গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু ৮০ ছাড়াল, নেই কোনো টিকা

· Prothom Alo

আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাবে ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, এই ভাইরাসে ‘মৃত্যুর হার অনেক বেশি’। তা ছাড়া এর কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসাও নেই।

অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রক্তক্ষরা জ্বরে এখন পর্যন্ত ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৩৩৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি আফ্রিকা) সর্বশেষ তথ্যে এ কথা জানিয়েছে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

চিকিৎসা সহায়তাকারী সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রাদুর্ভাবকে তারা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছে। 

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্যামুয়েল-রজার কাম্বা শনিবার বলেন, ‘ভাইরাসের এই বুনদিবুগিও ধরনের কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।’

‘এই ধরনে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’

কর্মকর্তারা শনিবার জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এই ভাইরাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর নাগরিক ছিলেন।

গত শুক্রবার রাতে উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও একই রকম একটি ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় মারা গেছেন। সপ্তাহের শুরুতে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মৃত্যুর দিনই তাঁর মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, উগান্ডায় মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি ইবোলার বুনদিবুগিও ধরনে আক্রান্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে এই ধরনটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমানে কেবল ইবোলার জায়ারে ধরনের জন্য টিকা পাওয়া যায়। এটি ১৯৭৬ সালে শনাক্ত হয়েছিল। ওই ধরনে মৃত্যুর হার আরও বেশি, প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ।

সিডিসি আফ্রিকা জানিয়েছে, স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা শুক্রবার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে নতুন এই প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে।

এই অঞ্চলে এক দেশের মানুষের অন্য দেশে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এ কারণে ভাইরাসটি আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এএফপির সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় আইজ্যাক নিয়াকুলিন্দা নামের স্থানীয় নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহ ধরে আমরা মানুষকে মরতে দেখছি।’

‘অসুস্থ ব্যক্তিদের আলাদা করে রাখার কোনো জায়গা নেই। মানুষ বাড়িতেই মারা যাচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যরাই তাদের মৃতদেহ সৎকার করছেন।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাম্বা জানান, এই প্রাদুর্ভাবের প্রথম রোগী ছিলেন একজন নার্স। গত ২৪ এপ্রিল তিনি ইবোলার উপসর্গ নিয়ে প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়ার একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

এই রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, রক্তক্ষরণ এবং বমি হওয়া।

এমএসএফ জানিয়েছে, তারা এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং কর্মী পাঠাচ্ছে।

এমএসএফ-এর জরুরি কর্মসূচির ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, ‘এত অল্প সময়ে আমরা যত আক্রান্ত এবং মৃত্যুর ঘটনা দেখছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। এর সঙ্গে ভাইরাসটি বিভিন্ন স্বাস্থ্য অঞ্চলে এবং এখন সীমান্তের ওপারেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি

 গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে এটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এটি আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জয় ভট্টাচার্য শুক্রবার বলেন, ‘এটি অনেক বড় একটি প্রাদুর্ভাব।’

 টিকা ও চিকিৎসার উন্নতির পরও গত ৫০ বছরে আফ্রিকায় ইবোলার কারণে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ গত আগস্টে দেশটির মধ্যাঞ্চলে ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।

সে সময় অন্তত ৩৪ জন মারা গিয়েছিলেন। পরে ডিসেম্বরে ওই প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে ইবোলার সবচেয়ে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন প্রায় ২ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

ধারণা করা হয়, ইবোলা ভাইরাসের উৎপত্তি বাদুড় থেকে। এটি একটি মারাত্মক রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। এর কারণে শরীরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয় এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, গত ৫০ বছরে ইবোলার প্রাদুর্ভাবগুলোতে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।

এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শারীরিক তরলের মাধ্যমে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে ছড়ায়। তবে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পরই কেবল আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মাঝে এটি ছড়াতে পারে। শরীরে ভাইরাস প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুক্রবার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসা থেকে বিমানে করে পাঁচ টন সুরক্ষাসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় জানায়, ‘রোগের অনিশ্চয়তা এবং ভয়াবহতার কারণে, আক্রান্ত এলাকায় এটি কতটা ছড়াতে পারে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।’

১০ কোটির বেশি মানুষের দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো। আয়তনে এটি ফ্রান্সের চেয়ে চার গুণ বড় হলেও এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই খারাপ। তাই এত বড় পরিসরে চিকিৎসাসামগ্রী পরিবহন করা এই দেশে বেশ কঠিন একটি কাজ।

Read full story at source