শূন্যতা, সৌন্দর্য ও বিশ্বাস: হিলাল বাইদারোভের সুফি সিনেমা

· Prothom Alo

হিলাল বাইদারোভ আজারবাইজানি আর্ট ফিল্মের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তাঁর শুরুর দিকের ছবিগুলোতে মা-ছেলের সম্পর্ক, গ্রামীণ নীরবতা, স্মৃতি ও অনুপস্থিতি ধ্যানমগ্ন চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সারমোন ট্রিলজি যুদ্ধ, মৃত্যু, প্রকৃতি, বিশ্বাস ও শূন্যতাকে বিমূর্ত, মিথনির্ভর ও আধ্যাত্মিক ভাষায় রূপ দেয়। ৩৮তম টোকিও চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালে বাইদারোভের সঙ্গে এ আলাপচারিতা, যেখানে ‘সারমোন টু দি ভয়েড’ ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সাক্ষাৎকারে নির্মাতা তাঁর চলচ্চিত্রভাবনা, শব্দ ও ছবির সম্পর্ক, সুফি উত্তরাধিকার, সোভিয়েত নির্মাতাদের প্রভাব, পিতার স্মৃতি ও আসন্ন কাজ নিয়ে কথা বলেছেন। টোকিওতে এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন মঈনুল শাওন

Visit raccoongame.org for more information.

সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বিশ্বচলচ্চিত্রে শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে মধ্য এশীয় দেশগুলোর চলচ্চিত্র। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তানের মতো দেশগুলোর চলচ্চিত্রে দেখা যায় ইতিহাসের ক্ষত, যুদ্ধ-পরবর্তী স্মৃতি, আত্মপরিচয়, ভাষা, পরিবার, ধর্মীয় ও লোকজ উত্তরাধিকার এবং আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীন জীবনবোধের সংঘাত। এই চলচ্চিত্রগুলোর গল্প, অভিনয় ও নির্মাণে একধরনের অদ্ভুত সারল্য রয়েছে, যা নতুন এক চলচ্চিত্রভাষা হিসেবে দৃষ্টি কাড়ছে বিশ্বব্যাপী।

এ প্রেক্ষাপটে হিলাল বাইদারোভ আজারবাইজানি আর্ট ফিল্মের এক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর। বাকুতে জন্ম নেওয়া বাইদারোভ কম্পিউটারবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে সারায়েভো ফিল্ম একাডেমিতে হাঙ্গেরির বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার বেলা তারের অধীন চলচ্চিত্র পরিচালনা শেখেন। তাঁর শুরুর দিকের ছবিগুলোতে মা-ছেলের সম্পর্ক, গ্রামীণ নীরবতা, স্মৃতি ও অনুপস্থিতি ধ্যানমগ্ন চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সারমোন ট্রিলজি যুদ্ধ, মৃত্যু, প্রকৃতি, বিশ্বাস ও শূন্যতাকে বিমূর্ত, মিথনির্ভর ও আধ্যাত্মিক ভাষায় রূপ দেয়।

