয়োজন হয় না এবং ব্যায়ামের আগে বা পরে দ্রুত কিছু খাওয়ার প্রয়োজন হলে এটি ব্যবহারিক একটি বিকল্প।

আমাদের প্রতিদিনের খাবারে থাকা অনেক পরিচিত উপাদান নিয়েই বিজ্ঞানীরা এখন নতুন করে গবেষণা করছেন। এসব খাবারের মধ্যে থাকা জৈবসক্রিয় উপাদান শরীরে কীভাবে কাজ করে, কোন মাত্রায় তার প্রভাব দেখা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কোনো স্বাস্থ্যগত ভূমিকা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চলছে নানা গবেষণা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কলাকে ক্যানসারের ওষুধ বা চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। বর্তমান গবেষণা মূলত সম্ভাব্য জৈবিক কার্যক্রমের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানুষের শরীরে ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় কলা কিংবা এর নির্দিষ্ট উপাদানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

তবু এই গবেষণার একটি দিক নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। আমাদের রান্নাঘরের একেবারে পরিচিত একটি ফলের ভেতরেও রয়েছে নানা জৈবসক্রিয় উপাদান, যেগুলোকে বিজ্ঞান এখনো ধীরে ধীরে বুঝে উঠছে। প্রতিদিনের একটি সাধারণ কলা তাই শুধু সহজলভ্য খাবারই নয়, গবেষণার নতুন প্রশ্নেরও একটি আকর্ষণীয় বিষয়।

ছবি: পেকজেলসডটকম

Read full story at source