কৃষির যান্ত্রিকীকরণে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন

· Prothom Alo

দেশের চাষাবাদ এখন প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষিতে রূপান্তর হয়েছে। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী গরুর লাঙল ও জোয়ালের স্মৃতি পেছনে ফেলে কৃষকেরা আজ আধুনিক ট্রাক্টর, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একসময়ের হাড়ভাঙা খাটুনি আর মৌসুমে দিনভর চাষাবাদ এখন কয়েক মিনিটে নেমে এসেছে। তবে আধুনিক এই যান্ত্রিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের অভাব।

Visit mwafrika.life for more information.

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ১৯৮৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত ছিল। ফসল কাটা ও মাড়াইয়ে আধুনিকায়ন পিছিয়ে থাকার বড় কারণ ছিল কৃষিজমি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হওয়া এবং নগদ অর্থের অভাব।

কৃষকদের নিজস্ব যন্ত্র কেনার মতো আর্থিক সক্ষমতা না থাকলেও তাঁরা এখন ভাড়ায় যন্ত্র ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করছেন। অনেক উদ্যোক্তা এই যন্ত্রে বিনিয়োগ করে কৃষকদের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন, যা এক বিশাল বাজার তৈরি করেছে।

ভাড়ায় চলছে ৯৮% কৃষিযন্ত্র

সম্প্রতি বিআইডিএস ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) যৌথ আয়োজনে উপস্থাপিত ‘বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অর্থায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। আইএফপিআরআইয়ের রিসার্চ ফেলো এম মেহরাব বখতিয়ারের গবেষণা অনুযায়ী, দেশের কৃষকদের মাত্র ২ শতাংশের নিজস্ব কৃষিযন্ত্র রয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশ কৃষকই ভাড়ায় ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। একইভাবে ৯৫ শতাংশ পাওয়ার টিলার এবং ৯৪ শতাংশ পাওয়ার থ্রেশার ভাড়ায় চালিত হয়।

ফসল কাটার ক্ষেত্রেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ২০১৮ সালে কম্বাইন হারভেস্টারে ফসল কাটার হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে লাফিয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

নীতির অভাবে অর্থায়নে ব্যাংকের অনীহা

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সবচেয়ে বড় বাধা হলো পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব। কৃষিযন্ত্র ক্রয়ের মাত্র ২-৭ শতাংশ অর্থায়ন আসে ব্যাংক থেকে। আইএফপিআরআইয়ের জরিপ অনুযায়ী, একটি হারভেস্টার ক্রয়ে ব্যাংকঋণ থেকে আসে মাত্র ৬ শতাংশ, অন্যদিকে ৫১ শতাংশ আসে আত্মীয়স্বজন বা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে এবং ২৯ শতাংশ আসে এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণদাতাদের থেকে।

ব্যাংকের এই অনীহার মূল কারণ হলো নীতিমালার সীমাবদ্ধতা। কৃষিঋণ নীতিমালায় অন্যের জমিতে ভাড়া খাটানোর জন্য কেনা যন্ত্রকে ঋণের আওতাভুক্ত করা হয়নি। অথচ ৯৯ শতাংশ কৃষিযন্ত্রই মূলত অন্য কৃষকের জমিতে ভাড়ায় ব্যবহৃত হয়। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদে (২০-৩১% হারে) বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঋণ নিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে কৃষি যন্ত্রপাতির বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে এর বাইরেও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের বাজার রয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে সার্বিক কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। স্থানীয়ভাবে তৈরি ও বিক্রির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। এ কারণে এমন বাজারের আকার ধারণা করছে ব্যবসায়ী সমিতি।

বাংলাদেশ কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে উচ্চ শুল্ক ও যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতা বড় একটি সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে দেশীয় উদ্যোক্তারা কাজ করলেও সুবিধা পান না। ব্যাংকগুলো যদি কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয় এবং সরকার যদি আমদানি করা কৃষিযন্ত্রের কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি করে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে, তবে এ খাতের প্রসার আরও দ্রুত হবে।

আবেদিন ইকুইপমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কৃষিতে সরকার ভর্তুকি দিলেও কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি বন্ধ আছে। তা ছাড়া কৃষিঋণের সুবিধা দিলেও কৃষকেরা যন্ত্র কিনতে এই ঋণসুবিধা পান না। দেশের জমি উপযোগী যন্ত্র কিনতে যে ব্যয়, তা–ও সাধারণ কৃষকের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। এ কারণে কৃষিযন্ত্রে ঋণসুবিধা দিয়ে উদ্যোক্তারদের মাধ্যমে কৃষকদের সেবা বাড়ালে তা আরও কৃষিবান্ধব হবে। দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ নীতিকাঠামো করে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক মো: রওশন আলম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা অনুযায়ী হাওর ও উপকূলে বিশেষ সুবিধা দিয়ে এবং সমতলের কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে কৃষি যন্ত্র দেওয়ার প্রকল্প ছিল। কিন্তু ওই প্রকল্পে ত্রুটি থাকায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন নতুনভাবে ভিন্ন আঙ্গিকে কৃষকদের যান্ত্রীকীকরণে সহযোগিতা করা হবে, যাতে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাহিদাভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ করা যায়। বর্তমানে সেচ কাজে সোলার ব্যবহার বাড়াতে কার্যক্রম চলছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য আধুনিক যন্ত্র সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের পরিকল্পনা আছে।

Read full story at source