‘সারমোন’ ট্রিলজি

‘সারমোন টু দি ফিশ’–এর পোস্টার

এই ট্রিলজির প্রথম ছবি ‘সারমোন টু দ্য ফিস’ (২০২২)-এ যুদ্ধফেরত দাভুদ, তার বোন সুরা, একটি কুকুর, শূন্যতা আর দৈহিক ক্ষয়ের আবহে তুলে ধরা হয় যুদ্ধ-পরবর্তী ট্রমা। এর পরের ছবি ‘সারমোন টু দ্য বার্ডস’ (২০২৩)-এ দেখা যায়, দাভুদ ও সুরা নামের দুই প্রেমিক-প্রেমিকা বন-পাহাড়ের অবরুদ্ধ স্বপ্নময় জগতে এক ‘শিকারি’র জন্য অনন্ত অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এখানে যুদ্ধের ক্ষত রূপ নেয় নিয়তি, অপেক্ষা, প্রেম ও সম্ভাব্য মুক্তির রূপকে। সর্বশেষ ছবি ‘সারমোন টু দ্য ভয়েড’ (২০২৫)-এ শাহ ইসমাইল নামের এক যুবক ‘জীবনের অমৃতের’ সন্ধানে যাত্রা করে, পৃথিবী যখন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনন্ত শূন্যতা, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের গভীর অনুসন্ধানে পৌঁছায় সে। সুস্পষ্ট কোনো কাহিনিকে পরিহার করে, অনবদ্য সিনেমাটোগ্রাফি এবং গ্রাফিকসের সংমিশ্রণে এই যাত্রাকে বিস্ময়কর সুন্দর সব চিত্রকল্পে ধারণ করেছেন বাইদারোভ। যৌক্তিক উপলব্ধির চেয়ে দৃশ্যগতভাবে নিমগ্ন হয়ে এই চলচ্চিত্র উপভোগ করার দাবি রাখে।

হিলাল বাইদারোভ

টোকিও চলচ্চিত্র উৎসবে হিলাল বাইদারোভ অনেকটা নিয়মিত উপস্থিতি। সর্বশেষ দুটি ছবি প্রদর্শিত হওয়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালে তাঁর ‘ক্রেন লেন্টার্ন’ চলচ্চিত্রটি উৎসবে সেরা শৈল্পিক অবদানের পুরস্কার পায়। ৩৮তম টোকিও চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালে বাইদারোভের সঙ্গে আমার আলাপ হয় তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে, যেখানে ‘সারমোন টু দি ভয়েড’ ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সাক্ষাৎকারে নির্মাতা তাঁর চলচ্চিত্রভাবনা, শব্দ ও ছবির সম্পর্ক, সুফি উত্তরাধিকার, সোভিয়েত নির্মাতাদের প্রভাব, পিতার স্মৃতি ও আসন্ন কাজ নিয়ে কথা বলেছেন।

মঈনুল শাওন: গত কয়েক বছরে মধ্য এশীয় চলচ্চিত্র আমাদের সম্মুখে এক নতুন চিত্রভাষা হিসেবে ধরা দিয়েছে। আপনার সারমোন ট্রিলজিতেও এটি লক্ষণীয়। তবে এ ক্ষেত্রে বিষয়গত ও কারিগরি—দুটি দিকই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সর্বশেষ ছবি ‘সারমোন টু দ্য ভয়েড’ (২০২৫)-এ আপনার সৃষ্ট ইমেজ অত্যন্ত শক্তিশালী। এবার সেখানে কয়েকটি রঙের প্রাধান্যও দেখা যায়। আবার ভয়েসওভারে সারমোন বা বয়ানও ভীষণ কাব্যিক। চলচ্চিত্রে ছবি ও কথার এই সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন বা নির্মাণ করেন?

হিলাল বাইদারোভ: প্রশ্নটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি এখানে আরেকটি উপাদান যোগ করব—‘শব্দ’। আমি লোকেশনের বাস্তব শব্দ ব্যবহার করি না ছবির সব শব্দ নতুন করে তৈরি করি। আমি চিত্রকলা, সাহিত্য ও সংগীত ভালোবাসি অভিনয় আমার কাছে প্রধান নয়। অভিনেতাদের বলি, শুধু নিজ অবস্থানে থাকুন। আমার মা প্রায় সব ছবিতে থাকেন, তাকেও বলি, ‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকো, কিছু কোরো না।’

আমার কাছে শব্দ, চিত্র ও কথা—তিনটিই স্বাধীন জীবন্ত সত্তা। শব্দ বা অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড কখনো বাস্তব থেকে নেওয়া নয় সংগীতের মতো করে স্টুডিওতে নির্মিত। টেক্সট বা কথাও ছবির অধীন নয়। আমি আগে ইমেজ নির্মাণ করি। এরপর আসে শব্দ ও কথা। আলাদাভাবে নির্মিত এই উপাদানগুলো শেষ পর্যন্ত এক বিন্দুতে মিললেও কেউ কারও অধীন নয়। শিল্প তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রতিটি উপাদান নিজের স্বাধীন শিল্পসত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে।

