ক্যাপচার দিন কি শেষ

· Prothom Alo

ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা, লগইন করা বা অনলাইনে কোনো ফরম পূরণ করা ইত্যাদি কাজের মধ্যে হুট করেই সামনে আসে ক্যাপচা। এটা আমাদের জন্য একটা পরীক্ষার মতো। এ পরীক্ষায় কখনো ঝাপসা কিছু ছবির মধ্যে মোটরসাইকেল বা ট্রাফিক লাইট শনাক্ত করতে বলা হয়। কখনো আবার আঁকাবাঁকা অক্ষর পড়তে বলে। কখনো শুধু একটি বক্সে ক্লিক করতে বলা হয়, যেখানে লেখা থাকে, ‘আমি রোবট নই’।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

সহজ করে বললে, এটি এমন এক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইট বোঝার চেষ্টা করে, কাজটি একজন মানুষ করছে, নাকি কোনো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট করছে।

ক্যাপচার ধারণাটা ছিল খুব সহজ। মানুষ যে কাজ সহজে করতে পারে, একই কাজ কম্পিউটারের পক্ষে করা কঠিন, সেটা ছোট ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ ও বটকে আলাদা করতে হবে। এর ফলে বট দিয়ে স্প্যাম মন্তব্য করা, ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি, ফাইল ডাউনলোড করা, অ্যাকাউন্ট দখল করাসহ নানা ধরনের স্বয়ংক্রিয় অপব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হতো।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতির ফলে এ ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে। এআই এখন দক্ষতার সঙ্গে ক্যাপচা সমাধান করতে পারছে। আর মানুষের জন্য এসব ধাঁধা হয়ে উঠছে আরও জটিল ও বিরক্তিকর। তাই এখন প্রশ্ন উঠছে, ক্যাপচার দিন কি শেষ? এখনো ক্যাপচা কার্যকর আছে?

ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস তালিকায় জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা

ক্যাপচা শুরু হয়েছিল যেভাবে

ইটিএইচ জুরিখের কম্পিউটারবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস প্লেসনার লাইভ সায়েন্সকে বলেছেন, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ক্যাপচার জন্ম হয়েছিল; একটি ‘খুব সহজ, কিন্তু অত্যন্ত কঠিন’ সমস্যার সমাধান করতে। সমস্যাটি ছিল, ‘আমি যদি কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করি, তাহলে কীভাবে বুঝব যে ওপাশে একজন মানুষ আছে নাকি একটি কম্পিউটার?’

সে সময়ের প্রথম দিকের ক্যাপচাগুলো ছিল বিকৃত বা বাঁকানো অক্ষরের লেখা। কারণ, তখনকার টেক্সট-রিডিং সফটওয়্যার এসব বিকৃত লেখা পড়তে পারত না, অথচ মানুষ সহজেই পড়ে ফেলতে পারত।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে টেক্সট শনাক্ত করার সফটওয়্যারও উন্নত হতে থাকে। ফলে পুরোনো ধরনের ক্যাপচা আর তেমন কার্যকর থাকেনি। তখন আসে নতুন প্রজন্মের ক্যাপচা।

এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো রিক্যাপচা। এখানে ব্যবহারকারীকে গুগল স্ট্রিট ভিউয়ের ছবির গ্রিড থেকে ট্রাফিক লাইট, মোটরসাইকেল, সাইকেল কিংবা অন্য কোনো বস্তু শনাক্ত করতে বলা হয়। ২০০৯ সালে গুগল এ সেবা অধিগ্রহণ করার পর এ ব্যবস্থা চালু করা হয়।

টোকিওতে অবস্থিত ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস কম্পিউটিং সেন্টারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের পরিচালক এনজি চং বলেছেন, তখন ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তব জগতের জটিল ও এলোমেলো ছবির মধ্যে বস্তু শনাক্ত করা এখনো মানুষের বিশেষ দক্ষতা।

এরপর এল আচরণ বিশ্লেষণ।

এখনো কিছু মানুষ চাঁদে অভিযানকে কেন ভুয়া মনে করে

২০১৪ সালে গুগল চালু করে রিক্যাপচা ভি২। এতে শুধু একটি চেকবক্সে ক্লিক করলেই সব সময় কাজ শেষ হতো না। সিস্টেমটি ব্যবহারকারীর মাউস কীভাবে নড়ছে, কত দ্রুত ক্লিক করছে, আগে কীভাবে ওয়েবসাইটে চলাফেরা করেছে, এসব আচরণ বিশ্লেষণ করত।

যদি কোনো আচরণ সন্দেহজনক মনে হতো, তাহলে অতিরিক্ত পরীক্ষা হিসেবে ছবির গ্রিড সামনে আসত। কিন্তু এটিও এআইও শিখে গেল।

প্লেসনারের মতে, আধুনিক ক্যাপচায় শুধু ধাঁধা সমাধান করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সেটি কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৬ সালেই গবেষকেরা দেখান, স্বল্প খরচের ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে রিক্যাপচা ভি২ সমাধান করা সম্ভব।

২০২৪ সালে আন্দ্রেয়াস প্লেসনার ও তাঁর সহকর্মীরা এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেন, যা এ পরীক্ষায় শতভাগ সফল হয়।

এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে এনজি চং এমন একটি টুল তৈরি করেন, যা মানুষের মতো ব্রাউজিং আচরণ অনুকরণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি ছবির পরীক্ষা চালু হওয়ার আগেই রিক্যাপচা ভি২ সমাধান করে ফেলে। আর ছবি দেখানো হলেও এআই কয়েকবারের চেষ্টাতেই সমাধান করতে সক্ষম হয়।

চংয়ের মতে, যখন একটি সাধারণ ল্যাপটপে চলা সহজলভ্য সফটওয়্যারই ক্যাপচার ধাঁধা ও আচরণ বিশ্লেষণ করে ফেলে, দুই স্তরের নিরাপত্তা অতিক্রম করতে পারে, তখন ক্যাপচার মূল ধারণাটি আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। কারণ, এর ভিত্তি ছিল এমন কিছু কাজ যা মানুষ পারে, কিন্তু মেশিন পারে না।

তাহলে কি ক্যাপচার দিন শেষ? উত্তর হলো, পুরোপুরি শেষ নয়।

প্লেসনারের মতে, আধুনিক ক্যাপচায় শুধু ধাঁধা সমাধান করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সেটি কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক যেভাবে দুই শ রাজ পেঙ্গুইন সংরক্ষণ করলেন
এভাবেই ক্যাপচা রয়ে গেছে। এআই যতই এগিয়ে যাক, ক্যাপচা এখনো ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, এটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত প্রযুক্তি। এটিকে সহজে কাজে লাগানো যায়, দামও কম।

গবেষণার সময় প্লেসনারের দলকে এমন একটি ভিপিএন ব্যবহার করতে হয়েছিল, যা প্রতিটি পরীক্ষায় নতুন আইপি ঠিকানা ব্যবহার করত। কারণ, একই আইপি থেকে বারবার ক্যাপচা সমাধান করার চেষ্টা করলে পরীক্ষাগুলো আরও কঠিন হয়ে যেত, এমনকি সেই আইপি ব্লকও হয়ে যেতে পারত।

আধুনিক ক্যাপচা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ছবি বা লেখা শনাক্ত করার ওপর নির্ভর করে না। গুগলের রিক্যাপচা ভি৩, ফ্রেন্ডলি ক্যাপচা, এইচক্যাপচা ও ক্লাউডফ্লেয়ার ট্ররনস্টাইলের মতো সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীর সামনে কোনো ধাঁধা দেখায় না।

এর বদলে এরা বিশ্লেষণ করে, অনুরোধটি কি সত্যিকারের কোনো ডিভাইস থেকে এসেছে? সংশ্লিষ্ট আইপি অ্যাড্রেস কি আগে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? ব্যবহারকারী কীভাবে ওয়েবসাইটে ব্রাউজ করছেন? তাঁর কুকি হিস্ট্রি কেমন? ব্যবহারে স্বয়ংক্রিয় কার্যকলাপের কোনো লক্ষণ আছে কি না? এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সিস্টেম সম্ভাব্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ বা বট শনাক্ত করার চেষ্টা করে।

এভাবেই ক্যাপচা রয়ে গেছে। এআই যতই এগিয়ে যাক, ক্যাপচা এখনো ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, এটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত প্রযুক্তি। এটিকে সহজে কাজে লাগানো যায়, দামও কম।

তবে ক্যাপচার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এখন অনেক বটই সহজে ক্যাপচা সমাধান করতে পারে। অথচ মানুষের জন্য ক্যাপচা খুব বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের জন্য ক্যাপচা বৈষম্যমূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

প্রকৃতিকে যেভাবে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো

ক্যাপচা নিয়ে হাসাহাসি

এআই প্রযুক্তি বুদ্ধিমান হচ্ছে। সঙ্গে ক্যাপচাও জটিল হচ্ছে এআইকে পেছনে ফেলার জন্য। এখন ক্যাপচার বাড়তে থাকা জটিলতা নিয়ে এর মধ্যে প্রযুক্তি পাড়ায় হাসাহাসি তৈরি হয়েছে। যেমন ডেভেলপার নিল আগরওয়াল বানিয়েছেন I’m Not a Robot নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক গেম। এই গেমে খেলোয়াড়দের একের পর এক অদ্ভুত ও ক্রমেই অসম্ভব হয়ে ওঠা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি ধাপ পেরোলে পয়েন্ট মেলে আর ধাঁধাগুলো ধীরে ধীরে এত অদ্ভুত হয়ে ওঠে যে পুরো বিষয়টিকেই হাস্যকর মনে হয়।

ক্যাপচার ভবিষ্যৎ

তাহলে সামনে কী হবে? মেশিন যত বুদ্ধিমান হচ্ছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কঠিন ধাঁধা তৈরি করা কোনো সমাধান হতে পারে না। যদি একটি ক্যাপচা সমাধান করতে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাগে, তাহলে সেটি আর কার্যকর থাকে না। ইন্টারনেট এমন হওয়া উচিত, যা সবাই সহজে ব্যবহার করতে পারে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স প্লাস

কেমন করে তৈরি হয় এক স্কুপ আইসক্রিম

Read full story at source