‘সারমোন টু দি ফিশ’–এর একটি দৃশ্য

মঈনুল শাওন: এই স্বাধীন ইমেজ, শব্দ ও ভাষা মিলে শেষ পর্যন্ত কী তৈরি করে, বিশেষত যখন আপনি শূন্যতার উদ্দেশে এক ধরনের সারমোন বা বাণী ছুড়ে দিচ্ছেন?

হিলাল বাইদারোভ: ফর্ম আমার কাছে বিশ্বাসের মতো। কোনো ইমেজ যদি সিনেম্যাটিক না হয়, আমি তাকে সিনেমা বলতে পারি না। বাস্তবের শব্দ তুলে এনে বসিয়ে দিলে সেটি শিল্প হয় না। সিনেমা কোনো রিপোর্ট, ইউটিউব বা টেলিভিশনের বাস্তবতা নয় এটি এমন এক শিল্প, যা মানুষকে অন্য স্তরে সংযুক্ত করতে পারে। চারপাশের পৃথিবী আমাদের কেবলই নিচের দিকে নামায়, শিল্প অন্তত আমাদের অসীমের দিকে ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে।

তাই শব্দকে সংগীতের মতো, ভাষাকে কবিতার মতো নির্মাণ করতে হয়। সাধারণ কথাবার্তা আমি ব্যবহার করতে পারি না আমার সিনেমার ভাষা অন্য ধরনের দূরত্ব চায়—দর্শক ও সত্যের মধ্যবর্তী এক শ্রদ্ধাপূর্ণ দূরত্ব। শিল্প, কবিতা ও সংগীতের ভেতরে একটি জাগ্রত সত্তা আছে আপনি যদি তাকে সম্মান না করেন, সে কখনো আপনার কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করবে না।

আমার কাছে শব্দ, চিত্র ও কথা—তিনটিই স্বাধীন জীবন্ত সত্তা। শব্দ বা অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড কখনো বাস্তব থেকে নেওয়া নয় সংগীতের মতো করে স্টুডিওতে নির্মিত। টেক্সট বা কথাও ছবির অধীন নয়। আমি আগে ইমেজ নির্মাণ করি। এরপর আসে শব্দ ও কথা। আলাদাভাবে নির্মিত এই উপাদানগুলো শেষ পর্যন্ত এক বিন্দুতে মিললেও কেউ কারও অধীন নয়। শিল্প তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রতিটি উপাদান নিজের স্বাধীন শিল্পসত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে।

মঈনুল শাওন: আপনার চলচ্চিত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘শিল্প আগে, ধারণা পরে।’ তবে আপনি এটি আধ্যাত্মিক যাত্রার আদলে তুলে ধরেছেন। অন্যদিক থেকে দেখলে, এটি বস্তু থেকে ধারণার জন্মের মতো মার্ক্সীয় দার্শনিক অবস্থানের সাথেও মিলে যায়। কিন্তু আপনি মনে করেন, ব্যক্তির মুক্তি আসবে শিল্পের ভেতর দিয়ে। তাহলে সামগ্রিক সমাজের মুক্তির উপায় কী? চলচ্চিত্রকার হিসেবে এতে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

হিলাল বাইদারোভ: অনেক শিল্পীর বড় বড় ধারণা আছে তারা মেলানকোলি, রহস্য বা কালোত্তীর্ণ—এসব সুন্দর কথা বলেন। অনেক একাডেমিক আছেন, তাঁরা হেগেল, কান্ট, নিৎশের কথা বলেন। কিন্তু যখন আমি তাদের কাজ দেখি, তখন মনে হয়, ভেতরটা ফাঁপা। সেখানে ধারণা আছে, কিন্তু শিল্প নেই। আমার কাছে আগে সৃষ্টি, পরে বিশ্লেষণ। শিল্পের ক্ষুদ্রতম অংশও ধারণার বিশালতম অংশের চেয়ে বড়। কারণ, সত্যিকারের ধারণা শিল্প থেকেই জন্মায়। অন্যদিকে শিল্পী হতে হলে হৃদয়কে একধরনের ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিতে হয় নইলে কেবল শেখা জিনিসেরই পুনরাবৃত্তি হয়।

মঈনুল শাওন: আপনার কথায় সুফিবাদের আভাস পাই। কাব্যিক ইমেজ, কথার ছন্দ কিংবা সুপ্রিম বিইং (ঈশ্বর, প্রেম, অথবা আত্মচৈতন্য)-এর ধারণায় এটি ফিরে ফিরে আসে। বাংলাদেশেও সুফি ঐতিহ্য আছে। আপনার চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ইসমাইল শাহের মতো আমাদেরও আছেন লালন শাহ, যিনি একজন দার্শনিক-গায়ক। আপনার আজারবাইজানি ঐতিহ্যেও কি তাহলে এই সুফি প্রভাব সক্রিয়?

হিলাল বাইদারোভ: আমি সচেতনভাবে সুফি কিছু বলতে চাই না। কিন্তু যে সাহিত্য, কবিতা, রং ও বিশ্বাসের ভেতর বড় হয়েছি, সেগুলো আমার মধ্যে আছে। এতে প্রতিবেশী ইরানি সংস্কৃতির শক্তিশালী প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি এই জগতের সঙ্গে বেঁচে আছি। বাইরে থেকে কেউ আমাকে সুফি বলতে পারেন বা মিনিমালিস্ট। কিন্তু আমার কাছে এগুলো স্বাভাবিক। কারণ, আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য ও কবিতাই আমাকে তৈরি করেছে।

‘ইন বিটুইন ডাইং (২০২০)’–এর পোস্টার

মঈনুল শাওন: আপনার শেষ তিনটি ছবিতে ইমেজের বিবর্তন দেখা যায়—বাস্তবতার স্পর্শ থেকে ক্রমে বিমূর্ত, জ্যামিতিক, প্রায় গ্রাফিক চিত্রভাষা। কুকুর, ঘোড়া, পানি—এসবের মধ্যে তারকোভস্কির ছায়া দেখা যায়। আপনি এই ইমেজের ভাষা কীভাবে নির্মাণ করেন?

হিলাল বাইদারোভ: তারকোভস্কি আমার কাছে জন্ম নেওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার। তাঁর ‘স্টকার’ আমার কাছে এ পর্যন্ত নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। তিনি আমাদের সন্ত, সবার সন্ত। তাঁর প্রভাব যদি আমার কাজে থাকে, আমি তাতে আনন্দিত।

অনেক শিল্পীর বড় বড় ধারণা আছে তারা মেলানকোলি, রহস্য বা কালোত্তীর্ণ—এসব সুন্দর কথা বলেন। অনেক একাডেমিক আছেন, তাঁরা হেগেল, কান্ট, নিৎশের কথা বলেন। কিন্তু যখন আমি তাদের কাজ দেখি, তখন মনে হয়, ভেতরটা ফাঁপা। সেখানে ধারণা আছে, কিন্তু শিল্প নেই। আমার কাছে আগে সৃষ্টি, পরে বিশ্লেষণ। শিল্পের ক্ষুদ্রতম অংশও ধারণার বিশালতম অংশের চেয়ে বড়। কারণ, সত্যিকারের ধারণা শিল্প থেকেই জন্মায়। অন্যদিকে শিল্পী হতে হলে হৃদয়কে একধরনের ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিতে হয় নইলে কেবল শেখা জিনিসেরই পুনরাবৃত্তি হয়।

মঈনুল শাওন: কিন্তু সেটি আপনার অরিজিনালিটিকে নাকচ করে না।

হিলাল বাইদারোভ: ধন্যবাদ। এই চলচ্চিত্রের (‘সারমোন টু দ্য ভয়েড’)-এর ইমেজ নিয়ে বলি। এটি বানানোর সময় আমার বয়স ছিল ৩৬। হঠাৎ মনে হয়েছিল, আমি হয়তো শিগগিরই মারা যাব। মরুভূমিতে শুট করছিলাম, আর মনে হচ্ছিল, এটাই হয়তো জীবনের শেষ কাজ। তাই এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা আমার আগের ছবির মতো নয়, অন্য যেকোনো সিনেমার মতোও নয়। ছবিতে পেইন্টিং কিংবা জাদুঘরের মতো অজস্র স্থির ইমেজ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু আমি এমন কিছু দেখাতে চেয়েছিলাম, যা দর্শক আগে কখনো দেখেনি।

মঈনুল শাওন: কিন্তু এই ঝুঁকি বাস্তব, ইমেজ বা ভাষার অবোধ্যতা দর্শকচিত্তকে অস্থির করে তুলতে পারে...

হিলাল বাইদারোভ: আমি জানতাম, ছবিটি হয় ভালোবাসা পাবে, নয় ঘৃণা। যার হৃদয়ে জীবনের অর্থ বোঝার আকাঙ্ক্ষা আছে, সে ছবির সঙ্গে যুক্ত হবে। এ নির্মাণকে বলা যায় প্রার্থনা। হয়তো জীবনের শেষ প্রার্থনা। তাই ছবিটিতে কোনো সময় নেই—শহর-গাড়ি- ভবন কিছুই নেই।

আজকাল আমি শুধু ‘বিশ্বাস’ নিয়ে ভাবি। ঈশ্বর বা পরম সত্তায় বিশ্বাসের কথা বলছি না যেকোনো কিছুতেই বিশ্বাস করার কথা বলছি। শিল্পে বিশ্বাস, সৌন্দর্যে বিশ্বাস। বাইরে দেখি, যারা টাকা ভালোবাসে, তারাও আসলে টাকায় বিশ্বাস করে না। কেউ কিছুতেই বিশ্বাস করে না। শিল্পের মানুষও অনেক সময় শিল্পে বিশ্বাস করে না। কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না।

মঈনুল শাওন: হ্যাঁ, তবে তেলক্ষেত্রের ক্রেনের ওঠানামা আছে।

হিলাল বাইদারোভ: সেটি আমার বাবার স্মৃতি। বাবা তেলক্ষেত্রে কাজ করতেন, আমি হাইস্কুলে পড়ার সময় তাঁকে হারাই। তেলক্ষেত্রে শুটিং করলে মনে হয়, বাবাকে শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছি।

মঈনুল শাওন: বাহ্, নতুন তথ্য জানা গেল। প্রসঙ্গ পাল্টানো যাক। আপনি হাঙ্গেরির চলচ্চিত্রকার বেলা তারের কাছ থেকেও শিখেছেন। তাঁর সিনেমাও সময়ের প্রেক্ষিত নিয়ে কাজ করে, কিন্তু বাস্তব দেহ-মানুষ সেখানে থাকে। বলা যায়, আপনি সেই প্রশিক্ষণকে ব্যবহার করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।

হিলাল বাইদারোভ: আমি বাস্তবতাবিরোধী নই। কিন্তু আমার শিল্প এখন বিমূর্ততার দিকে। কমিউনিস্ট বিশ্ব, পুঁজিবাদী বিশ্ব, বাইরের বাস্তবতা—এসব নিয়ে অনেকেরই ধারণা আছে। আমি যেতে চাই সেই অন্দরে, যেখানে মানুষ একা। এমন ছবি বানাতে গেলে নির্মাতাকেও ভীষণ একা হতে হয়। কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পাবেন না—টাকা নেই, নিশ্চয়তা নেই, বোঝাপড়া নেই। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে যাপিত এই নিঃসঙ্গতাই আমাকে শক্তি জোগায়।

হিলাল বাইদারভ ২০২৩ সালের টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায়

মঈনুল শাওন: আপনার নতুন কোনো কাজের পরিকল্পনা আছে কি? বলছিলেন, এই চলচ্চিত্রই শেষ কাজ হতে পারে কিন্তু…

হিলাল বাইদারোভ: আসলে নতুন ছবির কাজ শেষের পথে। এটি আগেরটির চেয়ে বেশি র্যাডিক্যাল—বাস্তবতার দিক থেকে নয়, বিমূর্ততার দিক থেকে। সম্পূর্ণ আলাদা রং, আলাদা ইমেজ প্রাচীন উপকথা থেকে তৈরি এক পোস্টমডার্ন মিথ।

মঈনুল শাওন: এ ক্ষেত্রে কোনো গল্প মাথায় আছে কি?

হিলাল বাইদারোভ: গল্প আমার মনে আছে, কিন্তু ছবিতে শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না, জানি না।

মঈনুল শাওন: সম্পাদনার টেবিলেই হয়তো এর সমাধান হবে। পরিশেষে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ধারণা সম্পর্কে জানতে চাই। সুযোগ হয়েছে কি দেখার?

হিলাল বাইদারোভ: সত্যি বলতে কি, আমার বাংলাদেশি বন্ধু আছে, এই অঞ্চলের কিছু ছবিও দেখেছি। আসলে আমি নানা দেশের সাত হাজারের বেশি চলচ্চিত্র দেখেছি—ক্ল্যাসিক, নির্বাক যুগ, সাদাকালো ছবি। ইতালি ও জাপান আমার বিশেষ প্রিয়, তবে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, তিব্বত, থাইল্যান্ড—অনেক দেশের ছবিই দেখি। শুধু ভালো ছবি নয়, নানা ধরনের ছবি দেখি, যাতে বুঝতে পারি মানুষ কী করেছে। তবে কি জানেন, সিনেমার ইতিহাসে আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটি ছবি হচ্ছে তারকোভস্কির ‘স্টকার’ এবং সের্গেই পারাজানোভের ‘দ্য কালার অব পমেগ্রানেটেস’।

মঈনুল শাওন: আসলেই, আপনার ‘সারমোন টু দ্য ভয়েড’ চলচ্চিত্র দেখার সঙ্গে সঙ্গেই পারাজানোভের সিনেমার রং ভেসে আসে মনে।

হিলাল বাইদারোভ: হ্যাঁ, আমার গ্রামের খুব কাছেই তাঁর বাড়ি।

মঈনুল শাওন: দারুণ! যাহোক, এবার শেষ করার পালা। একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে দর্শক বা আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য বা সারমোন কী?

হিলাল বাইদারোভ: আজকাল আমি শুধু ‘বিশ্বাস’ নিয়ে ভাবি। ঈশ্বর বা পরম সত্তায় বিশ্বাসের কথা বলছি না যেকোনো কিছুতেই বিশ্বাস করার কথা বলছি। শিল্পে বিশ্বাস, সৌন্দর্যে বিশ্বাস। বাইরে দেখি, যারা টাকা ভালোবাসে, তারাও আসলে টাকায় বিশ্বাস করে না। কেউ কিছুতেই বিশ্বাস করে না। শিল্পের মানুষও অনেক সময় শিল্পে বিশ্বাস করে না। কিন্তু বিশ্বাস ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না। সৌন্দর্যে বিশ্বাস রাখতে হবে—শুধু রং বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, সামগ্রিক সৌন্দর্য। সৌন্দর্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, বাঁচা উচিতও নয়।

মঈনুল শাওন: অসাধারণ কথা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

হিলাল বাইদারোভ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Read full story at source